বছরজুড়েই নানা কারণে আলোচনায় থাকে সীমান্ত এলাকা। কখনও সীমান্ত হত্যা, কখনও কৃষকের ওপর ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)-এর হয়রানি। কাঁটাতারের পাশের মানুষের জীবন যেন প্রতিদিনই অনিশ্চয়তা আর শঙ্কার। তবে পুশ-ইন ইস্যুতে আবারও নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে নওগাঁর সীমান্ত এলাকায়। এ নিয়ে সীমান্ত এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে দুশ্চিন্তা বাড়ছে। এদিকে সীমান্তবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিজিবি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সীমান্তে টহল ও নিরাপত্তা জোরদার করেছে।
জানা যায়, নওগাঁ জেলার সঙ্গে ভারতের নয়টি সীমান্ত এলাকা রয়েছে। এগুলো হলো— সাপাহার উপজেলার হাঁপানিয়া ও করমুডাঙ্গা সীমান্ত, পোরশা উপজেলার নীতপুর সীমান্ত এবং ধামইরহাট উপজেলার কালুপাড়া, চকইলাম, চকচণ্ডী, বস্তাবর, শিমুলতলী ও তালান্দার সীমান্ত। তবে সবচেয়ে বেশি সীমান্ত হত্যা বা কৃষকের ওপর বিএসএফের হয়রানি হয় সাপাহার উপজেলার হাঁপানিয়া ও করমুডাঙ্গা সীমান্ত এবং পোরশা উপজেলার নীতপুর সীমান্তে। গত ৫ জুন নওগাঁর করমুডাঙ্গা সীমান্ত দিয়ে ১৭ জনকে পুশ-ইনের চেষ্টা করে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)। যদিও বিজিবির কড়া নজরদারিতে তাদের ফেরত নিতে বাধ্য হয় বিএসএফ।
এসব সীমান্ত এলাকার বাসিন্দাদের কৃষিকাজ ও গবাদিপশু পালনই একমাত্র উপার্জনের পথ। মাঠের ফসল সীমান্তপাড়ের মানুষের সারা বছরের সঞ্চয়। তবে মাঠে ফসল ফলাতে গিয়ে বিএসএফের হাতে হয়রানির শিকার হতে হয় চাষিদের। সম্প্রতি পুশ-ইনকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা বেড়েছে সীমান্ত এলাকায়। এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে দুশ্চিন্তা বাড়ছে।
সাপাহার উপজেলার করমুডাঙ্গা গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল জলিল বলেন, ‘জমিতে চাষাবাদ ছাড়া আমাদের কোনো কাজ নেই। জমিতে কাজ করতে গেলেই বিএসএফ প্রায়ই আমাদের ধাওয়া দেয়। অনেক সময় সীমানা পেরিয়ে এসে ভয়ও দেখায়। এছাড়া বিভিন্নভাবে আমাদের হয়রানি করে। তারপরও বেঁচে থাকার জন্য জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে হয়।’
মতিন নামে আরেক বাসিন্দা বলেন, ‘১৯৯৮ বা ২০০০ সালের দিকে আমার চাচাসহ তিনজন বাংলাদেশের জমিতে গম কাটছিল। সে সময় বিএসএফ এসে ধাওয়া করে ধরে নিয়ে গিয়ে গুলি করে মেরে ফেলে। আমরা আমাদের জমিতে কাজ করি। তারপরও তারা বিভিন্নভাবে আমাদের হয়রানি করে। ঘাস কাটতে বা গরু চড়াতে গেলে অনেক সময় হাত-পা ভেঙে দেয়। আবার গুলিও করে।’
মাহবুবুর রহমান নামে আরেক বাসিন্দা বলেন, ‘বেশিরভাগ সময়ই পুশ-ইন আতঙ্ক চলছে। অবৈধভাবে মানুষ ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা করছে বিএসএফ। বিজিবিও কঠোর অবস্থানে আছে। তারপরও নিরাপত্তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকতে হয়। আমরাও বিজিবিকে সহযোগিতা করছি, যাতে বিএসএফ অবৈধভাবে মানুষ পাঠাতে না পারে।’
পোরশা উপজেলার নীতপুর গ্রামের বাসিন্দা রাশেদ জানান, ‘সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। গতকাল রাত ১০টার দিকে স্থানীয়রা দেখতে পায়, বিএসএফ কিছু মানুষকে বাংলাদেশে পুশ-ইন করানোর জন্য সীমান্ত এলাকায় অবস্থান করছে। বিষয়টি জানাজানির পর প্রায় ২০০ জনের মতো মানুষ লাঠি হাতে এবং টর্চলাইট নিয়ে রাত ১২টা পর্যন্ত সীমান্ত এলাকায় পাহারা দেয়।’
এ বিষয়ে অ্যাডভোকেট মহসিন রেজা বলেন, ‘যেকোনো দেশে অবৈধ অধিবাসী থাকতেই পারে। তাদের নিজ দেশে ফেরানোর ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আইন না মেনে পুশ-ইনের মতো ঘটনা অপরাধ।’
নওগাঁ-১৬ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম মাসুম বলেন, ‘সীমান্ত এলাকায় সর্বোচ্চ সতর্কতা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন বিজিবির সদস্যরা। সীমান্তে সার্বক্ষণিক নজরদারি, গোয়েন্দা তৎপরতা বৃদ্ধি এবং নিরবচ্ছিন্ন টহল কার্যক্রমের পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও জনসাধারণের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। এছাড়া জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। যেকোনো ধরনের মানবপাচার, অবৈধ অনুপ্রবেশ ও পুশ-ইনের অপচেষ্টা প্রতিরোধে বিজিবি সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে থেকে দৃঢ়তার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে।’
কেএইচ/আরএন