জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে বাসের পর বাড়লো লঞ্চভাড়াও। একজন যাত্রীর লঞ্চভাড়া কম দূরত্বে প্রতি কিলোমিটারে ২৩ পয়সা ও বেশি দূরত্বে ২০ পয়সা বেড়েছে।
বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) লঞ্চ মালিকদের সঙ্গে বৈঠকের পর ভাড়া বাড়ানোর ঘোষণা দেন নৌপরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম।
যাত্রীবাহী লঞ্চের ভাড়া প্রথম ১০০ কিলোমিটারে কিলোমিটারপ্রতি ২ টাকা ৯৫ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৩ টাকা ১৮ পয়সা করা হয়েছে। অর্থাৎ কিলোমিটারপ্রতি ভাড়া বেড়েছে ২৩ পয়সা। আর ১০০ কিলোমিটারের পরের দূরত্বে কিলোমিটারপ্রতি ভাড়া ২ টাকা ৫২ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ২ টাকা ৭২ পয়সা করা হয়েছে, অর্থাৎ বেড়েছে ২০ পয়সা। নতুন ভাড়া বৃদ্ধির প্রজ্ঞাপন আজকেই জারি হবে এবং আজকে থেকেই নতুন ভাড়া কার্যকর হবে বলেও জানিয়েছেন মন্ত্রী।
সড়ক পরিবহন মন্ত্রী বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর নৌযানের মালিক, সমিতি ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে। সেখানে মালিকদের পক্ষ থেকে ভাড়া বাড়ানোর দাবি জানানো হয়। ব্যবস্থাপনা ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়, ডলারের দাম বৃদ্ধি এবং যন্ত্রাংশের মূল্য বাড়ার বিষয়গুলোও তারা তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, ‘তাদের দাবি ছিল প্রায় ২৫ শতাংশ, সর্বশেষে ১৫ শতাংশের মতো ভাড়া বৃদ্ধি। কিছু কিছু ক্ষেত্রে তাদের দাবির যৌক্তিকতাও আছে। কিন্তু আমরা দ্বিপক্ষীয় মিটিং সফলতার সঙ্গে শেষ করে ৭ দশমিক ৫৪ শতাংশ ভাড়া বৃদ্ধি করেছি।’
শেখ রবিউল আলম বলেন, এর আগে সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর জ্বালানি তেলের দাম ১৫ শতাংশ বাড়লেও যাত্রীদের সক্ষমতা বিবেচনায় নৌযানের ভাড়া প্রায় সাড়ে ৬ শতাংশ বাড়ানো হয়েছিল। এবার তেলের দাম ১৭ দশমিক ৩৯ শতাংশ বাড়লেও ভাড়া ৭ দশমিক ৫৪ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে।
‘জনগণের ওপর খুব বেশি চাপ না পড়ে এবং মালিকদেরও ন্যূনতম যে ব্যয় সমন্বয় করা প্রয়োজন, সেটার মধ্যে থাকতে পেরেছি। আমার মনে হয় একটা যৌক্তিক পর্যায়ে ভাড়া বেড়েছে।’
তিনি জানান, ১০০ কিলোমিটার পর্যন্ত এবং এর পরের দূরত্বের নির্ধারিত ভাড়াও একই হারে ৭ দশমিক ৫৪ শতাংশ বাড়বে। কিলোমিটারপ্রতি নতুন ভাড়ার বিস্তারিত লিখিত আকারে দেওয়া হবে।
লঞ্চ মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন (যাপ) সংস্থার সভাপতি গোলাম নবী আলমগীর সাংবাদিকদের জানান, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর যাত্রীবাহী লঞ্চের ভাড়া প্রথম ১০০ কিলোমিটারে কিলোমিটারপ্রতি ২ টাকা ৯৫ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৩ টাকা ১৮ পয়সা করা হয়েছে। অর্থাৎ কিলোমিটারপ্রতি ভাড়া বেড়েছে ২৩ পয়সা। আর ১০০ কিলোমিটারের পরের দূরত্বে কিলোমিটারপ্রতি ভাড়া ২ টাকা ৫২ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ২ টাকা ৭২ পয়সা করা হয়েছে, অর্থাৎ বেড়েছে ২০ পয়সা।
তিনি বলেন, জ্বালানি ও বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধির কারণে লঞ্চ পরিবহন মালিকরা দুঃসহ অবস্থার মধ্যে পড়েছেন। এ বিষয়ে সরকারের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনার পর নতুন ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে।
গোলাম নবী আলমগীর বলেন, ‘আগে ছিল ২ টাকা ৯৫ পয়সা। সেটা এখন করা হয়েছে ৩ টাকা ১৮ পয়সা পার কিলোমিটার। ১০০ কিলোমিটার পর্যন্ত। তারপরের স্ল্যাব হলো, ২ টাকা ৫২ পয়সা থেকে বেড়ে ২ টাকা ৭২ পয়সা।’
তিনি জানান, প্রথম ১০০ কিলোমিটারে কিলোমিটারপ্রতি ২৩ পয়সা এবং ১০০ কিলোমিটারের পরের দূরত্বে কিলোমিটারপ্রতি ২০ পয়সা ভাড়া বাড়ানো হয়েছে। নতুন ভাড়া বুধবার থেকেই কার্যকর হবে।
লঞ্চ মালিকদের এই প্রতিনিধি বলেন, ‘বর্তমানে যদিও এটা আমাদের সমস্ত কস্টের ভেতরে আসবে না, তবুও সরকারের অনুরোধে আমরা এ পর্যন্ত রাজি হয়েছি।’
‘আমাদের প্রস্তাব আরও বেশি থাকা সত্ত্বেও আমরা বর্তমান দেশের অবস্থায় এবং তেলের এই অবস্থায় মেনে নিয়েছি, আপাতত এটা চলুক।’
সর্বনিম্ন ভাড়া বাড়ানো হয়েছে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘সর্বনিম্ন ভাড়া ৩৫ টাকা। আগে সর্বনিম্ন ভাড়া ছিল ৩২ টাকা। সর্বনিম্ন দূরত্বও নির্ধারণ করা আছে ১০ কিলোমিটার। এরপর থেকে কিলোমিটার অনুযায়ী ভাড়া সমন্বয় হবে।’
সড়ক ও নৌপথের ভাড়ার পার্থক্য তুলে ধরে তিনি বলেন, নৌপথে রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় ও যাত্রার ধরন আলাদা। নৌপথে সর্বনিম্ন ১০ কিলোমিটার দূরত্ব বিবেচনায় ৩২ টাকা থেকে ৩৫ টাকা সর্বনিম্ন ভাড়া করা অযৌক্তিক নয়।
মন্ত্রী বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে জীবনযাত্রার ওপর চাপ পড়ে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে ভাড়া বাড়ানো অনেক ক্ষেত্রে অবধারিত হয়ে যায়। সরকার সেই চাপ যতটা সম্ভব কম রাখার চেষ্টা করেছে।
‘ভাড়া বৃদ্ধির নামে নৈরাজ্য অথবা তেলের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে বিধায় মালিকরা স্বেচ্ছাচারী ভাড়া বাড়াবে, সেটা আমরা হতে দেইনি। জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে এটাই আমাদের দায়িত্ব।’
রেলের ভাড়া বাড়ানোর বিষয়ে শেখ রবিউল আলম বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়লেও এখন পর্যন্ত রেলের ভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়নি। গতবার ডিজেলের দাম ১৫ টাকা বাড়ার পরও রেলের ভাড়া বাড়ানো হয়নি। এবারও ভাড়া না বাড়িয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা চাইব ভাড়াটা যাতে না বাড়িয়ে অ্যাডজাস্ট রাখা যায়। এখনো পর্যন্ত রেলের ব্যাপারে আমরা ভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিইনি। চেষ্টা করব এটা এইভাবে রাখতে।’
ফেরির ভাড়াও এখনই বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি বলে জানান মন্ত্রী। তিনি বলেন, ফেরিতে লোকসান হলেও জনস্বার্থে ভাড়া না বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা একেবারে অসম্ভব হয়ে পড়লে যৌক্তিকভাবে ভাড়া সমন্বয় করা হতে পারে।
এর আগে সড়কপথের ভাড়া বৃদ্ধির পর বাস মালিকরা নির্ধারিত ভাড়া মানছে কি না, তা মনিটরিং করা হচ্ছে বলেও জানান শেখ রবিউল আলম। তার দাবি, এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে পাওয়া রিপোর্ট সন্তোষজনক।
তিনি আরও বলেন, নৌযানের নতুন ভাড়ার চার্ট গেজেট হওয়ার পরই তৈরি হবে। বর্তমানে প্রতিটি লঞ্চে যে ভাড়ার চার্ট রয়েছে, নতুন ভাড়া অনুযায়ী সেটি হালনাগাদ করা হবে।
এর আগে ২৩ সেপ্টেম্বর ডিজেলচালিত বাস ও মিনিবাসে কিলোমিটারপ্রতি ভাড়া ১৭ পয়সা বাড়িয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে সরকার।
সরকার আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে। নতুন দামে ডিজেল, কেরোসিন, অকটেন ও পেট্রোলের দাম লিটারে ২০ টাকা করে বেড়েছে। মূল্যবৃদ্ধির ফলে ডিজেলের দাম ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৩৫ টাকা, অকটেন ১৬০ টাকা এবং পেট্রোলের দাম ১৫৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। নতুন দাম সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) থেকে কার্যকর হয়েছে।
টিআইএস