ENGLISH EPAPER 📍 ঢাকা 📅 শনিবার, ১ আগস্ট ২০২৬, ১৭ শ্রাবণ ১৪৩৩
শিরোনাম
Advertisement
পর্ব- ২
গুঁড়া দুধে ভেজাল: কতটা নিরাপদ শিশু খাদ্য?
✎ অবজারভার অনলাইন ডেস্ক
⏲ প্রকাশিত: শনিবার, ১ আগস্ট, ২০২৬, ২:০৩ পিএম আপডেট: ০১.০৮.২০২৬ ২:৫২ পিএম
সংগৃহীত ছবি
X

সংগৃহীত ছবি

শিশুর পুষ্টি নিশ্চিত করতে অভিভাবকেরা সাধারণত পরিচিত ও বিশ্বস্ত ব্র্যান্ডের গুঁড়া দুধের ওপর নির্ভর করেন। কারণ জীবনের প্রথম দিকের পুষ্টিই শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশের ভিত্তি তৈরি করে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে আদালতের রায়, ল্যাব পরীক্ষার ফলাফল এবং বিভিন্ন তদন্তে উঠে আসা তথ্য সেই আস্থাকে বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।

একদিকে একটি জনপ্রিয় ব্র্যান্ডের গুঁড়া দুধে গুরুতর মানগত অসঙ্গতি প্রমাণিত হওয়ায় আদালত সেটি বাজার থেকে প্রত্যাহারের নির্দেশ দিয়েছেন। অন্যদিকে আরও কয়েকটি ব্র্যান্ডের নমুনা নিয়েও বিভিন্ন প্রতিবেদনে প্রশ্ন উঠেছে। ফলে ভোক্তাদের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন- শিশু খাদ্যের বাজারে নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কতটা কার্যকর?

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) খাদ্য পরিদর্শকদের সংগ্রহ করা 'গোয়ালিনী ডেইলি ফুলক্রিম মিল্ক পাউডার'-এর নমুনা পরীক্ষায় গুরুতর অসঙ্গতি ধরা পড়ে।

পরীক্ষা প্রতিবেদনে দেখা যায়, পণ্যটিতে প্রকৃত দুগ্ধ উপাদান রয়েছে মাত্র ১৭ দশমিক ০৮ শতাংশ। একই সঙ্গে ৫৮ দশমিক ৯২ শতাংশ ভেজাল উপাদান এবং অন্যান্য উপাদানে ৮ দশমিক ৫২ শতাংশ অসঙ্গতি পাওয়া যায়। অর্থাৎ মোট ৬৭ দশমিক ৪৪ শতাংশ উপাদান নির্ধারিত মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, যেখানে দুগ্ধ চর্বি থাকার কথা প্রায় ৪২ শতাংশ, সেখানে পাওয়া গেছে মাত্র ৭ দশমিক ৫৮ শতাংশ। একইভাবে অন্তত ৩৪ শতাংশ দুগ্ধ প্রোটিন থাকার কথা থাকলেও পরীক্ষায় মিলেছে মাত্র ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের বিচ্যুতি কেবল মানগত ত্রুটি নয়; এটি ভোক্তার সঙ্গে প্রতারণারও ইঙ্গিত দেয়।

ল্যাব পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে বিশুদ্ধ খাদ্য আদালত 'গোয়ালিনী ডেইলি ফুলক্রিম মিল্ক পাউডার' বাজার থেকে প্রত্যাহারের নির্দেশ দেন এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে ৩ লাখ টাকা জরিমানা করেন।

এ ঘটনায় এসএ গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান মো. সাহাবুদ্দিন আলমের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি হয়। পরে তিনি আদালতে হাজির হয়ে দোষ স্বীকার করেন এবং সংশ্লিষ্ট পণ্য বাজার থেকে তুলে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন।

খাদ্য নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, আদালতের এই সিদ্ধান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির। কারণ এটি দেখিয়েছে, পরীক্ষাগারে প্রমাণিত মানগত অসঙ্গতির ক্ষেত্রে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব। তবে প্রশ্ন থেকেই যায়-এ ধরনের অভিযান কি নিয়মিত হচ্ছে, নাকি অভিযোগ ওঠার পরই কেবল ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে?

বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, তদন্তে আসলাম টি কোম্পানির ফুলক্রিম মিল্ক পাউডার, ডানো, ড্যানিশ, নেসলে ও স্টারশিপসহ আরও কয়েকটি ব্র্যান্ডের নমুনাও পরীক্ষায় মানদণ্ড পূরণ করতে পারেনি এবং সংশ্লিষ্ট আমদানিকারকদের বিরুদ্ধে মামলাও হয়েছে।

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো-  এসব ব্র্যান্ডের ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পূর্ণাঙ্গ পরীক্ষার ফলাফল বা চূড়ান্ত সরকারি প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়নি। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর আনুষ্ঠানিক বক্তব্যও সর্বসমক্ষে আসেনি।

ফলে এসব বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে সরকারি তদন্তের পূর্ণাঙ্গ ফলাফল প্রকাশ হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

খাদ্য নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বাজারে অনেক পণ্যের মোড়কে অবৈধভাবে বিএসটিআইয়ের লোগো ও কিউআর কোড ব্যবহার করা হচ্ছে।

এটি নিয়ন্ত্রণ সংস্থার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। কারণ অনেক ভোক্তা বিএসটিআইয়ের লোগো দেখেই পণ্যের মান সম্পর্কে নিশ্চিত হন। অথচ জাল লোগো ব্যবহার করলে সেই আস্থা সহজেই প্রতারণার হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।

এ কারণে ভোক্তাদের কিউআর কোড স্ক্যান করে নিবন্ধনের তথ্য যাচাই করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের জন্য তৈরি খাদ্যে মানহীন বা ভেজাল উপাদান থাকলে তার প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি হতে পারে।

অপুষ্টি, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমে যাওয়া, স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হওয়া, এমনকি কিডনি, লিভার ও মস্তিষ্কের বিকাশেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে জীবনের প্রথম কয়েক বছরে শিশুর খাদ্যের মান নিয়ে কোনো ধরনের আপস করার সুযোগ নেই।

বাংলাদেশ জাতীয় পুষ্টি পরিষদের উপপরিচালক ডা. মো. আকতার ইমামের মতে, শিশু খাদ্যে মানহীন উপাদান দীর্ঘমেয়াদে গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই নিয়মিত ল্যাবভিত্তিক পরীক্ষা এবং কঠোর বাজার তদারকি নিশ্চিত করা জরুরি।

বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, শিশু খাদ্যের মান নিশ্চিত করতে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।

তবে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো কয়েকটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে এনেছে-  বাজারে ভেজাল বা মানহীন পণ্য পৌঁছানোর আগেই কেন তা শনাক্ত করা যাচ্ছে না? উৎপাদন ও আমদানির প্রতিটি ধাপে মান নিয়ন্ত্রণ কতটা কার্যকর? পরীক্ষার ফলাফল নিয়মিত জনসমক্ষে প্রকাশ না হলে ভোক্তার আস্থা কীভাবে ফিরবে? অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়ার অগ্রগতি সম্পর্কে জনগণ কেন নিয়মিত তথ্য পায় না?

বিশ্লেষকদের মতে, শুধু অভিযান চালিয়ে জরিমানা করাই যথেষ্ট নয়। উৎপাদন, আমদানি, সংরক্ষণ, বিপণন এবং খুচরা বিক্রির প্রতিটি ধাপে সমন্বিত নজরদারি গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি পরীক্ষাগারের ফলাফল নিয়মিত প্রকাশ, দ্রুত বিচারিক ব্যবস্থা এবং দায়ী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পারলেই শিশু খাদ্যের বাজারে ভোক্তার আস্থা ফিরতে পারে।

বর্তমান পরিস্থিতি স্পষ্ট করে দিয়েছে, শিশু খাদ্যের নিরাপত্তা শুধু একটি বাণিজ্যিক বিষয় নয়; এটি জনস্বাস্থ্য, ভোক্তার অধিকার এবং রাষ্ট্রীয় নজরদারির কার্যকারিতারও একটি বড় পরীক্ষা।


-টিএস


Advertisement
Loading...
Loading...
আরো দেখুন
সম্পাদক: ইকবাল সোবহান চৌধুরী
অবজারভার লিমিটেডের পক্ষে সম্পাদক কর্তৃক গ্লোব প্রিন্টার্স, ২৪/এ, নিউ ইস্কাটন রোড, রমনা, ঢাকা থেকে প্রকাশিত।
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:আজিজ ভবন (৩য় তলা), ৯৩, মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা (সি/এ), ঢাকা-১০০০।

ফোন: পিএবিএক্স- ৪১০৫৩০০১-০৬; বিজ্ঞাপন: ৪১০৫৩০১২; ০১৭৯৩৩১৭৮২৯, ০১৫৫০৭০৭২৯১, ই-মেইল: [email protected], ‍[email protected] অনলাইন: ৪১০৫৩০১৪; ০১৫৫০৭০৭২৯৭ ই-মেইল: [email protected] ০১৫৫০৭০৭২৯৬
🔝