একটি দেশের টেকসই উন্নয়নের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো কার্যকর আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা। নাগরিকের জানমাল ও সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ কিংবা সামাজিক স্থিতিশীলতা- কোনোটিই দীর্ঘমেয়াদে সম্ভব নয়। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর অভিজ্ঞতাও একই বার্তা দেয়—আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ছাড়া উন্নয়নের বিকল্প নেই।
আধুনিক মালয়েশিয়ার রূপকার মাহাথির মোহাম্মদ ক্ষমতায় এসেই আইনশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন। আন্তর্জাতিক নানা সমালোচনা সত্ত্বেও তিনি অপরাধ দমনে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেন। তার বিশ্বাস ছিল, জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে উন্নয়নের কোনো পরিকল্পনাই সফল হতে পারে না। পরবর্তীতে মালয়েশিয়ার অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা সেই নীতিরই বাস্তব প্রতিফলন।
শুধু মালয়েশিয়া নয়, বিশ্বের প্রায় সব সফল অর্থনীতির ক্ষেত্রেই শক্তিশালী আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও আইনের কার্যকর প্রয়োগই অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের অন্যতম পূর্বশর্ত। বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় এই শিক্ষা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।
২০২৪ সালের জুলাইয়ের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দেশের মানুষ একটি নিরাপদ, শান্তিপূর্ণ ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশের প্রত্যাশা করেছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন স্থানে আইনহীনতা, মব কালচার এবং প্রশাসনিক অস্থিরতা জনজীবনে উদ্বেগ তৈরি করে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বিচার বিভাগ, সচিবালয়, শিল্প ও সাংস্কৃতিক অঙ্গন- বিভিন্ন ক্ষেত্রেই অস্থিতিশীলতার প্রভাব পড়ে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে অর্থনীতিতেও।
এই প্রেক্ষাপটে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জনগণ শান্তি, নিরাপত্তা ও সুশাসনের প্রত্যাশা থেকে নতুন সরকারকে দায়িত্ব দেয়। সরকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিলেও বাস্তবতায় এখনো কাঙ্ক্ষিত স্থিতিশীলতা পুরোপুরি ফিরে আসেনি। যদিও গত কয়েক মাসে কিছু ক্ষেত্রে উন্নতির লক্ষণ দেখা গেছে, তবুও সাম্প্রতিক অপরাধের পরিসংখ্যান উদ্বেগের কারণ হয়ে রয়েছে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সরকারের প্রথম ১০০ দিনে অপরাধের হার ছিল ঊর্ধ্বমুখী। মার্চ ও এপ্রিল মাসে দেশে ৬০৫টি হত্যাকাণ্ড, ২৯৪টি ছিনতাই, ৯০টি ডাকাতি এবং ১৯৬টি অপহরণের ঘটনা ঘটে। একই সময়ে পুলিশের ওপর হামলার ১২৯টি এবং চুরির ২ হাজার ২১৪টি ঘটনা রেকর্ড করা হয়। পাশাপাশি নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটে ৩ হাজার ৪৯৬টি, যার মধ্যে ধর্ষণের ঘটনাও রয়েছে।
বাংলাদেশ সিভিল রাইটস সোসাইটির (বিসিআরএস) তথ্যও একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করে। সংস্থাটির হিসাবে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত চার মাসে দেশে ১ হাজার ১৪২টি হত্যাকাণ্ড, ৩৪৭টি অপহরণ, ১৮৪টি ছিনতাই এবং ৫৯১টি ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। একই সময়ে নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলা হয়েছে প্রায় ৬ হাজার। এসব পরিসংখ্যান ইঙ্গিত দেয়, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এখনো বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সরকারের আন্তরিক উদ্যোগ থাকা সত্ত্বেও পূর্ববর্তী প্রশাসনিক কাঠামোর নানা দুর্বলতা এখনো পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসনের কিছু স্তরে দক্ষতা, সমন্বয় এবং কার্যকারিতা আরও বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে।
বিচার বিভাগেও সংস্কারের গতি প্রত্যাশার তুলনায় ধীর বলে অনেকের মত। বিশেষ করে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি বিভিন্ন সময় আলোচনায় এসেছে। গত ২৩ জুন আপিল ও হাইকোর্ট বিভাগে দায়িত্ব পালনকারী ১৮ জন আইন কর্মকর্তার একযোগে পদত্যাগের ঘটনা বিচারব্যবস্থার কার্যক্রম নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এবং নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য ব্যবসাবান্ধব ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। শিল্প-কারখানায় অগ্নিসংযোগ, চাঁদাবাজি, দখলবাজি কিংবা সাংবাদিকদের ওপর হামলার মতো অপরাধের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয় নয়, আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগই হওয়া উচিত প্রধান বিবেচ্য বিষয়। অপরাধী যে-ই হোক, তার বিরুদ্ধে দ্রুত ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া আইনের শাসনের প্রতি জনগণের আস্থা বাড়াবে।
জনগণের প্রত্যাশা পূরণে সরকারকে আইন প্রয়োগে আরও দৃঢ়, নিরপেক্ষ ও কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে। কারণ, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা শুধু অপরাধ দমনের বিষয় নয়; এটি বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং রাষ্ট্রের সামগ্রিক উন্নয়নের ভিত্তি। নিরাপদ ও স্থিতিশীল পরিবেশ ছাড়া টেকসই উন্নয়ন কিংবা সমৃদ্ধ বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।
-টিএস