বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামীর ত্যাগ আল্লাহ তায়ালা কবুল করেছেন। সংগঠনের শীর্ষ দায়িত্বশীলসহ নেতা-কর্মীদের ত্যাগ ও কুরবানির প্রেক্ষাপটে নতুন বাংলাদেশ গড়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এই সুযোগ কাজে লাগাতে দলের দায়িত্বশীলদের সতর্ক, সজাগ ও নৈতিক মানদণ্ডে দৃঢ় থাকতে হবে।
রোববার (৯ আগস্ট) গাজীপুরের একটি মিলনায়তনে জামায়াতের জেলা ও মহানগর আমির এবং নায়েবে আমিরদের নিয়ে তিন দিনব্যাপী কেন্দ্রীয় শিক্ষাশিবিরের সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। গত ৬ আগস্ট শুরু হওয়া এ শিক্ষাশিবির ৮ আগস্ট সন্ধ্যায় শেষ হয়।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জেলা আমিরসহ সংগঠনের দায়িত্বশীল ও রুকনদের নিজেদের অবস্থান মূল্যায়ন করতে হবে। আল্লাহ তায়ালা মুসলমানদের বিভিন্ন বিপদের মাধ্যমে পরীক্ষা করেন। কখনো এ পরীক্ষা সহজ হয়, আবার কখনো কঠিন হয়। মূলত মুমিনের জীবনের ময়লা পরিষ্কার করার জন্যই এ পরীক্ষা আসে। তাই এ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে।
তিনি বলেন, আল্লাহ তায়ালা তাঁর ইচ্ছায় জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ কয়েকজন দায়িত্বশীলকে তাঁর কাছে তুলে নিয়েছেন। তাদের ত্যাগ ও কুরবানির প্রেক্ষাপটে নতুন বাংলাদেশ গড়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে বাংলাদেশের তুলনায় কাশ্মীর, ফিলিস্তিন ও মিশরের মুসলমানরা আরও বেশি কষ্ট স্বীকার করছেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
‘ঈমান আরও মজবুত করতে হবে’দীর্ঘ সাড়ে ১৬ বছরের রাজনৈতিক পরিস্থিতির কথা তুলে ধরে জামায়াত আমির বলেন, ওই সময়ে জামায়াতে ইসলামী তিন ঘণ্টার জন্যও বসতে পারেনি। তিন দিনের কাজ তিন ঘণ্টায় করতে হয়েছে। অনেক সময় কাজ অসমাপ্ত রেখেই বের হয়ে যেতে হয়েছে। বর্তমান বাস্তবতায় নিজেদের মূল্যায়নের পাশাপাশি ঈমান আরও মজবুত করার আহ্বান জানান তিনি।
সংগঠনের জনশক্তিকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সংগঠনের আস্থার জায়গায় কেউ আঘাত করলে তার দিকে তাকানো হবে না। সর্বোচ্চ নৈতিক মানে পৌঁছানো সম্ভব না হলেও অন্তত ন্যূনতম নৈতিক মান বজায় রাখতে হবে।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে ব্যক্তির হালাল রুজি, পারিবারিক ও সামাজিক অবস্থান গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার পরামর্শ দেন তিনি।
দায়িত্বশীলদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, যেসব কাজে সন্দেহ থাকে, সেসব কাজ থেকে দূরে থাকা ভালো। সংগঠনের অভ্যন্তরীণ ফেতনার ব্যাপারেও সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।
‘জুলুম সহ্য করব না’প্রতিবেশী রাষ্ট্রের প্রসঙ্গে জামায়াত আমির বলেন, ‘প্রতিবেশীর হক আমরা স্বীকার করি। তবে আমাদের ওপর জুলুম করাকে সহ্য করব না।’
তিনি অভিযোগ করেন, একটি দেশ বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র অব্যাহত রেখেছে এবং দেশকে অস্থিতিশীল করতে ২৪ ঘণ্টা পাঁয়তারা করছে। তবে এ পরিস্থিতিতে উত্তেজিত না হয়ে ধৈর্যের সঙ্গে মোকাবিলা করার আহ্বান জানান তিনি। দায়িত্বশীলদের বক্তব্য দেওয়ার ক্ষেত্রেও সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন।
অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যবাদের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিদেশিরা উচ্চমূল্যে তাদের পণ্য কিনতে বাধ্য করার পাশাপাশি বাংলাদেশের সম্ভাবনাগুলো নিজেদের করায়ত্ত করতে চায়। তার ভাষ্য, সাম্রাজ্যবাদীদের বড় হাতিয়ার হলো মিডিয়া। শিক্ষা ও সংস্কৃতি ধ্বংসের মাধ্যমেও সাম্রাজ্যবাদ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হয়।
‘মুসলিম বিশ্বের ঐক্য প্রয়োজন’বিশ্ব পরিস্থিতি প্রসঙ্গে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বিশ্বব্যাপী ইসলামোফোবিয়া ছড়িয়ে পড়েছে। বর্তমান বিশ্ব অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং মুসলিম বিশ্ব সবচেয়ে বেশি চাপে রয়েছে।
তিনি বলেন, আগামীর বিশ্বব্যবস্থা কেমন হবে, তা ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের চলমান যুদ্ধের ফলাফলের ওপর নির্ভর করছে। মুসলিম বিশ্বকে ঐক্যবদ্ধভাবে বৈশ্বিক আগ্রাসন মোকাবিলার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, উম্মাহর স্বার্থে মুসলমানদের ঐক্য প্রয়োজন।
পররাষ্ট্রনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে দ্বিপক্ষীয় স্বার্থ সংরক্ষণের ওপর গুরুত্বারোপ করে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, জামায়াতে ইসলামী সব দেশের সঙ্গে সমতার ভিত্তিতে পারস্পরিক সম্মানজনক ও ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠায় বিশ্বাসী।
‘মানুষ একটি শক্ত আশ্রয় চায়’সমাজের প্রতি দায়িত্বশীলদের ভূমিকা তুলে ধরে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, সমাজ তাদের কাছে আমানত। তাই চোখ-কান খোলা রেখে আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইতে হবে। মানুষের ছোটখাটো বিষয়ের পরিবর্তে বড় বিষয়গুলোর দিকে নজর দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
তিনি বলেন, সমাজের সর্বস্তরে সুদ, ঘুষ, মানুষের ইজ্জতের ওপর হামলা এবং ব্যবসা-বাণিজ্য লুণ্ঠনের ঘটনা ঘটছে। এ কারণে মানুষ জামায়াতে ইসলামীর ওপর আস্থা রাখতে চায়। সংগঠনকে বিতর্কিত করতে বিভিন্ন ঘটনাকে শতগুণ বাড়িয়ে প্রচার করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জামায়াতের দায়িত্বশীলরা মানবিক হলে সংগঠনও মানবিক রূপ লাভ করবে। সংগঠন মানবিক হলে গোটা দেশও মানবিক হয়ে উঠবে।
শিক্ষাশিবিরে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আবদুল হালিম, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য অ্যাডভোকেট মতিউর রহমান আকন্দ ও অধ্যক্ষ মো. শাহাবুদ্দিন এবং কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ড. খলিলুর রহমান মাদানী বিষয়ভিত্তিক আলোচনা উপস্থাপন করেন।
সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার তাঁর বক্তব্যে বিএনপি সরকারের সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী নতুন বাংলাদেশে জনগণের যে প্রত্যাশা ছিল, বিএনপি সরকার তা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। বিশেষ করে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ঐতিহাসিক গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না করে বিএনপি জনগণের সঙ্গে দেওয়া প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিতে জনগণ হতাশ বলেও দাবি করেন মিয়া গোলাম পরওয়ার।
তিনি বলেন, দেশের জনগণ পরিবর্তনের প্রত্যাশা নিয়ে জামায়াতে ইসলামীর দিকে তাকিয়ে আছে। সেই প্রত্যাশা পূরণে দলের দায়িত্বশীলদের সততা, যোগ্যতা ও নৈতিকতার মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হতে হবে।
তিন দিনব্যাপী শিক্ষাশিবিরে কুরআন ও হাদীস স্টাডি ক্লাস, পুস্তক পাঠ এবং বিষয়ভিত্তিক গ্রুপ আলোচনায় অংশ নেন দলটির প্রতিনিধিরা।