
সংগৃহীত ছবি
সরকারের নির্বাচনি ইশতেহার অনুযায়ী ১৮০ দিনের কর্ম পরিকল্পনার অংশ হিসেবে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় ও ১৫ টি বিষয় ভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে। তবে কাজের মধ্যে দুর্যোগের ক্ষতি পোশাতে বীমা ব্যবস্থা প্রবর্তন ও বিদ্যুত ব্যবহারে রিবেটে, জলাভুমি বন্দোবস্ত, মানসম্পন্ন ফিড উৎপাদন, মানসম্পন্ন পোনা উৎপাদন, অভয়াশ্রম সংরক্ষণ, গবাদিপশুর প্রতিষেধক তৈরিতে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে বলে মন্ত্রণালয় সূত্রে জানাগেছে।
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানাগেছে, এই মন্ত্রণালয়ের অন্যতম কাজ ছিল দেশের জলাধার গুলির সঠিক ব্যবস্থাপনা। সে জন্য সরকার ‘জাল যার জলা তার’ এই নীতিতে অগ্রসর হয়েছে। ইতোমধ্যে ২০ একরের বড় ২৭ হাজার ৯৬৯ টি এবং ২০ একরের ছোট ২৫ হাজার ৪৬৬ টি টিহ্নিত করা হয়েছে। এ জন্য ৭ হাজার ৮৪৬ টি জেলে সংগঠন তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।
সম্প্রতি এবিষয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, মৎস্যসম্পদকে বাঁচাতে হলে জলাশয়ের পরিবেশ রক্ষার নিশ্চিত করতে হবে। আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষ হয়তো মৎস্য পেশার সাথে জড়িত আছেন। মাছকে যদি আমরা বাঁচাতে চাই, আমাদের পরিবেশের প্রতিও খেয়াল রাখতে হবে, রক্ষা করতে হবে। তবেই আমরা আমাদের সন্তান, আমাদের মৎস্য, আমাদের পশু সকল কিছু নিয়ে একটি সুস্থ পরিবেশের মধ্যে বেড়ে উঠতে সক্ষম হব। মাছ চাষে স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, মাছ চাষ, মাছ ধরা, পরিবহন, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং বিক্রয় এই পুরো প্রক্রিয়ায় বহু মানুষের কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়েছে। নদীমাতৃক বাংলাদেশে পুকুর, বিল, হাওর, বাওর এবং অন্যান্য জলাশয় কাজে লাগিয়ে কিংবা অল্প জমি ব্যবহার করে মাছ চাষের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ রয়েছে। পাশাপাশি তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্দেশ্যে দেশে যত জলাশয় বিনা কারণে পড়ে আছে, সেগুলো সংস্কারের মাধ্যমে সরকারের পক্ষ থেকে মাছের পোনা ছাড়া হবে বলেও যোগ করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার মৎস্য, পশুসম্পদ এবং জলজ খাতকে অগ্রাধিকার তালিকায় রেখেছে। মৎস্য সেক্টরের বিকাশ এবং মৎস্য চাষি এবং জেলেদের জীবন-জীবিকার উন্নয়নে সরকার অত্যন্ত আন্তরিকভাবে এবং এরই অংশ হিসেবে মৎস্য চাষিদেরকে কৃষক কার্ডের আওতায় আনা হবে এবং হয়েছে এর মধ্যে। একই সঙ্গে জেলেদের পরিচয়পত্র প্রদান ও নিবন্ধন কার্যক্রমও চলমান রয়েছে।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের হাঁস মুরগি ও মৎস্য খামারের জন্য মান সম্পন্ন ফিড উৎপাদনে গুরুত্ব দিচ্ছে এর ধারাবাহীকতায় দেশের ৩০০ টি ফিড উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান পরিদর্শণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধরণ করা হলেও ইতোমধ্যে ২৭০ টি পরিদর্শন করা হয়েছে। যা থেকে ২১৫ টির নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। বিশেষ করে বাণিজ্যিকভাবে সফল (পাঙ্গাস) মাছের কম মূল্যে ফিড উৎপাদরে জন্য কাজ করছে সরকার। এ জন্য ৬০ টি ফিড মিল পরিদর্শও করেছেন সরকারি ককর্মকর্তারা। সংগ্রহ করেছে ৩০০ টির উপরে নমুনা। এছাড়াও দেশের সকল ফিডমিল গুলোকে একই ছাতার তলে আনার জন্য ডাটা বেইজ তৈরি করা হচ্ছে।
মৎস্য প্রক্রিয়াজাত শিল্প স্থাপনের মাধ্যমে ভ্যালু এ্যাডেড পণ্য তৈরিতে ওয়ার্ল্ড ফিশের একটি সমীক্ষা ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। এ বিষয়ে দ্রুত প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।
সূত্র জানায়, রোগমুক্ত পোনা উৎপাদন মৎস্য অধিদপ্তরের আর একটি পদক্ষেপ। এ জন্য দেশের হ্যাচারিগুলোতে পিসিআর ল্যাবগুলোকে আরো আধুনিক করার কাজ চলছে। দেশের ৬৪ টি জেলায় খামার ভিত্তিক মাছের রোগ নির্নয় ও প্রতিকারের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদের উৎপাদন মানসম্পন্ন করার জন্য এন্টিবায়োটিকের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি নিরাপদ মাছ ও মাংস উৎপাদনের জন্য প্রোবায়োটিক/প্রিবায়োটিক ব্যবহারে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এ জন্য দেশের ৬৪ জেলায় কার্যক্রম পরিচালনা হচ্ছে। এ জন্য ২১৩৫ টি প্রদর্শনী প্লট ও তৈরি করা হয়েছে।
বিশ্বের কাছে বাংলাদেশের চিংড়িকে ব্রান্ডিং করাসহ বিদেশের সুপারসপগুলোতে পৌছে দেয়ার লক্ষ্যে চিংড়ির ভ্যালু এ্যাডেড পণ্য তৈরি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এই মন্ত্রণালয়ের আর একটি উদ্যোগ হলো বীমা ব্যবস্থা। বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময়ে খামারিদের সর্বশান্ত হতে হয়। এ থেকে কিছুটা পরিত্রাণের জন্য মৎস্য, পোলট্রি ও ডেইরি শিল্পের বীমা ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে নীতিমালা তৈরি করে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রন সংস্থার কাছে পাঠানো হয়েছে।
সমুদ্র সম্পদ অর্জনের জন্য গুরুত্ব দিচ্ছে এই সরকার। এ জন্য দুটি সার্ভে জাহাজ ভাড়া করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে টুনা ও অন্য সাদা মাছ সংগ্রহের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য ইতোমধ্যে পরামর্শক নিয়োগ প্রক্রিয়াও চুড়ান্ত অনুমোদন পেয়েছে। সামুদ্রিক মৎস্য সম্পদ রক্ষায় সরকার নতুন করে কুয়াকাটা ও সলিমপুর সামুদ্রিক মৎস্য সম্পদের সংরক্ষিত এলাকা ঘোষণা করেছে।
জলবায়ু সহনশীল পরিবেশ রক্ষায় ২ লাখ ৩৮ হাজার ঘন মিটার খননের মাধ্যমে ৩৮ টি অভয়াশ্রম করা হয়েছে। যাতে ২০০ মেট্র্রিক টন পোনা ছাড়া হয়েছে। দেশে সকল উপজেলায় পশু রোগের ১৮ কোটি ডোজ প্রতিষেধক পাঠানো হয়েছে। ইতোমধ্যে সাড়ে ১৪ কোটি ডোজ প্রয়োগ করা হয়েছে বলে জানাগেছে। দেশের পোলট্রি, মৎস্য ও ডেইরি সেক্টরের উন্নয়নে সরকার নীতি সহায়তা ছাড়াও প্রনোদনা দেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এই শিল্পের বিদ্যুৎ বিলের উপরে ২০ শতাংশ রেয়াদ দেয়ার বিষয়ের কাজ করছে সরকার। পাশাপাশি এই সেক্টরে নারী, তরুণ এবং প্রবাসী উদ্যোক্তা তৈরি জন্য কাজ করছে। এছাড়াও সরকারি ও বেসরকারি অংশিদারিত্বেও ভিত্তিতে ফিড উৎপাদন ও ভ্যাকসিন প্লাট স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে উদ্যোক্তা সংগ্রহ করা হচ্ছে বলেও প্রাণি সম্পদ অধিদপ্তর সূত্রে জানাগেছে।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, এই সেক্টরের উন্নয়নে সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে। বিশেষ করে গুনগত মানের পণ্য উৎপাদন ও বাজার জাত করণে। ইতোমধ্যে বিএলআরআই উদ্ভাবিত এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা ও গোটপক্স ভ্যাকসিন বাণিজ্যিক উৎপাদনের মাধ্যমে খামারি পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পোল্ট্রি ও প্রাণিসম্পদ খাতে রোগব্যাধি নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে খামারিরা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন। তাই দেশীয়ভাবে কার্যকর ভ্যাকসিন উদ্ভাবন ও উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়ানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশীয় প্রযুক্তি ও গবেষণার মাধ্যমে উদ্ভাবিত এসব ভ্যাকসিন দেশের প্রাণিসম্পদ ও পোলট্রি খাতের রোগ নিয়ন্ত্রণ, উৎপাদন ব্যয় হ্রাস এবং ভ্যাকসিনের ক্ষেত্রে আমদানিনির্ভরতা কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এছাড়াও আমরা ফিডের মান উন্নয়নে অগ্রসর হচ্ছি। সকল ফিডমিলকে নিয়মনীতির মধ্যে নিয়ে আসা হবে। জলাভূমি বরাদ্দের ক্ষেত্রেও আমরা জাল যার জলা তার নীতিতে বরাদ্দের ব্যবস্থা করেছি।
জাতীয় মাছ ইলিশের উৎপাদন ও স্বাদ ধরে রাখতে নদী পুনঃখনন, পানির প্রবাহ বাড়ানো, জাটকা নিধন বন্ধ এবং কারেন্ট জালের ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধে জোর দিচ্ছে সরকার। একই সঙ্গে জেলেদের শুধু খাদ্য সহায়তার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বিকল্প কর্মসংস্থানের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেন, আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে আমরা ধীরে ধীরে স্বয়ংসম্পূর্ণতার দিকে এগিয়ে যাব। ওষুধ ও ভ্যাকসিন উৎপাদনে আমরা যত বেশি স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারব, উৎপাদন ব্যয় তত কমবে এবং এর প্রভাব খাদ্য ও প্রাণিসম্পদজাত পণ্যের দামের ওপর।
তিনি আরো বলেন, দেশের মৎস্য খাত বর্তমানে অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণে সক্ষমতা অর্জন করেছে। এখন মৎস্য ও মৎস্যজাত পণ্যের রপ্তানি বাড়ানোর দিকে গুরুত্ব দিতে হবে। এ জন্য পণ্য উৎপাদনে যাতে করে দাম কমানো যায় এ জন্য আমরা কাজ করছি। বিশেষ করে প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় খামারীদের ক্ষতি মোকাবিলায় বীমা ব্যবস্থা চালুর জন্যও আমরা কাজ করছি।
টিএস