রাজধানীর বৃহৎ সরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা নিতে আসা অসহায় রোগী ও তাদের স্বজনদের সরলতার সুযোগ নিচ্ছে একশ্রেণি সুসংগঠিত দালাল চক্র। শয্যা-সংকট, বিশেষ করে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) ও নবজাতকদের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (এনআইসিইউ) অপ্রতুলতাকে পুঁজি করে রোগীদের প্রলোভন ও ভয় দেখিয়ে ঢাকার বিভিন্ন গলির ভেতরে থাকা নামসর্বস্ব বেসরকারি ক্লিনিকে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। সেখানে চিকিৎসার নামে আদায় করা হচ্ছে মোটা অঙ্কের টাকা। বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও কাঙ্ক্ষিত সেবা না পেয়ে প্রতারিত ও নিঃস্ব হচ্ছে হাজারো পরিবার। বিভিন্ন সময় এসব চক্রের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হলেও কঠোর আইনি ব্যবস্থার অভাবে জামিনে বেরিয়ে তারা আবারও একই অপরাধে জড়াচ্ছে। বর্তমানে এমন একাধিক চক্র সক্রিয় রয়েছে, যারা কমিশনের বিনিময়ে নির্দিষ্ট কিছু বেসরকারি ক্লিনিকে নিয়মিত রোগী পাঠায়।
সম্প্রতি শ্যামলীর একটি বেসরকারি ক্লিনিকে অক্সিজেন গ্যাস লিকেজের ঘটনায় এক শিশুর মৃত্যুর পর এই চক্রের ভয়াবহতা নতুন করে সামনে এসেছে। কাগজে-কলমে ২০ শয্যার হাসপাতাল বলা হলেও বাস্তবে সেখানে কোনো সাধারণ শয্যা নেই। এনআইসিইউ ও পিআইসিইউ (শিশুদের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র)-এর ১০টি শয্যা নিয়ে মূলত বাণিজ্য চালানো হচ্ছে। এখানে ভর্তি হওয়া সিংহভাগ রোগীই সরকারি হাসপাতাল থেকে দালালদের মাধ্যমে এসেছে। এমনই এক ভুক্তভোগী নেত্রকোনার রহিমা বেগম। ঢাকা মেডিকেলের গাইনি ওয়ার্ডে সিজারের পর তার নবজাতকের তীব্র শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে দায়িত্বরত চিকিৎসকেরা দ্রুত এনআইসিইউর পরামর্শ দেন। এই সুযোগে ওয়ার্ডের সামনে ওত পেতে থাকা কিছু ভুয়া পরামর্শদাতা রহিমা বেগমের স্বামীকে ভুল বুঝিয়ে বলেন যে সরকারি হাসপাতালে কোনো শয্যা খালি নেই এবং সেখানে রাখলে বাচ্চার ক্ষতি হতে পারে। তাদের কথায় বিভ্রান্ত হয়ে স্বজনরা শিশুটিকে শ্যামলীর ‘বেবি কেয়ার’ নামের একটি হাসপাতালে ভর্তি করান। দিনে আট হাজার টাকা খরচের কথা বলা হলেও মাত্র তিন দিনে প্রায় ৫০ হাজার টাকা বিল করা হয়। গত ২৩ জুন সেখানে যান্ত্রিক ত্রুটিতে গ্যাস ছড়িয়ে পড়লে এক শিশুর মৃত্যু হয় এবং অন্য শিশুদের তড়িঘড়ি করে পাশের আরেকটি হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। স্বজনরা সেখান থেকে চলে যেতে চাইলে কর্তৃপক্ষ প্রথমে বাধাও দেয়।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ওই ভবনের একটি তলাতেই পাশাপাশি দুটি ক্লিনিক চলছে। পুরো ভবনটিতে একাধিক হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার রয়েছে, যার পরিবেশ কোনো সুচিকিৎসার উপযোগী নয়। এর আগেও ভুয়া চিকিৎসক দিয়ে অস্ত্রোপচার করার অপরাধে এই ভবনেরই একটি প্রতিষ্ঠান সিলগালা করা হয়েছিল। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন কর্মকর্তা স্বীকার করেন, এখানে কোনো স্থায়ী চিকিৎসক নেই এবং সব রোগীই দালালের মাধ্যমে আনা হয়।
অন্যদিকে, ঢাকা মেডিকেলের জরুরি বিভাগের সামনে ট্রলি ও অ্যাম্বুলেন্সের জটলার মধ্যেই চলে আরেকটি চক্রের তৎপরতা। সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে কুষ্টিয়া থেকে আসা যুবক তারেক রহমানের ক্ষেত্রে এমনটি ঘটে। জরুরি বিভাগে প্রাথমিক চিকিৎসার পর তার মাথার আঘাত গুরুতর দেখে চিকিৎসকেরা আইসিইউর খোঁজ নিতে বলেন। ঠিক তখনই হাসপাতালের কর্মী পরিচয়ে কয়েকজন দালাল তার বৃদ্ধ বাবার পাশে এসে দাঁড়ায়। তারা ভয় দেখিয়ে বলে, ‘সরকারি হাসপাতালে সিরিয়াল পেতে পেতে রোগী মারা যাবে, আমাদের চেনা ভালো ডাক্তার আছে।’ ঢাকার পরিবেশ সম্পর্কে কোনো ধারণা না থাকায় অসহায় বাবা তাদের কথায় রাজি হয়ে যান এবং একটি বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্সে করে রোগীকে কাঁটাবনের একটি ক্লিনিকে নিয়ে যান। কিন্তু ক্লিনিকে নেওয়ার পর আইসিইউর নামে দৈনিক ১২ থেকে ১৩ হাজার টাকা দাবি করা হয়। মাত্র পাঁচ দিনেই বিল আসে ১ লাখ ৫২ হাজার টাকা। আংশিক টাকা পরিশোধের পর রোগীকে সাধারণ শয্যায় দেওয়ার অনুরোধ করা হলেও পুরো টাকা না দেওয়া পর্যন্ত হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ রোগীকে এক প্রকার জিম্মি করে রাখে এবং প্রতিবাদ করলে ভয়ভীতি দেখায়।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সরকারি হাসপাতালের জরুরি বিভাগ, প্রসূতি ওয়ার্ড এবং এনআইসিইউর সামনেই এই চক্রের তৎপরতা সবচেয়ে বেশি। ঢাকার বাইরের রোগীরাই মূলত এদের প্রধান লক্ষ্য। হাসপাতাল থেকে কোনো নির্দিষ্ট ক্লিনিকে রোগী পাঠাতে পারলে রোগীপ্রতি ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত কমিশন বা অর্থ পাওয়া যায়। এই অর্থ কয়েকটি স্তরে ভাগ হয়, যার মধ্যে রয়েছে রোগী বহনকারী নির্দিষ্ট অ্যাম্বুলেন্স চালক, মূল দালাল এবং হাসপাতালের ওয়ার্ডবয় বা আয়া শ্রেণির কিছু অসাধু কর্মী। এছাড়া রোগীকে ওয়ার্ড থেকে গোপনে অ্যাম্বুলেন্স পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়ার বিনিময়ে ট্রলি চালকদের একটি অংশ বড় অঙ্কের টাকা পায়। এদের মধ্যে দৈনিক মজুরিভিত্তিক কর্মী যেমন রয়েছে, তেমনি কেউ কেউ নিজেদের সরকারি কর্মচারী পরিচয় দিয়ে স্বজনদের আস্থা অর্জন করে। এই চক্রের সদস্যরা শহরের বিভিন্ন রুটে বিভক্ত হয়ে রামপুরা, কাঁটাবন, চানখাঁরপুল, যাত্রাবাড়ী, শ্যামলী ও পান্থপথের বেশ কিছু নির্দিষ্ট বেসরকারি ক্লিনিকে প্রতিদিন এভাবে রোগী পাঠাচ্ছে। এসব ক্লিনিকের বেশির ভাগই বহুতল ভবনের মাত্র এক বা দুটি তলা বা কক্ষ ভাড়া নিয়ে পরিচালনা করা হচ্ছে, যেখানে সাধারণ চিকিৎসার চেয়ে আইসিইউ বা এনআইসিইউর নামে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থাপনাই প্রধান।
অনুরূপ এক ঘটনায়, সড়ক দুর্ঘটনায় আহত এক তরুণকে আইসিইউ সংকটের কথা বলে পান্থপথের একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হয়। মাথার অস্ত্রোপচারের নামে তিন লাখ টাকা দাবি করা হলেও পরদিন সকালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। মৃত্যুর পর চার লাখ টাকার বিল ধরিয়ে দেওয়া হয় এবং টাকা পরিশোধ করতে না পারায় প্রায় আট ঘণ্টা লাশ আটকে রাখা হয়। পরে পুলিশ ও গণমাধ্যমকর্মীদের হস্তক্ষেপে আংশিক টাকা পরিশোধের পর লাশ হস্তান্তর করা হয়।
সরকারি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের মতে, ধারণক্ষমতার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি রোগীর চাপ এবং আইসিইউ শয্যার সীমাবদ্ধতার কারণেই দালাল চক্র এই সুযোগটি নিচ্ছে। প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক অস্ত্রোপচার ও জটিল রোগী আসলেও সেই তুলনায় বিশেষায়িত শয্যা অত্যন্ত অপ্রতুল। চিকিৎসকেরা যখন নিরুপায় হয়ে অন্য কোথাও শয্যা খোঁজার পরামর্শ দেন, ঠিক তখনই চক্রটি সক্রিয় হয়। দালাদের প্রতিরোধে আনসার ও গোয়েন্দা সংস্থার সদস্য নিয়োজিত থাকলেও লোকবলের সংকটের সুযোগ নেয় তারা। মাঝেমধ্যে অভিযান চালিয়ে পুলিশে দেওয়া হলেও আইনি ফাঁকফোকরে তারা দ্রুত জামিন পেয়ে আবার একই পেশায় ফিরে আসে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সুনির্দিষ্ট ও লিখিত অভিযোগ না পাওয়ায় অনেক সময় তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়। তবে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করে বেশ কিছু ভুয়া প্রতিষ্ঠান ও দালালকে শাস্তির আওতায় আনা হয়েছে এবং এই তৎপরতা চলমান থাকবে।
সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানান, দেশের প্রায় সব বড় সরকারি হাসপাতালেই শয্যা সংখ্যার তুলনায় দ্বিগুণ বা তিনগুণ রোগী ভর্তি থাকে। অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং সচেতনতার অভাবে সাধারণ মানুষ সহজেই চতুর দালালদের ফাঁদে পা দেয়। এটি একটি বহুমাত্রিক ও দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা। এর স্থায়ী সমাধানের জন্য একদিকে যেমন সরকারি হাসপাতালের সক্ষমতা ও শয্যা সংখ্যা বাড়াতে হবে, অন্যদিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগে কঠোর আইন প্রয়োগ করতে হবে।
এসএ