যে শহরের যানবাহনের গড় গতি সাধারণ মানুষের হাঁটার গতির প্রায় সমান, সেই রাজধানী ঢাকা রাতের আঁধার নামলেই রূপ নিচ্ছে বেপরোয়া গতির এক রক্তাক্ত উপত্যকায়। সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা সংগঠন রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের সম্প্রতি প্রকাশিত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এক শিউরে ওঠার মতো তথ্য। ২০২০ সাল থেকে গত সাড়ে ছয় বছরে রাজধানী ঢাকায় ১ হাজার ৮৪৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ১ হাজার ৩৮৪ জন মানুষ এবং আহত হয়েছেন আরও ২ হাজার ৪৮৮ জন। পরিসংখ্যান বলছে, এই মোট প্রাণহানির প্রায় ৮২ শতাংশই পথচারী এবং মোটরসাইকেল আরোহী, যা রাজধানীর সড়ক ব্যবস্থাপনার চরম নাজুক অবস্থাকেই আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, দিনের ব্যস্ত সময়ের চেয়ে রাতের ফাঁকা ও ভোরের সড়কেই ছোঁয়া মারছে মৃত্যুর মিছিল। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দুর্ঘটনায় নিহতের মধ্যে পথচারী ৫৯২ জন (৪২.৭৭ শতাংশ), মোটরসাইকেল আরোহী ৫৩৬ জন (৩৮.৭২ শতাংশ) এবং বাস, রিকশা, সিএনজি ইত্যাদির চালক ও যাত্রী ২৫৬ জন (১৮.৪৯ শতাংশ)। প্রাণহানির সময় পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, রাতে (রাত ১০টা থেকে ভোর) সবচেয়ে বেশি ৫১৯ জন (৩৭.৫ শতাংশ) প্রাণ হারিয়েছেন। মূলত এই সময়ে ঢাকার বাইরে থেকে আসা পণ্যবাহী ভারী ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান ও পিকআপগুলো শহরের প্রবেশমুখ দিয়ে বেপরোয়া গতিতে ঢুকে পড়ে, যার বলি হচ্ছেন সাধারণ পথচারীরা। এ ছাড়া সকালে ২৫৮ জন (১৮.৬৪ শতাংশ), দুপুরে ১৯৫ জন (১৪.০৮ শতাংশ), বিকেলে ১৭৪ জন (১২.৫৭ শতাংশ), ভোরে ১৪২ জন (১০.২৬ শতাংশ) এবং সন্ধ্যায় ৯৬ জন (৬.৯৩ শতাংশ) দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন। রোড সেফটি ফাউন্ডেশন চিহ্নিত করেছে যে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী, ডেমরা, মোহাম্মদপুর, কুড়িল বিশ্বরোড এবং বিমানবন্দর এলাকা এখন সড়ক দুর্ঘটনার সবচেয়ে বড় ‘হটস্পট’ বা মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে।
রাজধানীতে দুর্ঘটনায় সম্পৃক্ত যানবাহনের চালচিত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান-পিকআপ-ট্যাঙ্কার ও ময়লাবাহী ট্রাক ৩৩.২৫ শতাংশ এবং মোটরসাইকেল ২৬ শতাংশ দুর্ঘটনার সঙ্গে যুক্ত। এর পাশাপাশি বাস ২১.৭৫ শতাংশ, অটোরিকশা-সিএনজি-লেগুনা ১২.৭৩ শতাংশ এবং মাইক্রোবাস-প্রাইভেট কার-জিপ ৬.২৫ শতাংশ দুর্ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত।
অবাক করার বিষয় হলো, ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) তথ্য এবং বুয়েটের গবেষণা অনুযায়ী, যানজটের কারণে ঢাকার রাস্তায় বাসের গড় গতি এখন নেমে এসেছে মাত্র ৪.৮ থেকে ৯.৭ কিলোমিটারে, যা উন্নত শহরের গড় গতির তিন ভাগের এক ভাগ। কিন্তু দিনের বেলায় টানা ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থাকার ফলে চালকদের মানসিক অসহিষ্ণুতা ও ট্রিপ-ভিত্তিক আয়ের প্রতিযোগিতা রাতের ফাঁকা রাস্তায় তাণ্ডবে রূপ নেয়। ২০১৮ সালের নিরাপদ সড়ক আইনের সঠিক প্রয়োগ না হওয়া, পরিবহন খাতের সিন্ডিকেট, ফুটপাত দখল এবং পরিকল্পিত ‘বাস রুট রেশনালাইজেশন’ বা কোম্পানিভিত্তিক বাস সেবা পুরোপুরি চালু না হওয়া এই সংকটকে আরও গভীর করেছে।
বিশ্বব্যাংকের মতে, সড়ক দুর্ঘটনার কারণে প্রতি বছর দেশের জিডিপির প্রায় ২ থেকে ৩ শতাংশ ক্ষতি হচ্ছে এবং অসংখ্য পরিবার এক লহমায় হারাচ্ছে তাদের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষটিকে। জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনা অর্ধেক কমানোর কথা থাকলেও ঢাকার চিত্র ঠিক তার উল্টো।
এ বিষয়ে বুয়েটের এক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (ARI) সাবেক পরিচালক প্রফেসর ড. মো. হাদিউজ্জামান বলেন, ‘সারা দিন যানজটে আটকে থাকার পর রাতের ফাঁকা রাস্তায় চালকদের ওভারস্পিডিং বা বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানোর প্রবণতা অনেক বেড়ে যায়। বিশেষ করে ঢাকার ৫টি প্রবেশমুখে গতি নিয়ন্ত্রণ ও পথচারী পারাপারে প্রযুক্তিনির্ভর ট্রাফিক ব্যবস্থা জোরদার না করলে এই অকালমৃত্যু থামানো কঠিন হবে।’
একই বিষয়ে নগর পরিকল্পনাবিদ ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (BIP) সভাপতি ড. আদিল মোহাম্মদ খান বলেন, ‘বিশাল প্রাণহানির মধ্যে ৮০ শতাংশের বেশি পথচারী ও বাইকারদের মৃত্যু স্পষ্ট প্রমাণ করে যে ঢাকার সড়ক ব্যবস্থা পথচারীবান্ধব নয়। মেগাপ্রকল্পের পাশাপাশি সমতলে পারাপারের নিরাপদ ব্যবস্থা ও ফুটপাত দখলমুক্ত করা জরুরি।’
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান বলেন, ‘সিগন্যাল ছাড়ার পর এবং রাতে ও ভোরে ফাঁকা রাস্তায় চালকেরা বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। বাসে যাত্রী তোলা নিয়ে প্রতিযোগিতা বন্ধ ও পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার জন্য রুট রেশনালাইজেশনের মাধ্যমে কোম্পানিভিত্তিক বাস চালুর পাশাপাশি বিআরটিএ, ডিটিসিএ, সিটি করপোরেশন ও ট্রাফিক পুলিশের সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।’
এসএ