১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে দেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন উৎসর্গ করেছিলেন মাত্র ১৮ বছরের এক তরুণ। শত্রুপক্ষের মেশিনগানের গুলিতে যখন মুক্তিযোদ্ধাদের অগ্রযাত্রা বাধাগ্রস্ত হচ্ছিল, তখন নিজের জীবনের মায়া ত্যাগ করে শত্রুর বাঙ্কার ধ্বংস করতে এগিয়ে গিয়েছিলেন তিনি। গ্রেনেড নিক্ষেপ করে শত্রুর মেশিনগান পোস্ট অকার্যকর করে সহযোদ্ধাদের এগিয়ে যাওয়ার পথ তৈরি করেন। কিন্তু সেই বীরত্বপূর্ণ অভিযানে তাঁকেও প্রাণ দিতে হয়। তিনি বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ সিপাহি হামিদুর রহমান। আজ ২৮ অক্টোবর তাঁর ৫৫তম শাহাদাতবার্ষিকী। ১৯৭১ সালের এই দিনে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার ধলই সীমান্ত এলাকায় পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধে শহীদ হন তিনি। দেশের স্বাধীনতার জন্য তাঁর অসামান্য সাহসিকতা ও আত্মত্যাগের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সামরিক খেতাব ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ প্রদান করা হয়। বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান ১৯৫৩ সালের ২ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন যশোর জেলার (বর্তমানে ঝিনাইদহ) মহেশপুর উপজেলার খর্দ্দ খালিশপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা আক্কাস আলী মণ্ডল ছিলেন ভূমিহীন কৃষক এবং মা কায়েদুননেসা ছিলেন গৃহিণী। দরিদ্র পরিবারের সন্তান হামিদুর ছোটবেলা থেকেই নানা প্রতিকূলতার মধ্যে বেড়ে ওঠেন। গ্রামের পাঠশালায় প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে তিনি স্থানীয় নৈশ বিদ্যালয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। কিন্তু অর্থনৈতিক সংকটের কারণে পঞ্চম শ্রেণি পাসের পর পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। পরিবারের কাজে বাবাকে সহযোগিতা করতে শুরু করেন তিনি। তবে দারিদ্র্য তাঁর জীবনকে সীমাবদ্ধ করে রাখতে পারেনি। দেশের প্রতি ভালোবাসা ও সাহসিকতা তাঁকে একসময় মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে অমর করে তোলে। ১৯৭১ সালের ২ ফেব্রুয়ারি হামিদুর রহমান ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে যোগ দেন। প্রশিক্ষণের জন্য তাঁকে চট্টগ্রামের ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টাল সেন্টারে পাঠানো হয়। ২৫ মার্চ পাকিস্তানি বাহিনী সেখানে হামলা চালালে তিনি প্রাণে বেঁচে নিজ এলাকায় ফিরে আসেন। পরে পরিবারের সম্মতি নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। তিনি প্রথম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বিভিন্ন অভিযানে অংশ নেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর দায়িত্ব ছিল শুধু সামরিক নির্দেশ পালন নয়, বরং সহযোদ্ধাদের সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধে অংশ নিয়ে দেশকে শত্রুমুক্ত করার চেষ্টা করা। বিভিন্ন অভিযানে তিনি সাহসিকতার পরিচয় দেন। ১৯৭১ সালের অক্টোবর মাসে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার ধলই সীমান্ত ফাঁড়ি পাকিস্তানি বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষাকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছিল। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই ঘাঁটি দখল করা মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য জরুরি ছিল। ২৮ অক্টোবর প্রথম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের মুক্তিযোদ্ধারা ঘাঁটিটি দখলের অভিযান শুরু করেন। অভিযানের সময় পাকিস্তানি বাহিনীর মেশিনগান থেকে প্রচণ্ড গুলিবর্ষণ শুরু হয়। শত্রুর মেশিনগানের কারণে মুক্তিযোদ্ধাদের সামনে এগিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। সহযোদ্ধাদের অগ্রযাত্রা নিশ্চিত করতে শত্রুর মেশিনগান পোস্ট ধ্বংস করার দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন হামিদুর রহমান। তিনি দুর্গম পথ ধরে শত্রুর অবস্থানের দিকে এগিয়ে যান। এরপর গ্রেনেড নিক্ষেপ করে মেশিনগান পোস্টে আঘাত হানেন। গুলিবিদ্ধ হওয়ার পরও তিনি থেমে যাননি। শত্রুর অবস্থানের কাছে পৌঁছে সরাসরি লড়াই চালিয়ে যান এবং শেষ পর্যন্ত মেশিনগান পোস্টটি অকার্যকর করতে সক্ষম হন। তাঁর এই সাহসী অভিযানের ফলে পাকিস্তানি বাহিনীর গুলিবর্ষণ বাধাগ্রস্ত হয় এবং মুক্তিযোদ্ধারা এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পান। ধলই সীমান্ত ফাঁড়ি দখলের লড়াইয়ে তাঁর আত্মত্যাগ ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে শত্রুর গুলিতে শহীদ হন এই তরুণ মুক্তিযোদ্ধা। ধলইয়ের যুদ্ধে হামিদুর রহমানের মৃত্যু ছিল দেশের স্বাধীনতার জন্য আত্মবিসর্জনের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। পাকিস্তানি বাহিনীর মেশিনগানের গুলিতে মুক্তিযোদ্ধাদের অগ্রযাত্রা আটকে গেলে তিনি শত্রুর মেশিনগান পোস্ট ধ্বংস করতে এগিয়ে যান। গ্রেনেড হামলায় পোস্টটি অকার্যকর করার পাশাপাশি শত্রু সেনাদের সঙ্গে সরাসরি লড়াই করেন তিনি। এ সময় শত্রুপক্ষের গুলিতে তাঁর মৃত্যু হয়। সহযোদ্ধাদের অগ্রযাত্রা সহজ করতে নিজের জীবন বাজি রেখে যে অভিযান তিনি চালিয়েছিলেন, তা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে সাহসিকতার এক উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে আছে। তাঁর আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হয়, দেশের স্বাধীনতার প্রশ্নে বয়স কিংবা ব্যক্তিগত নিরাপত্তা কোনো কিছুই দেশপ্রেমের কাছে বড় ছিল না। শহীদ হওয়ার পর হামিদুর রহমানের মরদেহ ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের আমবাসা এলাকার হাতিমারাছড়া গ্রামে দাফন করা হয়। স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় তাঁর মরদেহ সেখানেই সমাহিত ছিল। অবশেষে ২০০৭ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ সরকারের উদ্যোগে তাঁর দেহাবশেষ দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। ১১ ডিসেম্বর ঢাকায় রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁকে পুনঃসমাহিত করা হয়। বর্তমানে তাঁর কবর ঢাকার মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে। সেখানে তিনি চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন। বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান অবিবাহিত ছিলেন। তাঁর স্ত্রী বা সন্তান ছিল না। তাঁর বাবা আক্কাস আলী মণ্ডল ও মা কায়েদুননেসা দুজনই মারা গেছেন। তাঁর মা ২০০৫ সালে মৃত্যুবরণ করেন। মায়ের কবর রয়েছে ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার খর্দ্দ খালিশপুরে। সেখানে হামিদুর রহমানের স্মৃতি সংরক্ষণে গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। ২০১৫ সালে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, তাঁর ভাইদের মধ্যে ছিলেন হামজুর রহমান, শুকুর আলী ও ফজলুর রহমান। তাঁর দুই বোনের নাম আছিয়া বেগম ও রিজিয়া বেগম। তবে তাঁদের মধ্যে বর্তমানে কারা জীবিত আছেন, সে বিষয়ে নির্ভরযোগ্য হালনাগাদ তথ্য পাওয়া যায়নি। তাই পরিবারের বর্তমান সদস্যসংখ্যা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। হামিদুর রহমানের ভাইপো হাফিজুর রহমানও পরিবারের সদস্য হিসেবে বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে কথা বলেছেন। পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন সময়ে তাঁর স্মৃতি ও স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষণের বিষয়ে নিজেদের প্রত্যাশার কথা জানিয়েছেন। মহান মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য সাহসিকতা ও আত্মত্যাগের জন্য হামিদুর রহমানকে ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ খেতাবে ভূষিত করা হয়। তাঁর জন্মস্থান ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার খর্দ্দ খালিশপুর এলাকায় তাঁর নামে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘর প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। মৌলভীবাজারের ধলই সীমান্তেও তাঁর বীরত্বের স্মৃতি বহন করছে স্মৃতিসৌধ। তাঁর স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষণ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। ২০২৬ সালে ঝিনাইদহ শহরের প্রবেশমুখে তাঁর নামে নির্মিত চত্বর ও ভাস্কর্য নিয়ে নানা ঘটনা আলোচনায় আসে। একই বছর জেলা প্রশাসন তাঁর শাহাদাতবার্ষিকী পালনের উদ্যোগ নেয়। মাত্র ১৮ বছর বয়সে হামিদুর রহমান দেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন উৎসর্গ করেন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি হয়তো দীর্ঘ সময় বেঁচে থাকার সুযোগ পাননি, কিন্তু তাঁর সাহসিকতা ও আত্মত্যাগ তাঁকে বাংলাদেশের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় করে রেখেছে। আজ তাঁর ৫৫তম শাহাদাতবার্ষিকীতে তাঁকে স্মরণ করার অর্থ শুধু একটি ঐতিহাসিক দিন পালন নয়; বরং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, দেশপ্রেম এবং স্বাধীনতার জন্য আত্মত্যাগের মূল্য নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরা। বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়- একজন মানুষের বয়স বা জীবনের দৈর্ঘ্য নয়, দেশের জন্য তাঁর অবদানই তাঁকে ইতিহাসে অমর করে রাখতে পারে। এফএস