ENGLISH EPAPER 📍 ঢাকা 📅 মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট ২০২৬, ২০ শ্রাবণ ১৪৩৩
শিরোনাম
Advertisement
এলএনজি টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটি
শিল্পাঞ্চলে বড় বিপর্যয়, বন্ধের মুখে হাজারো কারখানা
সড়ক ও গৃহস্থালিতে হাহাকার
✎ অবজারভার প্রতিবেদক
⏲ প্রকাশিত: সোমবার, ২৭ জুলাই, ২০২৬, ১:২৯ পিএম আপডেট: ২৭.০৭.২০২৬ ১:৩৯ পিএম
সংগৃহীত ছবি
X

সংগৃহীত ছবি

মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে (এফএসআরইউ) কারিগরি ত্রুটি ও অগ্নিকাণ্ডের জের ধরে দেশের জ্বালানি খাতে স্মরণকালের অন্যতম বড় বিপর্যয় নেমে এসেছে। জাতীয় গ্রিডে এলএনজি সরবরাহ আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ায় এর সবচেয়ে বড় আঘাত এসে পড়েছে দেশের উৎপাদনশীল শিল্প খাতে। কলকারখানায় গ্যাস সরবরাহ তলানিতে নামায় ধসে পড়েছে উৎপাদন। এতে করে রফতানি আদেশ হাতছাড়া হওয়া, আন্তর্জাতিক বাজারে সুনাম ক্ষুণ্ন এবং বিপুল কর্মসংস্থান হারানোর আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। শিল্পাঞ্চলের এই ভয়াবহ রূপের পাশাপাশি গ্যাস সংকটের জেরে বাসাবাড়িতে রান্না বন্ধ এবং সড়কে সিএনজি ও ওবার চালকদের আয় থমকে গিয়ে দেশজুড়ে বহুমুখী অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকট তৈরি হয়েছে।

শিল্পাঞ্চলে হাহাকার 

রফতানি ব্যাহত, বন্ধের উপক্রম ৪০% কারখানা দেশের প্রধান প্রধান শিল্প বেল্টগুলোতে গ্যাসের অভাবে বয়লার, জেনারেটর ও উৎপাদন যন্ত্রপাতি চালানো কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়েছে। গাজীপুরের কালিয়াকৈর, কোনাবাড়ী, টঙ্গী, শ্রীপুর, মৌচাক এবং সাভার, আশুলিয়া, নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদীর কারখানাগুলোতে উৎপাদন ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। অনেক প্রতিষ্ঠান দিনে মাত্র কয়েক ঘণ্টা চালুর পর গ্যাস না পেয়ে কারখানা বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছে।

উদ্যোক্তাদের দেওয়া তথ্যমতে, দেশের অন্তত ৪০ শতাংশ শিল্প-কারখানা বর্তমানে আংশিক বা পুরোপুরি বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। নির্ধারিত সময়ে রফতানি আদেশ পাঠাতে না পারলে বিদেশি ক্রেতারা অর্ডার বাতিল করতে পারেন। এর ওপর বিলম্বের কারণে জরিমানা গোণা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হওয়ার চরম ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। বাধ্য হয়ে অনেক প্রতিষ্ঠান অতিরিক্ত খরচে ডিজেল বা এলপিজি ব্যবহার করছে, যা পণ্যের উৎপাদন খরচ বহুগুণ বাড়িয়ে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা নষ্ট করছে।

বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘বর্তমানে দেশের পোশাক ও টেক্সটাইল খাত শুধু গ্যাস সংকটেই নয়, অর্থায়ন ও নিরাপত্তা সংকটেও ভুগছে। কারখানা পুরোপুরি চালুই রাখা যাচ্ছে না, অথচ শ্রমিকদের বেতন-ভাতা নিয়মিত দিতে হচ্ছে। এভাবে দীর্ঘদিন চললে প্রতিষ্ঠানের কার্যকরী মূলধন শেষ হয়ে যাবে এবং বহু কারখানা চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে।

বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মহিউদ্দিন রুবেল গণমাধ্যমকে বলেন, ‘এই সংকট হঠাৎ তৈরি হয়নি; এটি দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতার ফল। পূর্বে আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ দেওয়া হলেও বিকল্প অবকাঠামো তৈরি করা হয়নি। সরকারের উচিত ক্ষতিগ্রস্ত শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোকে আর্থিক প্রণোদনা ও নীতিগত সুবিধা দেওয়া, যাতে এই বিশাল ক্ষতির চাপ উদ্যোক্তাদের একা বইতে না হয়।’

এছাড়াও স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি শেখ মাসাদুল আলম মাসুদ এবং সিরামিক ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মইনুল ইসলাম জানান, গ্যাসের চাপ শূন্যের কাছাকাছি নেমে আসায় তাদের বড় বড় স্টিল মিল ও সিরামিক কারখানাগুলোতে কাজ স্তব্ধ হয়ে পড়েছে।

 চাহিদার প্রায় ৪৫ শতাংশ গ্যাস গায়েব

পেট্রোবাংলা ও জ্বালানি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে দৈনিক প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে স্বাভাবিক সময়ে সরবরাহ করা হতো প্রায় ২৬৫ কোটি ঘনফুট। এই সরবরাহের একটি বড় অংশ—দৈনিক প্রায় ৯০ থেকে ১১০ কোটি ঘনফুট আসত মহেশখালীর দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের মাধ্যমে।

তবে এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত একটি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের কারণে এটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৪৫ কোটি ঘনফুট সরবরাহ কমে গেছে। ফলে বর্তমানে মোট গ্যাস সরবরাহ নেমে এসেছে মাত্র ২২০ কোটি ঘনফুটে। দুর্ঘটনার আগে যেখানে চাহিদার তুলনায় ৩০ শতাংশ ঘাটতি ছিল, তা এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৫ শতাংশে। তিতাসের শিল্পাঞ্চলগুলোতে যেখানে আগে ৭০-৮০ পিএসআই (PSI) চাপ পাওয়া যেত, তা এখন ২০-২৫ পিএসআইয়ে নেমে এসেছে।

পরিবহন খাতে স্থবিরতা 

সিএনজি ও ওবার চালকদের আয়ে টান শিল্পের পাশাপাশি চরম বিপর্যয় নেমে এসেছে গণপরিবহন ও রাইড শেয়ারিং খাতে। সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে গ্যাস বিক্রির জন্য ন্যূনতম ১৫ পিএসআই চাপের প্রয়োজন হলেও বর্তমানে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ২ থেকে ৫ পিএসআই। ফলে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, নরসিংদী, ময়মনসিংহ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও টাঙ্গাইলসহ বিভিন্ন জেলার বেশিরভাগ সিএনজি পাম্প বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছেন মালিকরা।

পাম্পে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেও গাড়ি পূর্ণ রিফিল করতে পারছেন না চালকরা। এর ওপর বাজারে এলপিজি সিলিন্ডারের যোগান কমে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন এলপিজি দিয়ে চালিত ওবার ও ভাড়ায় চালিত ড্রাইভাররা।

মিরপুরের সিএনজি অটোরিকশা চালক আমজাদ হোসেন (৪২) বলেন, ‘গ্যাসের পাম্পে ৪-৫ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও ফুল ট্যাংক গ্যাস পাচ্ছি না। প্রেসার না থাকায় গাড়ি গতি পায় না। দিনশেষে যে টাকা আয় হয়, তা দিয়ে গাড়ির মালিকের প্রতিদিনের জমার টাকাই উঠে না। সিএনজি না চললে আমরা খাব কী? মালিক জমার জন্য চাপ দিচ্ছে, আর আমরা সংসার চালানো নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি।’

ভাড়ায় প্রাইভেটকার ও ওবার চালক শহীদুল ইসলাম বলেন, ‘আমার গাড়িটা এলপিজি সিলিন্ডারে চলে। কিন্তু দুই দিন ধরে বাজারে গ্যাসের সিলিন্ডারই খুঁজে পাচ্ছি না। ট্রিপ মারতে পারছি না বলে আয়-রোজগার পুরো বন্ধ। গাড়ির কিস্তির টাকা শোধ করব কীভাবে, আর পরিবারের মুখে খাবারই বা দেব কীভাবে—তা বুঝে উঠতে পারছি না।’

বাসাবাড়িতে হাহাকার 

বাজারে এলপিজি সিলিন্ডারের কৃত্রিম সংকট রাজধানী ঢাকার প্রায় প্রতিটি এলাকাতেই আবাসিক গ্রাহকরা গ্যাস সংকটে দিশেহারা। মিরপুর, মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি, কলাবাগান, কাঁঠালবাগান, মগবাজার, বাড্ডা, রামপুরা, বাসাবো, ওয়ারী, যাত্রাবাড়ী, লালবাগ ও পুরান ঢাকার বিভিন্ন অঞ্চলে ভোর থেকে শুরু করে গভীর রাত পর্যন্ত চুলায় একফোঁটা গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। দুপুরের রান্নার জন্য মধ্যরাত পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে, অথবা চড়া দামে হোটেল থেকে খাবার কিনে আনতে হচ্ছে।

পাইপলাইনের গ্যাস না থাকায় মানুষ এলপিজি সিলিন্ডার ও ইন্ডাকশন কুকারের ওপর ভরসা করতে চাইলেও বাজারে দেখা দিয়েছে এলপিজি সিলিন্ডারের তীব্র কৃত্রিম ও প্রাতিষ্ঠানিক ঘাটতি।

ওয়ারীর বাসিন্দা সীমা আক্তার বলেন, ‘সকাল থেকে চুলা একদম ঠান্ডা। বাচ্চাদের স্কুলের টিফিন তো দূরের কথা, দুপুরের ভাতও বসাতে পারি নাই। গ্যাসের সিলিন্ডার কিনতে গিয়ে দেখি দোকানে সিলিন্ডারই নাই। আর যেখানে পাইছি, সেখানে নির্ধারিত দামের চেয়ে অতিরিক্ত টাকা চাচ্ছে। শেষমেশ হোটেল থেকে বাধ্য হয়ে খাবার কিনে এনে বাচ্চাদের খাইয়েছি।’

ক্ষুদ্র ব্যবসা ও বিদ্যুৎ খাতে প্রভাব

সংকটের ধাক্কা লেগেছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের ওপরও। রাজধানীর হোটেল-রেস্তোরাঁ, বেকারি এবং প্রক্রিয়াজাত খাদ্য প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোতে উৎপাদন নেমে এসেছে অর্ধেকের নিচে।

অন্যদিকে, গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন কমে প্রায় চার হাজার মেগাওয়াটে নেমে এসেছে (আগে যা ছিল ৫-৬ হাজার মেগাওয়াট)। পেট্রোবাংলা জানায়, বিদ্যুৎ খাতে দৈনিক ৯০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের জায়গায় এখন দেওয়া হচ্ছে মাত্র ৭০ কোটি ঘনফুট। ফলে আগামী দিনে গরম বাড়লে এবং কারখানা পূর্ণ চালুর চেষ্টা হলে দেশজুড়ে লোডশেডিং আশঙ্কাজনকভাবে বাড়তে পারে।

কেন বারবার এই সংকট? বিশেষজ্ঞদের মত

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম ও ড. ইজাজ হোসেন মনে করেন, গত ছয় বছরে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে দৈনিক উৎপাদন প্রায় ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুট কমেছে। দেশীয় গ্যাসের অনুসন্ধান ও উত্তোলনে জোর না দিয়ে আমদানিকৃত এলএনজির ওপর অতি-নির্ভরশীল হওয়ার কারণেই আজ এক টার্মিনাল বিকল হতেই পুরো জাতীয় অর্থনীতি জিম্মি হয়ে পড়েছে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘উচ্চ মূল্য দিয়েও উদ্যোক্তারা নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস পাচ্ছেন না—এটি অত্যন্ত উদ্বেগের। শুধু এলএনজি আমদানি বাড়িয়ে এর সমাধান সম্ভব নয়; বরং এতে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়ে। জ্বালানি নিরাপত্তাকে এখন শিল্পনীতি ও রফতানি কৌশলের সঙ্গে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করতে হবে এবং স্বচ্ছ অগ্রাধিকার কাঠামো প্রণয়ন করা জরুরি।’

পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে লাগবে আরও দুই সপ্তাহ

পেট্রোবাংলা ও তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত এলএনজি টার্মিনালের স্পর্শকাতর কেব্‌ল ও বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি মেরামতের জন্য যুক্তরাজ্য থেকে তিন সদস্যের বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী দল এসে কাজ করছেন।

তবে কারিগরি মেরামতের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক কোম্পানির ইন্স্যুরেন্সজনিত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে আরও অন্তত ১০ থেকে ১৫ দিন সময় লাগবে। ততদিন পর্যন্ত দেশের শিল্প, পরিবহন ও আবাসিক খাতে এই ভোগান্তি বজায় থাকার আশঙ্কা রয়েছে।

তবে সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী বর্তমান সংকটের তাৎক্ষণিক কারণ এলএনজি টার্মিনালের যান্ত্রিক ত্রুটি হলেও দীর্ঘমেয়াদে আমদানিনির্ভরতা কমাতে নতুন গ্যাসকূপ খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকার ১০০টি নতুন গ্যাসকূপ খননের পরিকল্পনা নিয়েছে। পাশাপাশি মাতারবাড়ীতে স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ এবং অতিরিক্ত এফএসআরইউ স্থাপনের উদ্যোগও এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

এসএ



Advertisement
Loading...
Loading...
আরো দেখুন
সম্পাদক: ইকবাল সোবহান চৌধুরী
অবজারভার লিমিটেডের পক্ষে সম্পাদক কর্তৃক গ্লোব প্রিন্টার্স, ২৪/এ, নিউ ইস্কাটন রোড, রমনা, ঢাকা থেকে প্রকাশিত।
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:আজিজ ভবন (৩য় তলা), ৯৩, মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা (সি/এ), ঢাকা-১০০০।

ফোন: পিএবিএক্স- ৪১০৫৩০০১-০৬; বিজ্ঞাপন: ৪১০৫৩০১২; ০১৭৯৩৩১৭৮২৯, ০১৫৫০৭০৭২৯১, ই-মেইল: [email protected], ‍[email protected] অনলাইন: ৪১০৫৩০১৪; ০১৫৫০৭০৭২৯৭ ই-মেইল: [email protected] ০১৫৫০৭০৭২৯৬
🔝