ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের ‘কথিত’ ঢাকা সফর নিয়ে তৈরি হয়েছে রহস্য। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৭ সেপ্টেম্বর ঢাকায় এসে দিনের বড় একটি সময় অবস্থান করেন দোভাল। তবে সফরটির আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়নি ভারত বা বাংলাদেশ—কোনো পক্ষই।
তবে, ২৯ সেপ্টেম্বর বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বলেন, ‘সরকারের কাছে দোভালের ঢাকা সফরের কোনো তথ্য নেই।’ একই দিনে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির জানান, ভারতীয় হাইকমিশনারের সঙ্গে তাঁর বৈঠকেও দোভালের সফর নিয়ে আলোচনা হয়নি।
তাই প্রশ্ন উঠেছে, সফরটি সত্যিই হয়ে থাকলে কেন এ নিয়ে দুই পক্ষের এমন নীরবতা?
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম রেডিফ প্রথম দোভালের ১৭ সেপ্টেম্বরের ঢাকা সফরের খবর প্রকাশ করে। প্রতিবেদনে বলা হয়, সফরটি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য দিল্লি সফরের প্রস্তুতির সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। সীমান্ত, বাণিজ্য, পানি, জ্বালানি ও নিরাপত্তার মতো বিষয় সম্ভাব্য আলোচনায় থাকতে পারে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
পরে টাইমস অব ইন্ডিয়াও জানায়, তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা চলছে। নভেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহকে সম্ভাব্য সময় হিসেবে বিবেচনা করা হলেও সফরের তারিখ এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
তবে দোভালের ‘কথিত’ সফরের সঙ্গে এই সম্ভাব্য বৈঠকের সরাসরি সম্পর্কের কোনো সরকারি প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি।
দোভাল ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা। সীমান্ত নিরাপত্তা, গোয়েন্দা সহযোগিতা, সন্ত্রাসবাদ, আন্তদেশীয় অপরাধ ও কৌশলগত যোগাযোগ তাঁর দায়িত্বের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
ঢাকা-দিল্লির মধ্যে নিরাপত্তা পর্যায়ের যোগাযোগ অবশ্য নতুন নয়। এ বছরের এপ্রিলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গে দোভালের বৈঠক হয়। জুলাইয়ে দিল্লিতে বিমসটেকের জাতীয় নিরাপত্তা প্রধানদের বৈঠকের ফাঁকে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা উপদেষ্টার সঙ্গেও তাঁর দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হয়।
অর্থাৎ, দুই দেশের নিরাপত্তা কাঠামোর মধ্যে যোগাযোগ রয়েছে। কিন্তু এসব বৈঠকের কোনোটিই ১৭ সেপ্টেম্বর দোভালের ‘কথিত’ ঢাকা সফরকে নিশ্চিত করে না।
দোভালের ‘কথিত’ ঢাকা সফরের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য দিল্লি সফরের যোগসূত্রের বিষয়টিই এখন সবচেয়ে বেশি আলোচিত। আগস্টে সম্ভাব্য সফর নিয়ে আলোচনা হলেও তা হয়নি। সেপ্টেম্বরে দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে আবারও প্রকাশ্য যোগাযোগ দেখা যায়। ১৭ সেপ্টেম্বর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানান তারেক রহমান। জবাবে মোদিও তাঁকে ধন্যবাদ জানান।
এরপর তারেক রহমানের দিল্লি সফর নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। তবে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এখনো সফরের কোনো তারিখ নিশ্চিত করা হয়নি। এ সফর হলে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বেশ কিছু কঠিন বিষয় আলোচনায় আসতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে সীমান্ত, পানি, বাণিজ্য, জ্বালানি ও নিরাপত্তা সহযোগিতা। সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয়গুলোর একটি হলো, ভারতে অবস্থানরত ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ।
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে। শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান, তাঁকে ফেরত চেয়ে বাংলাদেশের অনুরোধ, সীমান্ত পরিস্থিতি এবং দুই দেশের রাজনৈতিক আস্থার সংকট—সব মিলিয়ে সম্পর্কের বেশ কিছু প্রশ্ন এখনো অমীমাংসিত। এর মধ্যেই দুই দেশের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ বাড়ছে।
বাংলাদেশের জন্য ভারত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী। ভারতের কাছেও বাংলাদেশের গুরুত্ব কম নয়। দুই দেশের দীর্ঘ সীমান্ত, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ, সীমান্ত অপরাধ, চোরাচালান এবং বঙ্গোপসাগরের নিরাপত্তা—সবই দুই দেশের কৌশলগত সম্পর্কের অংশ। তাই দোভালের মতো শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তার কোনো সফর হয়ে থাকলে তার গুরুত্ব সাধারণ ‘সৌজন্য সফরের চেয়ে বেশি’ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে সফরের উদ্দেশ্য সম্পর্কে সরকারি তথ্য না থাকায় এর রাজনৈতিক তাৎপর্য নিয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—একদিকে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দোভালের ১৭ সেপ্টেম্বরের ঢাকা সফরের খবর দিয়েছে, অন্যদিকে বাংলাদেশ সরকার বলছে, তাদের কাছে এমন সফরের তথ্য নেই। ফলে তিনটি প্রশ্ন সামনে থাকছে—দোভাল সত্যিই ঢাকায় এসেছিলেন কি না, এসে থাকলে কার সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ হয়েছিল এবং কী নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। এর কোনো প্রশ্নেরই এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক উত্তর মেলেনি।