কয়েক বছর ধরে নিয়মিত টিকাদানে নানা ঘাটতি এবং স্বাস্থ্যসেবার দুর্বলতার কারণেই বাংলাদেশের হাম পরিস্থিতি এতটা ভয়াবহ পর্যায়ে গেছে। সম্প্রতি বিজ্ঞানবিষয়ক সাময়িকী ‘সায়েন্টিফিক আমেরিকান’-এর এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
বাংলাদেশের হামের বর্তমান পরিস্থিতিকে ২০০৫ সালের পর সবচেয়ে প্রাণঘাতী প্রাদুর্ভাব হিসেবে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। প্রতিবেদনে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়, গত ১৫ মার্চ থেকে ১৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে এক লাখ ৭৫ হাজার ১৯৮ জন সন্দেহভাজন রোগী শনাক্ত ও এক হাজার ৪৪ জনের মৃত্যু হয়েছে।
এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গতকাল শনিবারের সর্বশেষ তথ্য বলছে, হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে এ পর্যন্ত মারা গেছে এক হাজার ৫৩ জন। এর মধ্যে হাম শনাক্ত হয়ে মৃত্যু হয়েছে ১০১ জনের। বাকি ৯৫২ জনের মৃত্যু হামের উপসর্গ নিয়ে। গত ১৫ মার্চ থেকে গতকাল সকাল পর্যন্ত হামের উপসর্গ থাকা রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৭৮ হাজার ৬৬৬। একই সময়ে ২০ হাজার ৪৭৪ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে এক লাখ ৫৭ হাজার ৫৫৬ জন। এর মধ্যে এক লাখ ৫১ হাজার ৩৯৫ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে।
২৪ ঘণ্টায় আরও পাঁচ মৃত্যু
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত বুলেটিনে বলা হয়, গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে পাঁচজন মারা গেছে। তাদের মধ্যে তিনজন ঢাকা বিভাগের ও দুজন সিলেটের।
এ নিয়ে ঢাকা বিভাগে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪২৮। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১৬৭ জন মারা গেছে সিলেটে। এ ছাড়া রাজশাহীতে ৯৩, ময়মনসিংহে ৭৭, চট্টগ্রামে ৭৪, বরিশালে ৫৯, খুলনায় ৪০ ও রংপুরে ১৪ জন মারা গেছে। একই সময়ে ৭৯ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। হামের উপসর্গ নিয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে আরও ৮৩৮ জন। এর মধ্যে ঢাকা বিভাগে ২৪৯, চট্টগ্রামে ২২৪, সিলেটে ১৪৬, বরিশালে ১০৮, খুলনায় ৪২, ময়মনসিংহে ৫২, রাজশাহীতে ১৬ ও রংপুরে একজন ভর্তি হয়েছে।
টিকাদানে বড় ঘাটতি
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও ইউনিসেফের তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৯ সালে বাংলাদেশে হামের প্রথম ডোজের টিকা পাওয়ার হার ছিল ৯৭ শতাংশ এবং দ্বিতীয় ডোজে ৯৩ শতাংশ। ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে প্রতিবছর দেশে হাম শনাক্তের সংখ্যা ছিল ১০০ থেকে ৩০০-এর মধ্যে। এতে মনে করা হচ্ছিল, বাংলাদেশ হাম নির্মূলের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে।
পরবর্তী সময়ে টিকাদানে ঘাটতি তৈরি হয়। ২০২৫ সালে দেশে হামের টিকাদানের হার ৮৬ শতাংশে নেমে আসে। ইউনিসেফের হিসাবে, প্রায় চার লাখ শিশু হামের প্রয়োজনীয় সব ডোজ থেকে বঞ্চিত হয়। অন্তত ৭০ হাজার শিশু কোনো টিকাই পায়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০২০ সালে করোনা মহামারির সময় নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে বড় ধাক্কা লাগে। পরে টিকা ও ওষুধ সংগ্রহের প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন, রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে সম্পূরক টিকাদান কর্মসূচি পেছানো এবং বৈদেশিক সহায়তা কমে যাওয়ায় মাঠ পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবাতেও প্রভাব পড়ে।
প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের শঙ্কা, সরকারি হিসাবে যে রোগী ও মৃত্যুর তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়ে বেশি হতে পারে। কারণ, হাসপাতালের বাইরে থাকা সব রোগীর পরীক্ষা করা হয় না। এমনকি হাসপাতালে ভর্তি হওয়া সব রোগীরও হাম পরীক্ষা হয় না। ফলে শনাক্ত রোগীর সংখ্যা দিয়ে দেশে মোট হাম আক্রান্তের প্রকৃত চিত্র পাওয়া সম্ভব নয়। বিশেষ করে প্রত্যন্ত এলাকায় চিকিৎসা ও টিকাদানের সুযোগ সীমিত হওয়ায় অনেক রোগী সরকারি নজরদারির বাইরে থেকে যেতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
শিশুরাই বেশি ঝুঁকিতে
হামের নির্দিষ্ট কোনো অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসা নেই। আক্রান্ত ব্যক্তিকে মূলত উপসর্গভিত্তিক ও সহায়ক চিকিৎসা দেওয়া হয়। তবে হাম থেকে নিউমোনিয়া, মস্তিষ্কে প্রদাহসহ গুরুতর জটিলতা দেখা দিতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের ক্ষেত্রে জটিলতা ও মৃত্যুঝুঁকি আরও বেশি। বর্তমানে মারা যাওয়াদের বড় অংশই শিশু বলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যেও উঠে এসেছে।
জরুরি টিকাদান অভিযান
আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে থাকায় চলতি বছরের এপ্রিলে সরকার প্রায় এক কোটি ৮০ লাখ শিশুকে লক্ষ্য করে জরুরি টিকাদান অভিযান শুরু করে। এতে সংক্রমণের গতি কিছুটা কমলেও পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি।
টেক্সাস এঅ্যান্ডএম বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য যোগাযোগ গবেষক এবং ইউনিসেফ বাংলাদেশের সাবেক কর্মকর্তা শাকিল ফয়েজউল্লাহ বলেন, হামের মতো ভাইরাস কোনো দয়া দেখায় না। নিয়মিত টিকাদান প্রক্রিয়ায় সামান্যতম বিচ্যুতি বা ফাঁক তৈরি হলেই এটি দ্রুত থাবা বসায়; বাংলাদেশে ঠিক সেটাই ঘটেছে। শুধু জরুরি অভিযান চালিয়ে এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির ঘাটতি পূরণ, টিকার নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং যেসব এলাকায় টিকাবঞ্চিত শিশুর সংখ্যা বেশি, সেখানে লক্ষ্যভিত্তিক কর্মসূচি জোরদার করতে হবে।
জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. উইলিয়াম মস সতর্ক করে বলেন, জাতীয় পর্যায়ের টিকাদানের গড় হার অনেক সময় আসল চিত্র ঢেকে রাখে। কোনো নির্দিষ্ট এলাকা বা গোষ্ঠীর মধ্যে যদি টিকা না নেওয়া শিশু বেশি থাকে, তবে সেই ছোট পকেটগুলো থেকেই আবারও বড় মহামারির দাবানল ছড়িয়ে পড়তে পারে।
বর্তমানে শুধু বাংলাদেশ নয়; যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর মতো উন্নত দেশগুলোতেও হামের প্রাদুর্ভাব বাড়ছে। চলতি বছর যুক্তরাষ্ট্রে এরই মধ্যে তিন হাজার ২৯৪ জন হামে আক্রান্ত হয়েছে এবং পেনসিলভানিয়ায় সম্প্রতি চতুর্থ মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।
শাকিল ফয়েজউল্লাহ জানান, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সমস্যাটি মূলত সরবরাহ শৃঙ্খল ভেঙে পড়া এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সাময়িক ব্যাঘাত। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশগুলোতে টিকার সহজলভ্যতা থাকার পরও টিকাবিরোধী মনোভাব (অ্যান্টি-ভ্যাক্স) বা টিকা নিতে অনিচ্ছাই প্রধান কারণ।
জানতে চাইলে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, আমরা দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই হাম প্রতিরোধে কাজ শুরু করেছি। হাম নিয়ন্ত্রণে সারাদেশে টিকাদানের বিশেষ কর্মসূচি করা হয়েছে। টিকাদান ক্যাম্পেইন শেষ করার পরও যখন সংক্রমণ অব্যাহত থাকার বিষয়টি দেখা যায়, তখন সরকার মপ-আপ কার্যক্রম পরিচালনা করে। এ কার্যক্রমের আওতায় নতুন করে ১৪ লাখ শিশুকে হামের টিকা দেওয়া হয়েছে। ২৫ সেপ্টেম্বর থেকে দেশে আবারও হামের টিকাদান কার্যক্রম শুরু হচ্ছে।