বিশ্বের সবচেয়ে কম বাসযোগ্য শহরগুলোর তালিকায় আরও একবার নিচের সারিতেই রয়েছে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা। লন্ডনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (ইআইইউ) প্রকাশিত ২০২৬ সালের গ্লোবাল লিভেবিলিটি ইনডেক্স অনুযায়ী, ১৭৩টি শহরের মধ্যে ঢাকার অবস্থান ১৭১তম। ১০০ নম্বরের মধ্যে শহরটির সামগ্রিক স্কোর ৪২। ঢাকার নিচে রয়েছে শুধু যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়ার দামেস্ক ও লিবিয়ার ত্রিপোলি।
মঙ্গলবার প্রকাশিত এ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্বাস্থ্যসেবা, গণপরিবহন, নগর ব্যবস্থাপনা ও জীবনযাত্রার মানে বিশ্বের বিভিন্ন শহর অগ্রগতি অর্জন করলেও সেই ধারা থেকে পিছিয়ে রয়েছে ঢাকা। বরং গত কয়েক বছর ধরে আন্তর্জাতিক বাসযোগ্যতা সূচকে ধারাবাহিকভাবে অবনতি ঘটছে রাজধানীর।
ইআইইউর তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে ১৪০টি শহরের মধ্যে ঢাকার অবস্থান ছিল ১৩৭তম। ২০২২ সালে ১৭২টি শহরের মধ্যে ১৬৬তম, ২০২৩ সালেও একই অবস্থানে ছিল। ২০২৪ সালে নেমে যায় ১৬৮তম স্থানে। ২০২৫ সালে ১৭১তম অবস্থানে পৌঁছায় এবং ২০২৬ সালেও একই অবস্থানে রয়েছে।
প্রতিবেদনে পাঁচটি সূচকের ভিত্তিতে শহরগুলোর বাসযোগ্যতা মূল্যায়ন করা হয়েছে। ঢাকার স্কোর হলো—স্থিতিশীলতায় ৪৫, স্বাস্থ্যসেবায় ৪২, সংস্কৃতি ও পরিবেশে ৪১, শিক্ষায় ৬৭ এবং অবকাঠামোয় মাত্র ২৭। বিশেষ করে অবকাঠামো খাতে নিম্ন স্কোর রাজধানীর সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। সড়ক, গণপরিবহন, পানি, বিদ্যুৎ, বাসস্থান ও নগরসেবার মানের ঘাটতি এ অবস্থার জন্য দায়ী বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এবারের প্রতিবেদনে বিশ্বের গড় বাসযোগ্যতার স্কোর ৭৬ দশমিক ১-এ অপরিবর্তিত রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে স্থিতিশীলতা সূচকে কিছুটা অবনতি হলেও স্বাস্থ্যসেবায় উন্নতির ফলে সামগ্রিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল রয়েছে। সবচেয়ে বেশি অগ্রগতি হয়েছে এশিয়া অঞ্চলে। তবে সেই অগ্রগতির সুফল থেকে কার্যত বিচ্ছিন্ন রয়েছে ঢাকা।
বর্তমানে এশিয়ার ৫৮টি শহরের গড় স্কোর প্রায় ৭৪ হলেও ঢাকার স্কোর মাত্র ৪২। দক্ষিণ এশিয়ার বড় শহরগুলোর মধ্যেও ঢাকার অবস্থান সবচেয়ে নিচের দিকে। পাকিস্তানের করাচি রয়েছে ১৭০তম স্থানে, যা ঢাকার এক ধাপ ওপরে।
এ বছরের তালিকায় টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বের সবচেয়ে বাসযোগ্য শহর নির্বাচিত হয়েছে ডেনমার্কের রাজধানী কোপেনহেগেন। এরপর রয়েছে অস্ট্রিয়ার ভিয়েনা, অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন ও সিডনি এবং সুইজারল্যান্ডের জুরিখ।
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, অতিরিক্ত জনঘনত্ব, দুর্বল গণপরিবহন, পরিবেশ দূষণ, জলাবদ্ধতা এবং নগর ব্যবস্থাপনায় সমন্বয়হীনতাই ঢাকার নিম্ন অবস্থানের প্রধান কারণ।
ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, নাগরিক সুবিধা ও জনঘনত্বের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা যাচ্ছে না। বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ) এবং বিদ্যমান আইন কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত না হওয়ায় নগর উন্নয়ন কাঙ্ক্ষিত মানে পৌঁছাচ্ছে না। পাশাপাশি শৃঙ্খলাবদ্ধ গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে না ওঠায় যানজট ও নাগরিক দুর্ভোগ আরও বাড়ছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক আকতার মাহমুদ বলেন, নাগরিক সেবা প্রদানকারী সংস্থাগুলোর জবাবদিহির অভাব এবং অবকাঠামোগত দুর্বলতার কারণে ঢাকার বাসযোগ্যতায় উল্লেখযোগ্য উন্নতি হচ্ছে না। বর্তমান পরিস্থিতিতে অদূর ভবিষ্যতেও বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তনের সম্ভাবনা সীমিত।
এসআর