ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র প্রায় সর্বাত্মক নজরদারি চালাতে সক্ষম বলে দাবি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। যুক্তরাষ্ট্রের নজরদারি ইরান এড়াতে পারবে না দাবি করে তিনি বলেন, এমনকি “ইরানিরা আমাদের নজর এড়িয়ে বাথরুমেও যেতে পারবে না।”
হোয়াইট হাউজের ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ট্রাম্প একথা বলেন। তিনি আরও বলেন, ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতে সর্বসাম্প্রতিক উত্তেজনা খুব বেশি দিন স্থায়ী হবে বলে তিনি মনে করেন না।
ট্রাম্প সতর্ক করে দিয়ে এও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র চাইলে ‘যে কোনও সময়’ ইরানে আবার হামলা চালাতে প্রস্তুত।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে জুলাইয়ের পর গত বুধবার সবচেয়ে বড় পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনার পর ট্রাম্প এসব কথা বললেন। ওই হামলায় ইরানে অন্তত ১৮ জন নিহত ও প্রায় ১০৮ জন আহত হয়েছে।
ইরানের দাবি, তাদের দক্ষিণ উপকূলের বিভিন্ন এলাকায় মার্কিন বাহিনী হামলা চালিয়েছে। এসব এলাকার মধ্যে হরমুজ প্রণালির কাছের এলাকাও রয়েছে এবং কুহেস্তাক শহরের একটি বিয়ের অনুষ্ঠানেও হামলা চালিয়েছে মার্কিন বাহিনী।
যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর ট্রাম্প বলেন, “আমরা তাদেরকে খুব কঠোরভাবে আঘাত করেছি।”
তিনি আরও দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র এখন হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণ করছে। এই জলপথটি ইরান কার্যত ছয় মাস ধরে অবরুদ্ধ করে রেখেছে।
ট্রাম্প বলেন, প্রতিদিন যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় বিপুলসংখ্যক জাহাজ হরমুজ প্রণালি পাড়ি দিচ্ছে এবং এর মাধ্যমে লাখ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন করা হচ্ছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এসব কার্যক্রম কোনও বড় ধরনের বাধা ছাড়াই চলছে।
তবে মাঝেমধ্যে ইরান ড্রোন হামলা চালালে যুক্তরাষ্ট্র তা ভূপাতিত করছে দাবি করে তিনি বলেন, “নিয়ন্ত্রণ আমাদের হাতেই রয়েছে, খুব শক্ত নিয়ন্ত্রণ।’
মার্কিন প্রেসিডেন্ট জানান, ইরান তাদের রাডার, ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থা এবং সমুদ্রে মাইন পাতার নতুন ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা করছিল। হরমুজ প্রণালির আশপাশে ইরানের এই তৎপরতা নস্যাৎ করা হয়েছে।
ট্রাম্প বলেন, হরমুজ প্রণালিতে থাকা সব মাইন সরিয়ে ফেলেছে যুক্তরাষ্ট্র। তার দাবি, ইরান এমন একটি রকেট তৈরির চেষ্টা করছিল, যেটি দিয়ে সমুদ্রে মাইন ফেলা যায়। কে এমন কাজ করে? আপনি কি কখনও এমন রকেট তৈরি করতে শুনেছেন, যা মাইন ফেলে? আমি কখনও শুনিনি। কিন্তু তারা সেটিই করছিল।
তিনি দাবি করেন, রকেটটি তৈরির কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে চলে গিয়েছিল। এরপরই যুক্তরাষ্ট্র সেটিকে ধ্বংস করে দেয়।
ইরানের সামরিক প্রস্তুতি সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্র কতটা তথ্য জানে তা বোঝাতে গিয়ে ট্রাম্প বলেন, ইরান কী করছে, তা যুক্তরাষ্ট্র দেখতে পাচ্ছে। তিনি দাবি করেন, আমরা দেখেছি তারা এটি তৈরি করছে। তারা যা করছে, তার সবই আমরা দেখি। তারা আমাদের নজরদারি এড়িয়ে নড়াচড়া করতে পারে না, এমনকি বাথরুমেও যেতে পারে না।
“তাই আমরা (ইরানের কার্যকলাপ) দেখেছিলাম এবং তা ধ্বংস করেছি। আরও কিছু জিনিসও আমরা ধ্বংস করেছি।”
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র শুধু সামরিক অভিযানেই থেমে নেই। তারা ইরানের অর্থনীতিকে আরও চাপে ফেলতে দেশটির বাণিজ্যিক অংশীদারদের ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপের হুমকি দিয়েছে।
এর মাধ্যমে ইরানের অর্থনৈতিক কার্যকলাপ, বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও তেল রপ্তানি থেকে আয় কমিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে যুক্তরাষ্ট্র।
ওদিকে, ট্রাম্পের আরও হামলার হুমকির মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলোতে পাল্টা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইরান। দেশটি কুয়েত, জর্ডান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন ও ইরাকের স্বায়ত্তশাসিত কুর্দিস্তান অঞ্চলে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে হামলা চালিয়েছে বলে দাবি করেছে।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টাপাল্টি হামলার কারণে চলমান যুদ্ধে অচলাবস্থা আরও গভীর হয়েছে। একদিকে, ইরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল রপ্তানির প্রধান পথে শক্ত নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোতে পাল্টা অবরোধ জোরদারের চেষ্টা করছে।
ইরানের নিরাপত্তাপ্রধান মোহসেন রেজায়ি যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করে বলেছেন, যুদ্ধে তেহরান নতুন কৌশল গ্রহণ করেছে। তার দাবি, এই নতুন কৌশল যুক্তরাষ্ট্রের ‘ভিত্তি ভেঙে দেবে’।
বৃহস্পতিবার কুয়েতের সেনাবাহিনী জানায়, তারা ইরান থেকে আসা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা ঠেকিয়েছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনও হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে জানিয়েছে, মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে।
ইরান জানিয়েছে, মার্কিন বাহিনীর হামলার জবাবে এবং ইরানি জনগণের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ‘অপরাধের’ প্রতিক্রিয়ায় এসব হামলা চালানো হয়েছে।
টিআইএস