রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে বিদ্যমান কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক উদ্যোগ কার্যকর না হওয়ায় ‘নতুন কৌশলের’ প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ। এ জন্য জরুরি ভিত্তিতে একটি বিশেষ কমিশন বা বিশেষ দপ্তর গঠনের পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
মঙ্গলবার বিকেলে রাজধানীর একটি হোটেলে এক সেমিনারের তিনি এ পরামর্শ দেন।
‘জাতীয় নিরাপত্তা ও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন: নির্বাচন-পরবর্তী সরকারের কাছে প্রত্যাশা’ শীর্ষক এ সেমিনারের আয়োজন করে ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব গ্লোবাল স্টাডিজ (আইআইজিএস)।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করে আইআইজিএসের উপদেষ্টা অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ। তিনি বলেন, ‘শুধু চাপের কৌশল নয়, প্রণোদনা যুক্ত করেই সংকট মোকাবিলায় এগোতে হবে। এ জন্য মিয়ানমারে ‘রাখাইন পুনর্গঠন পরিকল্পনা’র প্রস্তাব করেন এই নিরাপত্তা বিশ্লেষক।’
নির্বাচন পরবর্তী সরকারের করণীয় হিসেবে কয়েকটি বিষয় তুলে ধরেন অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ। তিনি বলেন, ‘প্রথমত, একটি জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল প্রণয়ন করতে হবে। দ্বিতীয়ত, একটি সমন্বিত রোহিঙ্গা কৌশল নির্ধারণ করতে হবে, যেখানে পুনর্গঠন পরিকল্পনাও যুক্ত থাকবে।’
সংকট সমাধানের জন্য জরুরিভিত্তিতে একটি বিশেষ কমিশন বা বিশেষ দপ্তর গঠন এবং দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে সামরিক উপস্থিতি জোরদার করার পরামর্শও দেন তিনি। অন্যথায় সংকট আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কার কথাও মনে করিয়ে দেন তিনি।
রোহিঙ্গা সংকটের বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, ‘যেখানে বর্তমানে ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রিত রয়েছে, যা একটি বড় মানবিক সংকটের পাশাপাশি জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান শুধু দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে সম্ভব নয়, বরং বহুপক্ষীয় কূটনীতি, আন্তর্জাতিক জবাবদিহি এবং লক্ষ্যভিত্তিক নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের পুনর্গঠনে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা প্রয়োজন। এ নিয়ে মিয়ানমার সরকার ও আরাকান আর্মির সঙ্গেও কথা বলতে হবে।’
সেমিনারে ‘রাখাইন পুনর্গঠন পরিকল্পনা’ তুলে ধরা হয়, সেখানে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের মাধ্যমে কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জ্বালানি, অবকাঠামো ও শিল্প খাতে বিনিয়োগের কথা বলা হয়েছে। এর মাধ্যমে রোহিঙ্গা ও স্থানীয় জনগণের কর্মসংস্থান হবে। প্রাথমিক হিসাবে রাখাইন পুনর্গঠনে ৩০০ থেকে ৪০০ কোটি ডলার প্রয়োজন হতে পারে। তবে প্রকল্প বড় হলে ১,০০০ থেকে ১,৪০০ কোটি ডলারও লাগতে পারে।
ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, ‘রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে এখন পর্যন্ত পাঁচটি পথ অনুসরণ করা হয়েছে-দ্বিপক্ষীয় আলোচনা, বহুপক্ষীয় উদ্যোগ, ত্রিপক্ষীয় উদ্যোগ, আন্তর্জাতিক আদালতে বিচার প্রক্রিয়া এবং নিষেধাজ্ঞা। তবে এসব উদ্যোগে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি।’ এর প্রধান কারণ হিসেবে মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর জটিলতার কথা তুলে ধরেন তিনি।
রোহিঙ্গাদের সঙ্গে আলোচনার অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘অধিকাংশ রোহিঙ্গাই নিজ দেশে ফিরে যেতে চান। তবে তাঁরা স্বাস্থ্যনীতি, কৃষিনীতি বা শিক্ষানীতি নিয়ে কোনো পরিকল্পনা করেনি। এ বিষয়ে নতুন করে ভাবতে হবে।’
এই নিরাপত্তা বিশ্লেষক আরও বলেন, ‘রোহিঙ্গা সংকট শুধু মানবিক নয়, এটি একটি জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়। তাই কূটনীতি, অর্থনীতি ও পুনর্গঠন পরিকল্পনাকে একসঙ্গে যুক্ত করেই সমাধানের পথে এগোতে হবে।’
সেমিনারে প্যানেল আলোচনায় ফাউন্ডেশন ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (এফএসডিএস) চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অবসরপ্রাপ্ত) ফজলে এলাহী আকবর বলেন, ‘রাজনৈতিক ভাবে সমস্যার সমাধান না হলে বাস্তব সক্ষমতার মাধ্যমে জাতীয় স্বার্থ রক্ষার পথেই এগোতে হবে।’ সে জন্য রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় সরকারকে আলাদা একটি টাস্কফোর্স গঠন করার পরামর্শ দেন তিনি।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র সফর এবং শরণার্থী, প্রবাসী ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে আলোচনার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে ফজলে এলাহী আকবর বলেন, ‘রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীতে প্রতি বছর প্রায় ৩০ হাজার নতুন সদস্য যুক্ত হচ্ছে। এ অবস্থায় আন্তর্জাতিক পরিসরে অর্থায়ন নিয়ে এক ধরনের ক্লান্তি তৈরি হয়েছে। কূটনীতিকদের সঙ্গে আলাপে তিনি এমন ইঙ্গিত পেয়েছেন যে হয় রোহিঙ্গাদের তৃতীয় কোনো দেশে পুনর্বাসন করতে হবে, নয়তো বর্তমান বাস্তবতাই মেনে নিতে হবে।’
নিরাপত্তাবিশ্লেষক লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ আমিনুল করিম বলেন, ‘রোহিঙ্গা সংকট বর্তমানে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় জাতীয় নিরাপত্তা হুমকিতে পরিণত হয়েছে। এই সংকট মোকাবিলা একটি বহুমাত্রিক বিষয়। এ ক্ষেত্রে শুধু মানবিক সহায়তাই নয়, কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক উদ্যোগ জোরদার করতে হবে।’ বিষয়টি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে উত্থাপন এবং পরবর্তী সময়ে তা নিরাপত্তা পরিষদে আলোচনার মাধ্যমে প্রয়োজন হলে নিষেধাজ্ঞার উদ্যোগ নেওয়ার প্রস্তাব দেন তিনি।
আইআইজিএসের চেয়ারম্যান আরিফুর রহমান বলেন, ‘বাংলাদেশের নিরাপত্তা মূলত প্রতিবেশী দেশগুলোর অবস্থার ওপর নির্ভরশীল। নির্বাচন পরবর্তী সরকারের উচিত নিরাপত্তা নীতিতে সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণ করা।’ সামরিক ও কূটনৈতিক অভিজ্ঞতার আলোকে নিরাপত্তা নীতি নির্ধারণেরও পরামর্শ দেন তিনি।
সেমিনারে সূচনা বক্তব্যে আইআইজিএসের ভাইস চেয়ারম্যান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আখতার শহীদ বলেন, ‘রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আশ্রয় দেওয়ার ফলে বাংলাদেশের প্রত্যক্ষ ও উল্লেখযোগ্য জাতীয় নিরাপত্তাগত ঝুঁকি রয়েছে। অর্থনৈতিক ব্যয় ১০০ কোটি ডলারের বেশি। কক্সবাজার ও আশপাশের এলাকায় এর পরিবেশগত প্রভাব অত্যন্ত গুরুতর। সে জন্য সংকটের সমাধানে দলীয় বিভাজনের বাইরে গিয়ে জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলতে হবে।’
সেমিনারে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের সহ-সভাপতি মামুনুর রশিদ খান, জামায়াতে ইসলামীর শুরা সদস্য এ কে এম রফিকুন নবী, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম সদস্য সচিব হুমায়রা নূর, গণ অধিকার পরিষদের উচ্চতর পরিষদের সদস্য আবু হানিফ, ইসলামী ঐক্যজোটের যুগ্ম মহাসচিব শামসুল আলম প্রমুখ।
এমএ