চিরচেনা কোলাহল, হর্ন আর দীর্ঘ যানজটের চেনা ঢাকা যেন হঠাৎ করেই শান্ত এক নগরীতে রূপ নিয়েছে। টানা পাঁচ দিনের শারদীয় দুর্গাপূজার ছুটি শেষ হলেও তার আমেজ রয়ে গেছে পুরো রাজধানীজুড়ে। শহরের প্রাণকেন্দ্রগুলোর পিচঢালা রাজপথ এখন প্রায় ফাঁকা, নেই গণপরিবহনের হুড়োহুড়ি কিংবা কর্মজীবী মানুষের চিরচেনা তাড়া। সাময়িক এই স্বস্তিদায়ক পরিবেশ নগরবাসীকে আরাম দিলেও যাত্রী সংকটে আয় কমে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন বাসচালক ও রিকশাশ্রমিকরা।
বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) সকাল থেকে রাজধানীর গুলিস্তান, পল্টন, মতিঝিল, শাহবাগ, কারওয়ান বাজার, ফার্মগেট, মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি, নিউ মার্কেটসহ বিভিন্ন এলাকা সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায় এক ভিন্ন ঢাকার চিত্র।
স্বাভাবিক সময়ে যেসব সড়কে এক মোড় থেকে অন্য মোড়ে যেতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হতো, সেখানে এখন অর্ধেকেরও কম সময়ে গন্তব্যে পৌঁছানো যাচ্ছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি দপ্তর ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের একাংশ বন্ধ থাকায় স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় যানবাহন চলাচল একেবারেই সীমিত।
মতিঝিল বাসস্ট্যান্ডে যাত্রীর অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকা রিকশাচালক মজিবর মিয়া বলেন, “গতকাল মাত্র ২০ মিনিটে শাহবাগ থেকে বেড়িবাঁধ পৌঁছে গেছি। এমন ফাঁকা রাস্তা তো স্বাভাবিক দিনে ভাবাই যায় না। তবে স্বস্তি থাকলেও যাত্রী না থাকায় দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে, আয়ও অনেক কমে গেছে।”
যানজট না থাকায় রাজপথে বাসগুলো দ্রুত গতিতে ছুটলেও ভেতরের আসনগুলো থাকছে ফাঁকা। গাবতলী থেকে ছেড়ে আসা ‘৮ নম্বর’ বাসের হেলপার সুমন বলেন, “অন্যান্য দিনে গাবতলী থেকে ছাড়ার পর শ্যামলী আসার আগেই বাস ফুল হয়ে যেত। কিন্তু গত দু-তিন দিন ধরে সিট পূরণ হতেই চায় না। পূজার লম্বা ছুটিতে সবাই গ্রামের বাড়ি চলে যাওয়ায় এই অবস্থা।”
একই চিত্র দেখা গেছে সাত মসজিদ রোডের ‘রজনীগন্ধা’ পরিবহনেও। বাসচালক জাকির হাসান জানান, দীর্ঘ ছুটির কারণে সব ধর্মের মানুষই কেনাকাটা বা ঘোরার উদ্দেশ্যে শহরের বাইরে গেছেন। আগামী রোববার অফিস-আদালত পুরোপুরি না খোলা পর্যন্ত সড়কের এমন নিস্তব্ধ পরিস্থিতি বজায় থাকতে পারে।
দীর্ঘ ছুটির কারণে রাজধানীর এই রূপ দেখে অনেকেই ঈদের ছুটির কথা স্মরণ করছেন। ফার্মগেট ওভারব্রিজে পথচারী রাশেদ আলম বলেন, “ঈদের সময় ছাড়া ঢাকাকে এমন শান্ত রূপে সচরাচর দেখা যায় না। কদিনের জন্য হলেও যানজটমুক্ত এই শহর উপভোগ করছি।”
সড়কের ফাঁকা ভাবের প্রভাব পড়েছে ফুটপাতের ক্ষুদ্র ব্যবসা ও টং দোকানগুলোতেও। ধানমন্ডি এলাকার টং দোকানদার আবু হানিফ আফসোস করে বলেন, “রাস্তায় মানুষই নেই, বিক্রিবাট্টা হবে কার কাছে? সবাই তো গ্রামে চলে গেছে।”
এদিকে রাজধানীর ব্যস্ততম পল্টন ও মতিঝিল এলাকার ফুটপাতের দোকানপাট বন্ধ থাকায় তৈরি হয়েছে ভিন্ন এক আমেজ। দীর্ঘ ছুটির কারণে অধিকাংশ ফুটপাতের দোকান বন্ধ থাকায় পথচলতি মানুষদের পড়তে হয়েছে সাময়িক ভোগান্তিতে। দুপুরের খাবার গ্রহণ কিংবা সাধারণ আপ্যায়নের জন্য খোলা হোটেল-রেস্তোরাঁ খুঁজতে বহু পথচারীকে এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় ছোটাছুটি করতে দেখা যায়।
নগর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রোববার থেকে অফিস-আদালত ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পুরোদমে চালু হলে ঢাকা আবার তার পুরোনো ব্যস্ত ও যানজটপূর্ণ রূপে ফিরে যাবে। তবে রবিবারের আগে কটা দিন ঢাকার এই ভিন্ন রূপ আর স্বস্তির পরিবেশটুকু উপভোগ করে নিতে চান অবশিষ্ট নগরবাসী।
এসএ