গণশুনানিতে সৌরবিদ্যুৎভিত্তিক বেসরকারি মার্চেন্ট বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ বিক্রির ট্যারিফ ইউনিটপ্রতি ৬ টাকা ৪৮ পয়সা নির্ধারণের সুপারিশ করেছে বিইআরসির কারিগরি মূল্যায়ন কমিটি। কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী, সৌরভিত্তিক বাণিজ্যিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করা যাবে।
কারিগরি মূল্যায়ন কমিটির হিসাব অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিট স্থায়ী সম্পদের মূল্য ৩২৬ কোটি ৮ লাখ ৫০ হাজার টাকা। এর সঙ্গে নিয়ন্ত্রক কার্যকরী মূলধন বাবদ ৪৪ কোটি ৭২ লাখ ৪০ হাজার টাকা যোগ করে মোট মূল্যভিত্তি ধরা হয়েছে ৩৭০ কোটি ৮ লাখ ৯০ হাজার টাকা।
এই মূল্যভিত্তির ওপর প্রস্তাবিত মুনাফার হার ধরা হয়েছে ৮ দশমিক ৯৬ শতাংশ। এতে বিনিয়োগের বিপরীতে মুনাফা দাঁড়িয়েছে ৩৩ কোটি ২২ লাখ টাকা। জনবল, মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ, প্রশাসনিক ও সাধারণ ব্যয় বাবদ ১১ কোটি ২১ লাখ এবং অবচয় বাবদ ১৫ কোটি ৩৩ লাখ টাকা ধরা হয়েছে।
সব মিলিয়ে মোট রাজস্ব প্রয়োজন নির্ধারণ করা হয়েছে ৫৯ কোটি ৫৭ লাখ ২০ হাজার টাকা। অন্যান্য আয় হিসেবে ৯৮ লাখ টাকা বাদ দেওয়ার পর নিট রাজস্ব প্রয়োজন দাঁড়ায় ৫৯ কোটি ৪৭ লাখ ৪০ হাজার টাকা।
কমিটির হিসাবে সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিট উৎপাদন হবে ৯ কোটি ১৮ লাখ ৪০ হাজার ইউনিট। এই উৎপাদন ও নিট রাজস্ব প্রয়োজনের ভিত্তিতে বিদ্যুতের উৎপাদন ট্যারিফ ইউনিটপ্রতি ৬ টাকা ৪৮ পয়সা নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে।
ব্যাটারি সংরক্ষণের প্রস্তাব
সৌরবিদ্যুৎ শুধু দিনের বেলায় নয়, গ্রাহকের চাহিদা অনুযায়ী দিন-রাত সরবরাহ নিশ্চিত করার সুপারিশ করেছে কারিগরি মূল্যায়ন কমিটি। এ জন্য সৌরভিত্তিক বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন সক্ষমতার ১০ থেকে ২০ শতাংশ ক্ষমতার ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেম স্থাপনের প্রস্তাব করা হয়েছে।
কমিটির মতে, ব্যাটারি সংরক্ষণ ব্যবস্থা থাকলে দিনের বেলায় উৎপাদিত সৌরবিদ্যুৎ সংরক্ষণ করে রাতেও ব্যবহার করা সম্ভব হবে। এতে সৌরবিদ্যুতের সরবরাহ আরও নির্ভরযোগ্য হওয়ার পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়বে।
‘ডিমড জেনারেশন’-এর ক্ষতিপূরণ চায় বিএসআরইএ
বিএসআরইএ বলেছে, ডিআইএসকমের ত্রুটির কারণে ফিডিং ও ডিস্ট্রিবিউশন সাবস্টেশন অকার্যকর হলে এমপিপি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করেও তা গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হয় না। এ ধরনের পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদনের জন্য প্রস্তুত থাকা সত্ত্বেও বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে না পারলে ‘ডিমড জেনারেশন’-এর বিপরীতে ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা রাখতে হবে।
এমপিপি বন্ধ বা চুক্তি বাতিলের ক্ষেত্রেও বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি। তাদের প্রস্তাব অনুযায়ী, কোনো মার্চেন্ট পাওয়ার প্ল্যান্ট বন্ধ করার আগে কমপক্ষে ২০ বছরের নির্ধারিত মেয়াদ নিশ্চিত করতে হবে।
এ ছাড়া গ্রাহকদের কাছ থেকে ওপেন অ্যাকসেস ট্যারিফ পোস্ট-পেমেন্ট ভিত্তিতে ত্রৈমাসিক হারে আদায়ের প্রস্তাব দিয়েছে বিএসআরইএ।
উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ ব্যবহারের সুযোগ চায় সরকারি প্রতিষ্ঠান
মার্চেন্ট বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদিত অব্যবহৃত বা উদ্বৃত্ত বিদ্যুতের সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ সরকারি খাতের ইউটিলিটি প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যবহারের সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব করেছে সংগঠনটি। এ বিদ্যুতের মূল্য বিইআরসি নির্ধারিত গড় হারে পরিশোধের ব্যবস্থা রাখার দাবি জানিয়েছে তারা।
বিনিয়োগের আইনি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়, প্রকল্পের ডেভেলপার ও বিনিয়োগকারীর মধ্যে ত্রিপক্ষীয় সার্ভিস লিগ্যাল অ্যাগ্রিমেন্ট করার প্রস্তাবও দিয়েছে বিএসআরইএ।
সঞ্চালন লাইনে বিদ্যুৎ পরিবহনের সময় যে ক্ষতি হয়, তা বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) ও সরকারের মধ্যে ভাগ করে নেওয়ার প্রস্তাব করেছে সংগঠনটি। বিভিন্ন ভোল্টেজ পর্যায়ে বিদ্যুৎ সঞ্চালনের ক্ষেত্রে, যেমন ১৩২ কেভি থেকে ৩৩ কেভিতে, নির্ধারিত স্থির ভাড়া রাখারও প্রস্তাব দিয়েছে তারা। এই ভাড়া ওপেন অ্যাকসেস ট্যারিফের সঙ্গে সমন্বয়ের কথা বলা হয়েছে।
গ্রিডে নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের অগ্রাধিকার
গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের ক্ষেত্রে নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবি জানিয়েছে বিএসআরইএ। সংগঠনটির মতে, অন্যান্য গৌণ উৎসের আগে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ গ্রিডে ফিড করার সুযোগ দিতে হবে।
সৌরবিদ্যুৎ খাতে কর ও শুল্ক সুবিধায় সমতা আনারও প্রস্তাব করেছে সংগঠনটি। এ জন্য এসআরও ১৮১-এর ভাষা সংশোধন করে মার্চেন্ট পাওয়ার প্ল্যান্ট, স্বাধীন বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী (আইপিপি) এবং করপোরেট বা শিল্প খাতের সৌরবিদ্যুৎ গ্রাহকদের জন্য সৌরবিদ্যুৎ সরঞ্জাম ও গ্রিড-সংযুক্ত অবকাঠামো আমদানিতে অভিন্ন শুল্ক ও কর অব্যাহতি দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে এসআরও ৪০০ প্রবর্তনের মাধ্যমে ট্যারিফ শূন্য করার প্রস্তাবও দিয়েছে বিএসআরইএ।
অফ-টেকার বা বিদ্যুৎ ক্রেতা প্রতিষ্ঠান এমপিপিকে বিদ্যুতের মূল্য পরিশোধে ব্যর্থ হলে সরকারের হস্তক্ষেপের ব্যবস্থা রাখারও প্রস্তাব দিয়েছে সংগঠনটি। এ ক্ষেত্রে সরকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে এবং প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বন্ধ করার উদ্যোগ নেবে বলে প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিএসআরইএর মতে, নতুন ওপেন অ্যাকসেস ট্যারিফ ব্যবস্থা দেশের বিদ্যুৎ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে যেমন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে, তেমনি নতুন বিনিয়োগের সুযোগও সৃষ্টি করেছে। বিনিয়োগবান্ধব ও দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত কাঠামো তৈরি করা গেলে মার্চেন্ট পাওয়ার প্ল্যান্ট দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, শিল্পের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা এবং ২০৩০ ও ২০৪১ সালের নবায়নযোগ্য জ্বালানির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
-টিএস