প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশে ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতাল আকস্মিক পরিদর্শন করেছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন। পরিদর্শনকালে হাসপাতাল পরিচালনায় ব্যর্থতার দায়ে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক মোহাম্মদ ফরিদ উদ্দিন চৌধুরীকে ক্লোজড করা হয়। একই সঙ্গে নোয়াখালীর সিভিল সার্জন ডা. আনার হোসেনকে হাসপাতালের অস্থায়ী তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়।
মঙ্গলবার (১৬ জুন) দুপুর দেড়টার দিকে স্বাস্থ্যমন্ত্রী হাসপাতালে পৌঁছে চিকিৎসাসেবা, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উপস্থিতি এবং সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা সরেজমিনে পর্যালোচনা করেন। হাসপাতালে প্রবেশের পরই তিনি হাজিরা খাতা ও ডিউটি রোস্টার যাচাই করেন। এ সময় বেশ কয়েকজন চিকিৎসক ও কর্মকর্তার কর্মস্থলে দেরিতে উপস্থিত হওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
মন্ত্রীর আগমনের খবর ছড়িয়ে পড়লে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও তাদের স্বজনরা তাঁর সঙ্গে কথা বলতে ভিড় করেন। তিনি তাদের কাছ থেকে হাসপাতালের সেবার মান, ভোগান্তি এবং বিভিন্ন সমস্যার বিষয়ে সরাসরি অভিযোগ শোনেন। এ সময় রোগী ও স্বজনরা হাসপাতালে কাঙ্ক্ষিত সেবা না পাওয়া, দালালচক্রের সীমাহীন দৌরাত্ম্য, রোগীদের জন্য সরবরাহ করা খাবারের নিম্নমান এবং টয়লেটের অব্যবস্থাপনা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। কয়েকজন স্বজন অভিযোগ করেন, হাসপাতালে বিভিন্ন সেবা পেতে ঘুষ দিতে হয়।
পরিদর্শনের একপর্যায়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জরুরি বিভাগ, বহির্বিভাগ, প্যাথলজি ল্যাব, বিভিন্ন ওয়ার্ড এবং টয়লেট ঘুরে দেখেন। তিনি হাসপাতালের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, ওষুধের মজুত এবং রোগীদের জন্য দেওয়া বিভিন্ন সেবার মানও পর্যবেক্ষণ করেন। হাসপাতালে অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা দেখে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন। পরে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেন। মন্ত্রীর আকস্মিক উপস্থিতির পর হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগে তৎপরতা বেড়ে যায়। পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা দ্রুত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজে নেমে পড়েন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বিকেল ৩টার দিকে মন্ত্রী হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক মোহাম্মদ ফরিদ উদ্দিন চৌধুরীর কক্ষ থেকে বের হলে তাঁর সমর্থকদের ১০০ থেকে ১৫০ জন তাৎক্ষণিকভাবে হ্যান্ড মাইক নিয়ে এসে তাঁর ক্লোজড আদেশ প্রত্যাহারের দাবিতে বিক্ষোভ করেন। এ সময় ধাক্কাধাক্কির মধ্যে মন্ত্রী হাসপাতাল ত্যাগ করেন। রোগী ও স্বজনদের প্রত্যাশা, এই আকস্মিক পরিদর্শনের মাধ্যমে শুধু অনিয়ম চিহ্নিত করাই নয়, দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলোর স্থায়ী সমাধানেও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে।
পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বলেন, “১৭ বছর ধরে স্বৈরাচারী সরকারের শাসন ছিল। এরপর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও প্রয়োজনীয় দক্ষতার অভাব দেখা গেছে। বিগত সরকার এমনকি তত্ত্বাবধায়ক সরকারও টিকাদান কার্যক্রমে যথাযথ উদ্যোগ নেয়নি। পরে অনেক কষ্ট করে টিকা সংগ্রহ করে আমরা শিশুদের টিকাদান নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়েছি। স্বাস্থ্য খাতে দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে এমন জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। সারা দেশের হাসপাতালগুলোতেই আমরা নানা সমস্যা দেখতে পাচ্ছি। যেখানে হাত দিচ্ছি, সেখানেই ভয়াবহ চিত্র সামনে আসছে। নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে এসে অমানবিক পরিস্থিতি দেখেছি। এখানে নতুন একটি ভবনের নির্মাণকাজ চলছে, তবে এর অগ্রগতি অত্যন্ত ধীরগতির। আজ যেসব অব্যবস্থাপনা আমরা দেখেছি, সেগুলোর দায় তত্ত্বাবধায়ক এড়াতে পারেন না। এ কারণেই তাঁকে ক্লোজড করা হয়েছে।”
এ সময় উপস্থিত ছিলেন নোয়াখালীর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম, পুলিশ সুপার এন. এম. নাসিরুদ্দিন, জেলা সিভিল সার্জন ডা. আনার হোসেনসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
এমআর/আরএন