ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের মালিকানা নিয়ে যুক্তরাজ্যের সঙ্গে দীর্ঘদিনের বিরোধ নতুন করে উসকে দিয়েছেন আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফকল্যান্ডের সার্বভৌমত্ব প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহাসিক নিরপেক্ষ অবস্থান পুনর্বিবেচনার ইঙ্গিত দেওয়ার পরই মিলে এ বিষয়ে কঠোর অবস্থান ঘোষণা করেন।
বৃহস্পতিবার রাতে স্থানীয় সময় জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক টেলিভিশন ভাষণে ট্রাম্পের মন্তব্যকে স্বাগত জানান মিলে। তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান পরিবর্তনের সম্ভাবনা প্রমাণ করে ওয়াশিংটনের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আর্জেন্টিনার জন্য সুফল বয়ে আনছে।
মিলে বলেন, আর্জেন্টিনা পশ্চিমা মূল্যবোধে বিশ্বাসী এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে থাকা একটি নির্ভরযোগ্য অংশীদার। আগামী কয়েক দশকে দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ মিত্র হয়ে উঠতে পারে। এ কারণেই ওয়াশিংটন তার অবস্থান পুনর্বিবেচনা করছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ট্রাম্পের মন্তব্যের পর ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের কাছে তেল অনুসন্ধান ও উত্তোলন প্রকল্প ঠেকাতে একাধিক পদক্ষেপের ঘোষণা দিয়েছেন মিলে।
দ্বীপগুলোর প্রায় ২২০ কিলোমিটার উত্তরে ‘সি লায়ন’ নামে একটি তেল প্রকল্প রয়েছে। ব্রিটিশ কোম্পানি রকহপার এক্সপ্লোরেশন এবং ইসরায়েলি কোম্পানি নাভিটাস পেট্রোলিয়াম আগামী কয়েক মাসের মধ্যে সেখানে খননকাজ শুরু করার পরিকল্পনা করছে। ২০২৮ সালে তেল উৎপাদন শুরুর লক্ষ্য রয়েছে তাদের।
আর্জেন্টিনার দাবি, যে সমুদ্র এলাকায় এই প্রকল্প পরিচালিত হচ্ছে, সেটি তাদের জলসীমার অংশ। তাই সেখানে তেল উত্তোলনকে অবৈধ সম্পদ আহরণ হিসেবে বিবেচনা করছে বুয়েনস এইরেস।
মিলে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, সমুদ্রের তলদেশে তেল অনুসন্ধানে জড়িত কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে আরও কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে। পাশাপাশি ফকল্যান্ডের কাছাকাছি আর্জেন্টিনার সামরিক উপস্থিতি জোরদার করতে দেশটির সর্বদক্ষিণের প্রদেশ তিয়েরা দেল ফুয়েগোতে একটি নৌঘাঁটির জন্য অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দের ঘোষণাও দিয়েছেন তিনি।
মিলে বলেন, “আর্জেন্টিনা চুপচাপ বসে থাকবে না। মালভিনাস দ্বীপপুঞ্জে (ফকল্যান্ড) যেকোনো অগ্রগতি আমাদের জাতীয় নিরাপত্তার লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হবে।”
ফকল্যান্ড ইস্যুতে মিলে নতুন করে কঠোর অবস্থান নেওয়াকে তার রাজনৈতিক অবস্থানের একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ, এর আগে যুক্তরাজ্যের সঙ্গে সম্পর্ক উষ্ণ করার চেষ্টা এবং ১৯৮২ সালের ফকল্যান্ড যুদ্ধে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচারের ভূমিকার প্রশংসা করায় নিজ দেশেই সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন তিনি।
১৯৮২ সালে আর্জেন্টিনা ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ দখল করার পর যুক্তরাজ্য ও আর্জেন্টিনার মধ্যে প্রায় দুই মাসব্যাপী যুদ্ধ হয়। ওই যুদ্ধে ৬৪৯ জন আর্জেন্টাইন সেনা, ২৫৫ জন ব্রিটিশ সেনাসদস্য এবং তিনজন দ্বীপবাসী নিহত হন। শেষ পর্যন্ত দ্বীপগুলোর নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করে যুক্তরাজ্য।
বর্তমানে ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ যুক্তরাজ্যের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। আর্জেন্টিনায় দ্বীপগুলো ‘মালভিনাস’ নামে পরিচিত।
ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের সার্বভৌমত্বের দাবি আর্জেন্টিনার এমন একটি বিষয়, যা দেশটির রাজনৈতিক বিভাজন অতিক্রম করে প্রায় সব পক্ষকেই একত্রিত করে। ফলে সাম্প্রতিক সময়ে জনপ্রিয়তা কমে যাওয়া এবং অর্থনীতি নিয়ে চাপের মধ্যে থাকা মিলে এই ইস্যুকে সামনে এনে রাজনৈতিকভাবে সুবিধা নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ভাষণে মিলে বলেন, তার রাজনৈতিক কর্মকৌশল নিয়ে মতবিরোধ থাকতে পারে এবং অর্থনীতি, বাজেট কিংবা বিনিময় হার নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কও থাকতে পারে। কিন্তু মালভিনাস ইস্যুতে দেশের সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে বিশ্বের সামনে অবস্থান নেওয়া প্রয়োজন।
আর্জেন্টিনার দাবি, তাদের সাবেক ঔপনিবেশিক শাসক স্পেনের কাছ থেকে দ্বীপগুলোর সার্বভৌমত্ব উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছে তারা। বুয়েনস এইরেসের ভাষ্য, ১৮৩৩ সাল থেকে যুক্তরাজ্য অবৈধভাবে দ্বীপগুলো দখল করে রেখেছে।
অন্যদিকে যুক্তরাজ্য আর্জেন্টিনার দাবি প্রত্যাখ্যান করে আসছে। ব্রিটিশ সরকারের অবস্থান হলো, দ্বীপবাসীদের নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকারই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং তারা ব্রিটিশ ভূখণ্ডের অংশ হিসেবেই থাকতে চায়।
২০১৩ সালের এক গণভোটে ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের প্রায় ৪ হাজার বাসিন্দার বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা যুক্তরাজ্যের অধীনে থাকার পক্ষে ভোট দেয়।
দশকের পর দশক ধরে ফকল্যান্ডের মালিকানা নিয়ে আর্জেন্টিনা ও যুক্তরাজ্যের বিরোধে যুক্তরাষ্ট্র নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রেখেছে। একই সঙ্গে দ্বীপগুলোর ওপর যুক্তরাজ্যের কার্যকর প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণকে স্বীকৃতি দিয়ে এসেছে ওয়াশিংটন।
তবে সোমবার ট্রাম্পকে এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান পুনর্বিবেচনা করা হচ্ছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, তিনি সব অবস্থানই নিয়মিত পর্যালোচনা করেন।
বৃহস্পতিবার ব্রিটিশ সম্প্রচারমাধ্যম জিবি নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারেও ফকল্যান্ড নিয়ে সরাসরি কোনো প্রতিশ্রুতি দেননি ট্রাম্প। ভবিষ্যতে ফকল্যান্ড নিয়ে যুক্তরাজ্য নতুন কোনো সংঘাতে জড়ালে যুক্তরাষ্ট্র ব্রিটেনের পাশে দাঁড়াবে কি না।এ প্রশ্ন এড়িয়ে তিনি ইরানে মার্কিন নেতৃত্বাধীন সামরিক অভিযানে যুক্তরাজ্যের পর্যাপ্ত সহায়তা না দেওয়ার অভিযোগ তোলেন।
ট্রাম্প বলেন, ওই অভিযানে যুক্তরাজ্য তাদের পাশে ছিল না এবং ব্রিটেনের কাছে প্রয়োজনীয় জাহাজ না থাকার বিষয়টি তাকে হতাশ করেছিল।
এর আগে এপ্রিলেও ফকল্যান্ড ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান পরিবর্তনের সম্ভাবনা সামনে এসেছিল। ফাঁস হওয়া একটি পেন্টাগন ই-মেইলে ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের সঙ্গে যুক্ত হতে অনিচ্ছুক ন্যাটো মিত্রদের ওপর চাপ তৈরির সম্ভাব্য উপায় হিসেবে ফকল্যান্ড নিয়ে মার্কিন নীতির পুনর্বিবেচনার কথা উল্লেখ করা হয়েছিল।
তবে ব্রিটিশ সরকারের অবস্থানে কোনো পরিবর্তন আসেনি। দেশটির প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহামের মুখপাত্র টম ওয়েলস বলেছেন, ফকল্যান্ডের সার্বভৌমত্ব নিয়ে যুক্তরাজ্যের অবস্থান দীর্ঘদিনের এবং এতে কোনো পরিবর্তন নেই। তার ভাষায়, “সার্বভৌমত্ব যুক্তরাজ্যের এবং দ্বীপবাসীদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারই সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ।”
এসএ/এফএস