ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) সংগ্রহশালায় পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি প্রদর্শনকে কেন্দ্র করে নতুন করে বিতর্কে উত্তাল সামাজিক মাধ্যম ও রাজনৈতিক অঙ্গন। ইতিহাস সংরক্ষণ, রাজনৈতিক পরিচয় এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা মিলিয়ে কয়েক দিনের মধ্যেই বিষয়টি ছড়িয়ে পড়ে বৃহত্তর রাজনৈতিক আলোচনায়।
বিতর্কের সূত্রপাত হয় ১১ সেপ্টেম্বর, জিন্নাহর ৭৮তম মৃত্যুবার্ষিকীতে। এদিন ইনকিলাব মঞ্চ তাদের ফেসবুক পেজে জিন্নাহর একটি সাদাকালো ছবি প্রকাশ করে তাকে ‘শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায়’ স্মরণ করে। পোস্টে তাকে উপমহাদেশের গুরুত্বপূর্ণ রাজনীতিবিদ, দ্বিজাতিতত্ত্বের প্রবক্তা, পাকিস্তান রাষ্ট্রের অন্যতম স্বপ্নদ্রষ্টা ও দেশটির প্রথম গভর্নর জেনারেল হিসেবে উল্লেখ করা হয়। ডাকসুর বর্তমান নেতৃত্বের কয়েকজনের সঙ্গে ইনকিলাব মঞ্চের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক সম্পৃক্ততা থাকায় পোস্টটি আরও আলোচনার জন্ম দেয়। ডাকসুর মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনবিষয়ক সম্পাদক ফাতেমা তাসনিম জুমাও পোস্টটি শেয়ার করেছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
এর কয়েক দিন পর ডাকসু সংগ্রহশালায় জিন্নাহর তিনটি ছবি প্রদর্শনের বিষয়টি সামনে আসে। এর মধ্যে ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে দেওয়া তাঁর বক্তব্যের ছবিও ছিল। ওই বক্তব্যে জিন্নাহ পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুর পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে পূর্ব বাংলার ভাষা আন্দোলনের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
ছবি প্রদর্শনের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয় তীব্র প্রতিক্রিয়া। কেউ এটিকে পাকিস্তানি ভাবাদর্শের প্রত্যাবর্তন হিসেবে দেখেন, আবার কেউ মনে করেন, ঐতিহাসিক কোনো ব্যক্তির ছবি সংগ্রহশালায় রাখা মানেই তাকে শ্রদ্ধা বা সমর্থন করা নয়। বরং বিতর্কিত চরিত্রদেরও যথাযথ ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে সংরক্ষণ করা উচিত।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল জিন্নাহর ছবি প্রদর্শনের প্রতিবাদ জানিয়ে তা সরিয়ে ফেলার দাবি করে। তাদের বক্তব্য, ডাকসুকে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক গোষ্ঠীর আদর্শ চর্চার জায়গা হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না।
এর মধ্যেই সোমবার ডাকসু সংগ্রহশালায় গিয়ে জিন্নাহর তিনটি ছবি ছিঁড়ে প্রতিবাদ জানান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী আবু তৈয়ব হাবিলদার। তাঁর প্রশ্ন, ভাষা আন্দোলনের নায়কদের বাদ দিয়ে জিন্নাহর ছবি সেখানে কেন রাখা হয়েছে। ঘটনাটির পর সামাজিক মাধ্যমে অনেকে তাকে অভিনন্দন জানালেও ছবি ছিঁড়ে ফেলার পদ্ধতি নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।
ঘটনাকে ঘিরে সামাজিক মাধ্যমে ‘ডাকসু’কে ব্যঙ্গ করে ‘পাকসু’ বলার প্রবণতাও দেখা যায়। অন্যদিকে কেউ কেউ এমন প্রতিক্রিয়াকে অতিসরলীকরণ হিসেবে দেখছেন। তাঁদের মতে, একটি ঐতিহাসিক ছবি প্রদর্শনকে সরাসরি পাকিস্তানপন্থা হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায় না।
তবে এই বিতর্কের কেন্দ্রে এখন শুধু জিন্নাহর ছবি নেই। প্রশ্ন উঠেছে, বাংলাদেশের ইতিহাসকে কীভাবে উপস্থাপন করা হবে এবং বিতর্কিত ঐতিহাসিক চরিত্রদের জায়গা কোথায় হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের দীর্ঘ ইতিহাসের কারণে ডাকসুর সংগ্রহশালায় প্রদর্শিত একটি ছবিও তাই রাজনৈতিক ও প্রতীকী অর্থ বহন করছে।
জিন্নাহ বাংলাদেশের ইতিহাসে একই সঙ্গে পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা এবং বাঙালির ভাষা ও রাজনৈতিক অধিকারের ইতিহাসের বিতর্কিত চরিত্র। ফলে তার ছবি সরিয়ে ফেলা বা রেখে দেওয়া এখন রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক প্রশ্নে পরিণত হয়েছে। দেয়াল থেকে একটি ছবি সরানো গেলেও জিন্নাহকে ঘিরে বাংলাদেশের ইতিহাস, স্মৃতি ও রাজনৈতিক পরিচয়ের বিতর্ক যে এত সহজে শেষ হচ্ছে না, সাম্প্রতিক ঘটনাই তার প্রমাণ।
এসএস