আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ভারতের আদানি পাওয়ারের সঙ্গে করা বিদ্যুৎ কেনার চুক্তিকে ‘গর্হিত অপরাধ’ আখ্যায়িত করেছেন জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি।
তিনি বলেছেন, “এ চুক্তির জন্য বাংলাদেশকে উচ্চমূল্যে বিদ্যুৎ কিনতে হচ্ছে। দেশের স্বার্থে এ ধরনের চুক্তির অর্থনৈতিক চাপ থেকে বেরিয়ে আসতে সবার সহযোগিতা প্রয়োজন।”
বুধবার সংসদ ভবনে সাংবাদিকদের দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এ কথা বলেন। পরে সংসদ সচিবালয় থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
এর আগে জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেছিলেন, ভারতের আদানি পাওয়ারের সঙ্গে ‘অস্বাভাবিক মূল্যে’ করা বিদ্যুৎ চুক্তিটি সংশোধন অথবা আন্তর্জাতিক সালিশি আদালতের (আর্বিট্রেশন) দ্বারস্থ হওয়ার বিষয়টি সরকারের ‘সক্রিয়’ বিবেচনায় রয়েছে।
শাহজাহান চৌধুরীর এক প্রশ্নের জবাবে বিদ্যুৎমন্ত্রী বলেছিলেন, আদানি পাওয়ারের সঙ্গে স্বাক্ষরিত বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি পর্যালোচনায় একটি জাতীয় কমিটি কাজ করেছে। ওই কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চুক্তিটি দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারদরের তুলনায় ‘অস্বাভাবিক’ মূল্যে করা হয়েছিল।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) সঙ্গে আদানি পাওয়ারের ২৫ বছর মেয়াদি বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তিটি হয় ২০১৭ সালের নভেম্বরে। ভারতের ঝাড়খণ্ডে নির্মিত আদানির গোড্ডা বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বাংলাদেশে এই বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। তবে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এই চুক্তির শর্ত, বকেয়া পরিশোধ ও কয়লার দাম নিয়ে ব্যাপক টানাপড়েন চলছে।
চলমান জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় সরকারের ‘কিছুটা সময় প্রয়োজন’ মন্তব্য করে করে চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বুধবার বলেন, কোনো সরকারের পক্ষে মাত্র ছয় মাসে দীর্ঘদিনের সব সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয়।
“আপনার গভার্নমেন্টের বয়স ছয় মাস। ইচ্ছা করলাম, আমি দারুণভাবে চেষ্টা করলাম—আমি ছয় মাসে একটা বিদ্যুৎ প্ল্যান্ট করতে পারব? সবকিছু অনুকূলে থাকলেও একটা বিদ্যুৎ প্ল্যান্ট করতে দুই বছর লাগে মিনিমাম।”
বিগত সরকারের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ওই সময়ে দায়মুক্তির ব্যবস্থা রেখে এমন আইন করা হয়েছিল, যার ফলে এসব চুক্তির বিষয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ সীমিত হয়ে যায়। বিদ্যুৎ উৎপাদন না করেও ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধের কারণে জনগণের অর্থের ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হয়।
বৃহস্পতিবার থেকে তৃতীয় অধিবেশন
বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হতে যাওয়া জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে সংসদীয় কমিটি গঠনকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে বলে জানান চিফ হুইপ।
তিনি বলেন, “বিরোধী দলের পক্ষ থেকে সদস্যদের নাম পাওয়া মাত্রই সংশ্লিষ্ট কমিটিগুলো চূড়ান্ত করা হবে। অধিবেশনটি ৫, ৭ বা ১০ দিনের সংক্ষিপ্ত অধিবেশন হতে পারে; তবে প্রয়োজন হলে এর মেয়াদ বাড়ানো হবে।”
চিফ হুইপ জানান, তৃতীয় অধিবেশনে প্রায় ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ বিল উত্থাপিত হতে পারে। এর মধ্যে সম্পত্তি হস্তান্তর, গুম ও মানবাধিকার সুরক্ষা-সংক্রান্ত বিল উল্লেখযোগ্য।
সম্পত্তি হস্তান্তর-সংক্রান্ত প্রস্তাবিত আইনের বিষয়ে তিনি বলেন, বাবা-মা সন্তানকে সম্পত্তি লিখে দিলেও তারা জীবিত থাকা পর্যন্ত ওই সম্পত্তির ভোগদখল ও ব্যবহারের অধিকার বজায় রাখবেন। এর মাধ্যমে সম্পত্তি হস্তান্তরের পর বাবা-মায়ের প্রতি সন্তানের অবহেলা রোধের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
‘জুলাই সনদের’ ধারাবাহিকতায় জনগণ নির্বাচনি ইশতেহার দেখে ভোট দিয়েছে এবং তার ভিত্তিতেই তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন বলে মন্তব্য করেন চিফ হুইপ।
দেশের স্বার্থে প্রয়োজন হলে নতুন আইন প্রণয়ন এবং বিদ্যমান আইনে পরিবর্তন আনা হবে বলেও জানান তিনি।
সংবিধান সংশোধনের বিষয়ে চিফ হুইপ বলেন, “সংবিধানের একটি কমা, দাঁড়ি কিংবা সেমিকোলনের পরিবর্তনও সংবিধান সংস্কারের অংশ। জুলাই সনদে দক্ষিণ প্লাজায় সব রাজনৈতিক দল সম্মিলিতভাবে যে অঙ্গীকারে স্বাক্ষর করেছে, তার প্রতিটি বিষয় যথাযথভাবে বাস্তবায়নের লক্ষ্য রয়েছে।”
সংবিধান সংশোধনের জন্য ১৭ সদস্যের কমিটি গঠনের বিষয়টি তুলে ধরে চিফ হুইপ বলেন, সেখানে বিএনপি থেকে ৭ জন এবং জামায়াতে ইসলামী থেকে ৫ জন সদস্য থাকার কথা। অন্যান্য ছোট দল থেকেও একজন করে সদস্য রাখার কথা ভাবা হচ্ছে। বিরোধী দল তাদের সদস্যদের নাম দিলে তাদেরও কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।