সংসদের বিরোধী জোটের অংশগ্রহণ ছাড়াই সংবিধান সংশোধনের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু করছে সরকার। এ লক্ষ্যে গঠিত ১২ সদস্যের সংবিধান সংশোধন–সংক্রান্ত বিশেষ কমিটির প্রথম বৈঠক আজ মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) অনুষ্ঠিত হবে।
সংসদ ভবনের কেবিনেট কক্ষে দুপুর ১২টায় অনুষ্ঠেয় বৈঠকে সভাপতিত্ব করবেন কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ।
সংসদ সচিবালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রথম বৈঠকে সদস্যদের পরিচিতি, কমিটির কার্যপরিধি, কর্মপদ্ধতি এবং সংবিধান সংশোধনের রূপরেখা নিয়ে প্রাথমিক আলোচনা হবে। দ্বিতীয় বৈঠক থেকে সংশোধনী–সংক্রান্ত সুপারিশ প্রণয়নের কাজ শুরু হওয়ার পাশাপাশি পুরো প্রক্রিয়ার রোডম্যাপ চূড়ান্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
গত ১৩ জুলাই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনে ১২ সদস্যের এ বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির দায়িত্ব হলো সংবিধানের প্রয়োজনীয় সংশোধনের বিষয়ে সুপারিশ তৈরি করে সংসদে প্রতিবেদন উপস্থাপন করা। তবে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়নি।
সরকারি দল বিরোধী জোটকে কমিটিতে পাঁচজন সদস্য মনোনয়নের আহ্বান জানালেও তারা কোনো প্রতিনিধি দেয়নি। কমিটি গঠনের দিনই বিরোধী সদস্যরা সংসদ থেকে ওয়াকআউট করে জানায়, তারা সংবিধান সংশোধনের নয়, বরং সংবিধান সংস্কারের পক্ষে।
বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জুলাই জাতীয় সনদ ও গণভোটের ভিত্তিতে সংবিধান সংস্কার পরিষদের মাধ্যমে সংস্কার বাস্তবায়নের পক্ষে তারা অঙ্গীকারবদ্ধ। তাই বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব তারা প্রত্যাখ্যান করেছেন।
অন্যদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ বলেন, বর্তমান সংবিধানের কাঠামোর মধ্যেই প্রয়োজনীয় সংশোধন আনা হবে। এ লক্ষ্যে বিশেষ কমিটি বিচার বিভাগ, আইন বিশেষজ্ঞ, বুদ্ধিজীবী, সম্পাদক, বিভিন্ন অংশীজন এবং রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে মতবিনিময় করে সুপারিশ প্রণয়ন করবে। সেই সুপারিশের ভিত্তিতে সংবিধানের ১৮তম সংশোধনী বিল সংসদে উত্থাপন করা হবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, জুলাই-পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতায় নির্বাচনব্যবস্থা, রাষ্ট্রক্ষমতার ভারসাম্য, মৌলিক অধিকার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি ও ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণসহ বিভিন্ন বিষয়ে পরিবর্তনের দাবি জোরালো হয়েছে। তবে বিরোধী জোটের অনুপস্থিতিতে বিশেষ কমিটির আলোচনা কতটা অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সংবিধানের মতো মৌলিক বিষয়ে সর্বদলীয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে পুরো প্রক্রিয়ার গ্রহণযোগ্যতা আরও বাড়বে।
১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নের পর এ পর্যন্ত ১৭ বার সংশোধন করা হয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র সংস্কারের দাবির মুখে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সংবিধান, বিচার বিভাগ, পুলিশ, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), নির্বাচনব্যবস্থা ও জনপ্রশাসনসহ ১১টি খাতে সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়।
এসব কমিশনের সুপারিশ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা ও সংলাপের পর ২০২৫ সালের ১৭ অক্টোবর ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ গৃহীত হয়। পরে নভেম্বরে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ’ জারি করেন। এর ভিত্তিতে গণভোট অধ্যাদেশ জারি হয় এবং সংসদ সদস্যদের সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও শপথ নেওয়ার বিধান রাখা হয়। বিরোধী জোটের ৭৭ জন সদস্য উভয় শপথ গ্রহণ করলেও সরকারি দল বিএনপি জোটের সংসদ সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেননি।
-টিএস