ENGLISH EPAPER 📍 ঢাকা 📅 রবিবার, ১ নভেম্বর ২০২৬, ১৭ কার্তিক ১৪৩৩ তথ্য অধিদফতর নিবন্ধন নম্বর ০৬
শিরোনাম
রংপুরে ফার্মেসিতে সিভিটের নামে বিক্রি হচ্ছে হজমি, স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ভোক্তারা
✎ লাবনী ইয়াসমিন
⏲ প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১২ আগস্ট, ২০২৫, ৯:১৫ পিএম
X

রংপুর নগরীর বিভিন্ন ফর্মেসিতে সিভিটের নামে অবাধে বিক্রি হচ্ছে মানহীন, অনুমোদন বিহীন অরেঞ্জ হজমি। প্যাকেটে নেই ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের (DGDA) ডিএআর বা এমএ নম্বর। ৪০ থেকে ৫০ টাকার হজমি বিক্রি হচ্ছে ২০০ টাকায়। ফলে একদিকে ক্রেতারা সিভিটের নামে হজমি কিনে ঠকছে অন্যদিকে পড়ছে স্বাস্থ্যাঝুঁকিতে।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, রংপুর নগরীর পায়রা চত্তর, আনোয়ারা মার্কেট, হিসান মার্কেট, আজিজ মার্কেট, নবাবগঞ্জ বাজার ও ধাপের বিভিন্ন ফার্মেসি ঘুরে এই হজমিগুলো পাওয়া গেছে। ইউনিলাইক ফুড এন্ড বেভারেজের সি-ভিটা, হোসেন ফুডের সিভিটা- এইচ, হালিমা ফুড প্রোডাক্টসের অরবিট সি এর প্যাকেট ফার্মেসি মালিকেরা কিনছে মাত্র ৪০ থেকে ৫০ টাকায়। যদিও প্যাকেটের গায়ে এর মূল্য লেখা রয়েছে ২০০ টাকা। ভোক্তাদের কাছে এক পাতা হজমি সিভিট বিক্রি করা হচ্ছে ১০ থেকে ২০ টাকায়। প্যাকেটের ভিতরে দেখতে হুবহু সিভিট এর মত। ফলে সহজেই অনুমান করার উপায় থাকে না এটি সিভিট নাকি হজমি। এভাবেই প্রতিদিন সিভিট কিনতে এসে ধোকায় পড়ছেন রোগীরা। আবার অনেকেই অজান্তে শিশুর মুখে তুলে দিচ্ছে ভিটামিন সি এর প্রাচুর্য সিভিটের নামে এই ঝুঁকিপূর্ণ হজমি।

জানা যায়, অপারেশনের পর ঘা শুকাতে এবং সিজারের পর সিভিট খাওয়ার পরামর্শ দেন ডাক্তারেরা। ফলে রোগীর অভিভাবকেরা এক দুই পাতা করে কেনেন। পাতার প্যাকেজিং দেখে চেনার উপায় না থাকায় অনেকে এই হজমিগুলোকে সিভিট হিসেবে কিনে নিয়ে যায়। আবার অনেক শিশুর মুখের ঘায়ের চিকিৎসাতেও দেয়া হয় সিভিট খাওয়ার পরামর্শ। এই অসুস্থতাকে পুঁজি করে রংপুরের অসাধু বিক্রেতারা সিভিটের নামে হজমি বিক্রি করে আসছে দীর্ঘদিন ধরে।

নগরীর হিসান মার্কেটের ভাইবোন ট্রেডার্সের স্বত্তাধিকারী শওকত আলী বলেন, ‘অনেকে আমাদের কাছে কমদামী সিভিট খোঁজে। সবার সামর্থ্য এক রকম নয়। আমরা কমদামী সিভিট হিসেবে এটা বিক্রি করি। এটা যে অরেঞ্জ হজমি এর আগে লক্ষ্য করিনি।

আজিজ সুপার মার্কেটের নীচে দেশ ফার্মেসির মালিক আব্দুল কাদেরের কাছে কমদামী সিভিট চাইলে এনে দেন সিভিটার একটি প্যাকেট। প্রতিবেদকের পরিচয় পেলে তিনি বলেন, ‘আমরা এগুলো রোগীদের কাছে বিক্রি করি না। অনেক ফকির মিসকিন এসে একটা সিভিট খেতে চায়। তখন এগুলা দেই।’

বিভিন্ন ওষুধের মালিকের সাথে কথা বলে জানা যায়, নবাবগঞ্জ বাজারের সালমান ট্রেডার্সের মালিক সালমান হোসেন ও কেরানীপাড়া চৌরাস্তার সুমন বিভিন্ন সময়ে ব্যবসায়ীদের এই হজমির জোগান দেয়। সালমান ট্রেডার্সেও দেখা যায় এই হজমির প্যাকেট সারি সারি সাজানো। সালমান হোসেনের সাথে কথা হলে অভিযোগকে সরাসরি নাকোচ করেন তিনি। সালমান বলেন, আমি হারাগাছ, সাহেবগঞ্জ, সুলতান মোড়, সিওবাজার সহ বিভিন্ন মুদি দোকানে এই হজমি ব্রিক্রি করি। আমার নামে বোনোয়াট অভিযোগ তোলা হচ্ছে। 

ভাইবোন ট্রেডার্সের মালিক সুমনকে ফোনে ডেকে আনলে তার কাছ থেকে পাওয়া যায় হজমির মূল রহস্য। নিঃসঙ্কোচে বলেন, ‘আমি শুধু না অনেকেই বিক্রি করেন। এরকম বিষয় এখানে অহরহ ঘটছে। আমার এই কোম্পানীর মাল আসবে অন্যরা আরেক কোম্পানীর মাল ঢোকাবে। এটাই নিয়ম। আমি কোম্পানীর কাছে মোটা অংকের টাকা দিয়ে মাল কিনে বাজারে সরবরাহ করি।

ডিএআর বা এম নম্বর ছাড়া কেন ঔষধ বাজারে বিক্রি করছে প্রশ্নের উত্তরে সুমন বলেন, ‘আমি এটা জানি না। তবে সব কাগজ আমাদের আছে। কোম্পানীর সাথে যোগাযোগ করলে পাওয়া যাবে।’

সুমনের সূত্র ধরে যোগাযোগ করা হয় ইউনিলাইক ফুড এন্ড বেভারেজের মালিক আখতারুজ্জানের সাথে। তাকে পণ্যের বৈধতা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, ‘আমরা এটি ফুড সাপ্লিমেন্ট হিসেবে তৈরি করেছি। আমাদের বিএসটিআই সার্টিফিকেট রয়েছে। সুমন আমাদের কাছ থেকে পণ্য নিয়ে যায়। সেটা ফার্সেসিতে বিক্রয় করে নাকি মুদিখানায় সেটা আমরা জানিনা।’

The Drugs Act, 1940 এবং The Drugs (Control) Ordinance, 1982 অনুযায়ী, নিবন্ধন ও অনুমোদন ছাড়া কোনো ওষুধ বা সাপ্লিমেন্ট উৎপাদন, আমদানি, সংরক্ষণ বা বিক্রি করা দণ্ডনীয় অপরাধ। DGDA-এর নীতিমালা অনুযায়ী প্রতিটি পণ্যে স্পষ্টভাবে MA/DAR নম্বর, প্রস্তুতকারকের নাম, ঠিকানা, ব্যাচ নম্বর, উৎপাদন ও মেয়াদোত্তীর্ণ তারিখ উল্লেখ থাকা বাধ্যতামূলক। এসব শর্ত না মানলে জরিমানা, পণ্য বাজেয়াপ্ত এবং কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।

মন্তাজ আলী নামক এক ক্রেতা জানান, “এসব সিভিট খাওয়ার পর পেটব্যাথা আর মুখোত ঘাও হইছে। এবার বলে ভালো সিভিট দেছে। হামরা গ্রামের মানুষ। সিভিট চাইলে এটায় দেছে। এটা দেখিয়া বোঝার উপায় নাই সিভিট না হজমি। মানুষ যে সিভিট কয়্যা হজমি বেঁচায় এমন যুগ আসছে কায় জানে!”

রংপুর সিভিল সার্জন ডা. শাহীন সুলতানা বলেন, ‘এসব সাপ্লিমেন্টে উপকারী কোন উপাদান থাকে না। মানহীন ওষুধ বা সাপ্লিমেন্ট শরীরে দীর্ঘমেয়াদে কিডনি ও লিভারের ক্ষতি করতে পারে। এমনকি পাকস্থলী ক্যান্সারেও ভূমিকা রাখে। এসব অনুমোদনবিহীন পণ্য খাওয়া সরাসরি স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে। এগুলো দেখার দায়িত্ব ভোক্তা অধিকারের ও ঔষধ প্রশাসনের। তারা সাহায্য চাইলে আমরা হেল্প করবো।”

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের রংপুর কার্যালয়ের উপপরিচালক জাহাঙ্গীর আলম বলেন,“আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখব। অনুমোদনবিহীন ওষুধ বিক্রি করলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

রংপুর ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের ঔষধ তত্বাবধায়ক ডালিম চন্দ্র দাস জানান, এ ধরনের ফুড সাপ্লিমেন্ট মানব শরীরের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। গত সপ্তাহে আমরা ধাপ এলাকায় অভিযান চালিয়েছি। এ বিষয়টি আমাদের নজরে কেবল আসলো। এর বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যাবস্থা নেয়া হবে।

দ্রুত এসব অনুমোদনবিহীন সিভিট বাজার থেকে প্রত্যাহার, নমুনা পরীক্ষার ফল প্রকাশ এবং নিয়মিত তদারকি কার্যক্রম জোরদারের আহ্বান জানিয়েছেন রংপুরের স্বাস্থ্যসচেতন নাগরিকরা।

এসআর
আরও সংবাদ   বিষয়:  রংপুর  
Loading...
Loading...
আরো দেখুন
সম্পাদক: ইকবাল সোবহান চৌধুরী
অবজারভার লিমিটেডের পক্ষে সম্পাদক কর্তৃক গ্লোব প্রিন্টার্স, ২৪/এ, নিউ ইস্কাটন রোড, রমনা, ঢাকা থেকে প্রকাশিত।
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:আজিজ ভবন (৩য় তলা), ৯৩, মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা (সি/এ), ঢাকা-১০০০।

ফোন: পিএবিএক্স- ৪১০৫৩০০১-০৬; বিজ্ঞাপন: ৪১০৫৩০১২; ০১৭৯৩৩১৭৮২৯, ০১৫৫০৭০৭২৯১
E-mail: [email protected], [email protected]. [email protected], [email protected], [email protected], ‍[email protected], Online-email: [email protected]

🔝