রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের আবাসন প্রকল্পে আবারও বড় ধরনের আর্থিক অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের (সিএজি) কার্যালয়ের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারি হিসাবে প্রায় ২৭ কোটি টাকার যন্ত্রপাতি কেনা হয়েছে প্রায় ২১৩ কোটি ৮৮ লাখ টাকায়, যা নিয়ে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।
পাবনার ঈশ্বরদীতে নির্মিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পের ‘গ্রিন সিটি’ আবাসিক এলাকার ১১টি ভবনের বৈদ্যুতিক উপকেন্দ্রের সরঞ্জাম ও জেনারেটর কেনাকাটায় এই অনিয়ম ধরা পড়ে।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, সরকারি প্রাক্কলনে এসব যন্ত্রপাতির মূল্য ছিল প্রায় ২৬ কোটি ৯৯ লাখ টাকা। কিন্তু বাস্তবে ঠিকাদারদের বিল পরিশোধ করা হয়েছে ২১৩ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। ফলে অতিরিক্ত ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৮৬ কোটি ৮৯ লাখ টাকা।
দরপত্রে কৌশলে দাম বাড়ানোর অভিযোগ
প্রতিবেদনে বলা হয়, দরপত্রে মোট মূল্য প্রাক্কলনের কাছাকাছি রাখা হলেও গুরুত্বপূর্ণ কিছু যন্ত্রপাতির দাম অস্বাভাবিকভাবে কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেখানো হয়েছে। আবার কিছু পণ্যের দাম কম দেখিয়ে মোট দরকে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখা হয়। এতে পুরো প্রক্রিয়াটি বাহ্যিকভাবে স্বাভাবিক মনে হলেও ভেতরে বড় ধরনের মূল্য কারসাজির অভিযোগ উঠেছে।
একটি ভবনেই প্রায় ১৮ কোটি টাকার অতিরিক্ত ব্যয়
বিশেষভাবে সাত নম্বর ভবনের ক্ষেত্রে বড় ধরনের অসামঞ্জস্য ধরা পড়ে। সেখানে উচ্চ ভোল্টেজ নিয়ন্ত্রণ সরঞ্জামের দাম ধরা হয় ৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা, যেখানে সরকারি নির্ধারিত মূল্য ছিল মাত্র ১০ লাখ ৩২ হাজার টাকা।
একইভাবে বিতরণ ট্রান্সফরমারের দাম ধরা হয় ৪ কোটি ৪০ লাখ টাকা, যেখানে সরকারি মূল্য ছিল ৪০ লাখ ৪০ হাজার টাকা। লো-ভোল্টেজ সরঞ্জাম ও পাওয়ার প্যানেলের ক্ষেত্রেও কয়েকগুণ বেশি দাম দেখানো হয়।
সব মিলিয়ে একটি ভবনের পাঁচ ধরনের যন্ত্রপাতির জন্য বিল করা হয় প্রায় ১৯ কোটি ৬০ লাখ টাকা, যেখানে সরকারি মূল্য ছিল মাত্র ১ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। অর্থাৎ একটি ভবনেই অতিরিক্ত ব্যয় প্রায় ১৭ কোটি ৭৬ লাখ টাকা।
তিন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অতিরিক্ত বিল
নথি অনুযায়ী, তিনটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এই প্রকল্পের কাজ পায় এবং বিপুল অঙ্কের অর্থ উত্তোলন করে—মজিদ সন্স কনস্ট্রাকশন লিমিটেড: ৫টি ভবনের জন্য প্রায় ৯২ কোটি টাকা, সাজিন এন্টারপ্রাইজ: ৪টি ভবনের জন্য প্রায় ৮২ কোটি ৪৯ লাখ টাকা, এমএসসিএল–জিকেবিপিএল যৌথ উদ্যোগ: ২টি ভবনের জন্য প্রায় ৩৯ কোটি ৩৯ লাখ টাকা।
সিএজির হিসাব অনুযায়ী, সরকারি দরের তুলনায় তিন প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে মোট অতিরিক্ত ব্যয় প্রায় ১৮৭ কোটি টাকার কাছাকাছি।
নিয়ম না মানার অভিযোগ
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সরকারি ক্রয়বিধি অনুযায়ী অস্বাভাবিক বেশি দামের ক্ষেত্রে ব্যাখ্যা চাওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকলেও তা মানা হয়নি। পাশাপাশি মূল্যায়ন কমিটি গঠন, দর যাচাই এবং প্রাক্কলন প্রক্রিয়াতেও ঘাটতি পাওয়া গেছে।
প্রশাসনিক ব্যবস্থা ও অর্থ ফেরতের সুপারিশ
সিএজি কার্যালয় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া এবং অতিরিক্ত অর্থ সরকারি কোষাগারে ফেরত আনার সুপারিশ করেছে।
এছাড়া দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আগের তদন্ত ও গ্রেপ্তারের ঘটনাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) একে ‘মেগা দুর্নীতি’ হিসেবে অভিহিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, দেশের সবচেয়ে বড় অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর একটি রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র–এ এ ধরনের অভিযোগ প্রকল্প ব্যবস্থাপনা ও সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছে।
আরএন