প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর ঘিরে ঢাকা-দিল্লির কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়লেও সফরের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি। সফরের আগে দুই দেশের সম্পর্কের বিদ্যমান টানাপোড়েন নিরসনে দিল্লির কাছে তিনটি বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান চেয়েছে ঢাকা। ভারতের জবাবের ওপরই এখন নির্ভর করছে বহুল আলোচিত এই সফরের ভবিষ্যৎ।
চলতি আগস্টে প্রধানমন্ত্রীর দিল্লি সফর এবং আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠেয় ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের আউটরিচ পর্বে তার অংশগ্রহণ নিয়ে দুই দেশের কর্মকর্তাদের মধ্যে কয়েক সপ্তাহ ধরে আলোচনা চলছিল। এর মধ্যেই ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রকাশ্য বক্তব্য ও সংবাদ সম্মেলনকে কেন্দ্র করে ঢাকার অসন্তোষ নতুন করে সামনে আসে।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, দুই দেশের সম্পর্ককে সামনে এগিয়ে নিতে হলে আগে আস্থা ও পারস্পরিক বিশ্বাসের পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে দিল্লির কাছে তিনটি বিষয়ে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ চেয়েছে ঢাকা।
প্রথমত, মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশ-ভারত প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তরের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে বলেছে ঢাকা।
দ্বিতীয়ত, শরীফ ওসমান হাদি হত্যা মামলার প্রধান অভিযুক্তদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর দাবি জানানো হয়েছে।
তৃতীয়ত, দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে এবং পারস্পরিক আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠায় একটি অনুকূল রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পরিবেশ তৈরির ওপর জোর দিয়েছে বাংলাদেশ।
ঢাকার অবস্থান হচ্ছে, এসব বিষয়ে অগ্রগতি ছাড়া শীর্ষ পর্যায়ের সফর কাঙ্ক্ষিত ফল বয়ে আনবে না। ফলে প্রধানমন্ত্রীর সফর নিয়ে দিল্লির আনুষ্ঠানিক ও স্পষ্ট জবাবের অপেক্ষায় রয়েছে ঢাকা।
বাংলাদেশের এসব দাবির বিষয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, প্রত্যর্পণসংক্রান্ত অনুরোধগুলো ভারতের প্রচলিত আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে দুই দেশের মধ্যে ইতিবাচক, গঠনমূলক ও ভবিষ্যৎমুখী সম্পর্ক গড়ে তোলার প্রত্যাশার কথাও জানিয়েছে দিল্লি।
ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরের বিষয়ে আশাবাদ প্রকাশ করেছেন। তার মতে, দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে মতপার্থক্য থাকতেই পারে; তবে আলোচনার মাধ্যমেই সেগুলোর সমাধান সম্ভব।
দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নেয়ার প্রত্যাশাও ব্যক্ত করেছেন তিনি।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শেষ পর্যন্ত সফরটি অনুষ্ঠিত হলে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সরাসরি আলোচনা করার সুযোগ তৈরি হবে।
বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ, জ্বালানি সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থা নিয়ে নতুন উদ্যোগ আসতে পারে। একই সঙ্গে নেপাল ও ভুটান থেকে ভারতের ভূখণ্ড ব্যবহার করে বিদ্যুৎ আমদানির মতো বহুপক্ষীয় উদ্যোগেও অগ্রগতি হতে পারে।
দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত তিস্তা ও গঙ্গার পানি বণ্টন, সীমান্তে হত্যা এবং সীমান্ত ব্যবস্থাপনার মতো বিষয়গুলোও দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের সরাসরি আলোচনায় আসতে পারে।
অন্যদিকে, ঢাকা-দিল্লির মধ্যে প্রত্যর্পণসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে দৃশ্যমান অগ্রগতি না হলে প্রধানমন্ত্রীর সফর পিছিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। সে ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান আস্থার সংকট আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে।
বিশেষ করে ভারতে শেখ হাসিনার অবস্থান এবং তার রাজনৈতিক তৎপরতাকে ঘিরে ঢাকার অসন্তোষ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে আরও চাপ তৈরি করতে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে পানি বণ্টন, বাণিজ্য, সীমান্ত নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক যোগাযোগসহ অন্যান্য অমীমাংসিত বিষয়েও।
এছাড়া দক্ষিণ এশিয়ার পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের গতিপথের দিকে নজর রাখছে অন্য আঞ্চলিক শক্তিগুলোও।
প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর চূড়ান্ত হওয়ার বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সফরের বিষয়ে চূড়ান্ত তথ্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকেই জানানো হবে।
ফলে আপাতত দিল্লির আনুষ্ঠানিক জবাবের দিকেই তাকিয়ে ঢাকা। প্রত্যর্পণ, বিচারসংক্রান্ত সহযোগিতা এবং সম্পর্কের অনুকূল পরিবেশ তৈরির বিষয়ে ভারতের অবস্থান কতটা ইতিবাচক হয়, তার ওপরই অনেকটা নির্ভর করছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য দিল্লি সফর শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হবে কি না।