ENGLISH EPAPER 📍 ঢাকা 📅 মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৭ ভাদ্র ১৪৩৩ তথ্য অধিদফতর নিবন্ধন নম্বর ০৬
শিরোনাম
Advertisement
নারী কি শুধু আন্দোলনের, না ক্ষমতায়নের প্রতীক?
✎ অবজারভার স্পেশাল
⏲ প্রকাশিত: সোমবার, ৩ আগস্ট, ২০২৬, ৬:৪১ পিএম আপডেট: ০৩.০৮.২০২৬ ৮:১৭ পিএম
প্রতীকী ছবি
X
Advertisement

প্রতীকী ছবি

বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারীদের দেখা যায় সর্বত্র। মিছিলে, সমাবেশে, নির্বাচনী প্রচারণায়, আন্দোলনের রাজপথে তাঁদের উপস্থিতি চোখে পড়ে। বাইরে থেকে দেখলে মনে হতে পারে, রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ অনেক বেড়েছে। কিন্তু রাজনীতির আসল চেহারা দেখা যায় অন্য জায়গায়। সিদ্ধান্ত কোথায় নেওয়া হচ্ছে, সেখানে কারা বসে আছেন, ক্ষমতা কার হাতে কেন্দ্রীভূত হচ্ছে- এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই বলে দেয় একটি রাষ্ট্রে নারীর প্রকৃত অবস্থান কোথায়।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে একটি বৈপরীত্য কাজ করছে। আন্দোলনের সময় নারীকে খুব প্রয়োজন হয়। তাঁর কণ্ঠ দরকার, সাহস দরকার, উপস্থিতি দরকার। কিন্তু আন্দোলন শেষ হলে ক্ষমতার সমীকরণ বদলে যায়। তখন নীতিনির্ধারণ, দলীয় সিদ্ধান্ত কিংবা রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে নারীর উপস্থিতি আগের মতো আর চোখে পড়ে না। এতে একটি প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই সামনে আসে। নারীরা কি সত্যিই রাজনীতির অংশীদার, নাকি তাঁদের উপস্থিতি অনেক ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক বৈধতা তৈরির একটি প্রতীক?

২০২৪ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলন এই প্রশ্নকে নতুন মাত্রা দেয়। আন্দোলনের অন্যতম দৃশ্যমান মুখ ছিলেন নারী শিক্ষার্থীরা। তাঁরা সাহসের সঙ্গে রাস্তায় নেমেছেন, দাবি তুলেছেন, নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন। তাঁদের অনেকেই বলেছিলেন, নারী কোটা প্রয়োজন নেই। পুরুষদের সঙ্গে সমান প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েই চাকরি অর্জন করতে চান।

এই আত্মবিশ্বাস অবশ্যই ইতিবাচক। কিন্তু আত্মবিশ্বাস আর সামাজিক বাস্তবতা এক বিষয় নয়।

বাংলাদেশে একজন নারী ও একজন পুরুষ একই জায়গা থেকে জীবন শুরু করেন না। একজন নারীকে চাকরির পরীক্ষার পাশাপাশি নিরাপত্তা, পারিবারিক চাপ, গৃহস্থালির দায়িত্ব, বিয়ে, মাতৃত্ব এবং সামাজিক বিধিনিষেধের সঙ্গেও লড়তে হয়। অনেক পরিবার এখনও মেয়ের পেশাজীবনকে ছেলের মতো গুরুত্ব দেয় না। ফলে কাগজে-কলমে প্রতিযোগিতা সমান হলেও বাস্তবের প্রতিযোগিতা অনেক সময় সমান থাকে না।

এই কারণেই বিশ্বের বহু দেশে নারীসহ পিছিয়ে থাকা বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর জন্য ইতিবাচক বৈষম্যের ব্যবস্থা রয়েছে। এর উদ্দেশ্য অযোগ্য কাউকে সুযোগ দেওয়া নয়। উদ্দেশ্য হলো দীর্ঘদিনের কাঠামোগত বৈষম্যের প্রভাব কিছুটা হলেও কমানো।

বাংলাদেশে সরকারি চাকরিতে নারী কোটার পেছনেও এই যুক্তিই ছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের কোটা সংস্কারের পর সরাসরি নিয়োগে সেই ব্যবস্থা আর বহাল থাকেনি। রাজনৈতিকভাবে এই পরিবর্তনের পক্ষে-বিপক্ষে নানা যুক্তি থাকতে পারে। কিন্তু এর সামাজিক প্রভাব নিয়ে আলোচনা এখনও খুব সীমিত।

যাঁরা নারী কোটা বাতিলের দাবিতে রাজপথে দাঁড়িয়েছিলেন, তাঁদের অনেকেই আজ নারী কোটার প্রয়োজনীয়তার কথা বলছেন। এটি শুধু মতের পরিবর্তন নয়। বাস্তব অভিজ্ঞতা মানুষকে অনেক সময় নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে।

৪৭তম বিসিএসের চূড়ান্ত ফলে বিভিন্ন ক্যাডারে ১ হাজার ৩৩৪ জনকে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে নারী প্রার্থী প্রায় ২২ শতাংশ। বাকি ৭৮ শতাংশ পুরুষ। একটি বিসিএসের ফলাফল থেকেই দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না। কারণ এর পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। তবু সংখ্যাটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলে। প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ স্তরে নারীর প্রতিনিধিত্ব কি ধীরে ধীরে কমছে?

এই প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ। কারণ প্রশাসন কেবল চাকরির ক্ষেত্র নয়। এখান থেকেই ভবিষ্যতের নীতিনির্ধারক, জেলা প্রশাসক, সচিব, কূটনীতিক, পুলিশ কর্মকর্তা ও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নকারী ব্যক্তিরা উঠে আসেন। সেখানে নারীর অংশগ্রহণ কমে গেলে রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াতেও তার প্রভাব পড়বে।

এদিকে গত দুই বছরে নারী অধিকার নিয়ে জনপরিসরের আলোচনাও অনেকটাই ম্লান হয়ে গেছে। নারী কমিশনের সুপারিশগুলো কার্যকর করার উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়। রাজনৈতিক দলগুলোর সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্তরেও নারীর নতুন অংশগ্রহণ খুব বেশি চোখে পড়ে না। অথচ আন্দোলনের সময় তাঁদের উপস্থিতি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এই বৈপরীত্যের মূল্যায়ন প্রয়োজন।

২০২৪ সালের পর দেশের বিভিন্ন স্থানে নারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতার বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটেছে। নারী ফুটবল টুর্নামেন্ট বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে বাধা এসেছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ধর্ষণের নথিভুক্ত ঘটনা আগের বছরের তুলনায় বেড়েছে। হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির ২০২৬ সালের প্রথমার্ধের প্রতিবেদনেও নারী ও কন্যাশিশুর বিরুদ্ধে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সহিংসতার তথ্য উঠে এসেছে।

এসব ঘটনার প্রতিটির জন্য ২০২৪ সালের আন্দোলনকে দায়ী করা গবেষণাগতভাবে সঠিক হবে না। সহিংসতার পেছনে আইনশৃঙ্খলা, বিচারহীনতা, সামাজিক মানসিকতা, রাজনৈতিক পরিবেশসহ নানা কারণ কাজ করে। কিন্তু এটাও অস্বীকার করা যায় না যে, গত দুই বছরে নারীর নিরাপত্তা, চলাচল ও সামাজিক অংশগ্রহণ নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সেই উদ্বেগকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার।

নারীর প্রতিনিধিত্ব কমে যাওয়ার প্রভাব সরকারি চাকরির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। প্রশাসনে নারী কমলে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় নারীর অভিজ্ঞতাও কম প্রতিফলিত হয়। একটি রাষ্ট্রের নীতি কেবল আইন দিয়ে তৈরি হয় না, মানুষের অভিজ্ঞতাও সেখানে কাজ করে। সেই অভিজ্ঞতার বৈচিত্র্য কমে গেলে নীতির পরিধিও সংকুচিত হয়।
এর সামাজিক প্রভাবও দীর্ঘমেয়াদি। যদি পরিবারে এই ধারণা তৈরি হয় যে উচ্চশিক্ষা নিয়েও মেয়েদের সামনে সুযোগ সীমিত, তাহলে অনেক ক্ষেত্রে তাঁদের শিক্ষায় বিনিয়োগের আগ্রহ কমতে পারে। বাড়তে পারে শিক্ষাঝরে পড়া, বাল্যবিবাহ কিংবা অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা। এগুলো একদিনে ঘটে না। কিন্তু ধীরে ধীরে সমাজের চরিত্র বদলে দেয়।

এই কারণেই নারীর ক্ষমতায়নকে শুধু নারী অধিকার বা চাকরির প্রশ্ন হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি শিক্ষা, অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য, পরিবার এবং রাষ্ট্রের সামগ্রিক উন্নয়নের প্রশ্ন।

২০২৪ সালের আন্দোলনের মূল্যায়নও তাই কেবল রাজনৈতিক সাফল্য বা ব্যর্থতার ভাষায় সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। শিক্ষা, কর্মসংস্থান, প্রশাসন, সংস্কৃতি এবং নারীর সামাজিক অবস্থানের ওপর এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব কী হয়েছে, তা নিয়ে স্বাধীন গবেষণা হওয়া দরকার। কারণ বড় রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রকৃত মূল্যায়ন হয় তার সামাজিক ফলাফল দিয়ে।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি খুবই সহজ।

রাজনীতি কি নারীকে ক্ষমতার অংশীদার হিসেবে দেখতে শিখেছে?

বাংলাদেশের প্রায় সব রাজনৈতিক দলের ক্ষেত্রেই এই প্রশ্ন প্রযোজ্য। ক্ষমতায় থাকুক বা বিরোধী দলে, নারীকে মিছিলের শক্তি হিসেবে সবাই মূল্য দেয়। কিন্তু সিদ্ধান্ত গ্রহণের টেবিলে সেই গুরুত্ব সব সময় প্রতিফলিত হয় না।

গণতন্ত্রের শক্তি শুধু ভোটে বা আন্দোলনে নয়। গণতন্ত্রের শক্তি নির্ভর করে ক্ষমতা কতটা অন্তর্ভুক্তিমূলকভাবে বণ্টিত হচ্ছে তার ওপর। যে রাষ্ট্র তার অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাভাবিক অংশ করে তুলতে পারে না, সেই রাষ্ট্র নিজের সম্ভাবনাকেও সীমিত করে।

নারীকে রাজপথে যেমন দরকার, রাষ্ট্র পরিচালনার টেবিলেও তেমনি দরকার। সেই বাস্তবতা প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত প্রশ্নটি থেকেই যাবে। নারী কি সত্যিই রাজনৈতিক অংশীদার, নাকি এখনও রাজনৈতিক প্রতীক?

-টিএস
 

Advertisement
Loading...
Loading...
আরো দেখুন
সম্পাদক: ইকবাল সোবহান চৌধুরী
অবজারভার লিমিটেডের পক্ষে সম্পাদক কর্তৃক গ্লোব প্রিন্টার্স, ২৪/এ, নিউ ইস্কাটন রোড, রমনা, ঢাকা থেকে প্রকাশিত।
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:আজিজ ভবন (৩য় তলা), ৯৩, মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা (সি/এ), ঢাকা-১০০০।

ফোন: পিএবিএক্স- ৪১০৫৩০০১-০৬; বিজ্ঞাপন: ৪১০৫৩০১২; ০১৭৯৩৩১৭৮২৯, ০১৫৫০৭০৭২৯১, ই-মেইল: [email protected], ‍[email protected] অনলাইন: ৪১০৫৩০১৪; ০১৫৫০৭০৭২৯৭ ই-মেইল: [email protected] ০১৫৫০৭০৭২৯৬
🔝
Advertisement