ENGLISH EPAPER 📍 ঢাকা 📅 রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩ তথ্য অধিদফতর নিবন্ধন নম্বর ০৬
শিরোনাম
Advertisement
কারাম উৎসবে চা বাগানের জনপদে সংস্কৃতির রং
✎ অবজারভার সংবাদদাতা
⏲ প্রকাশিত: রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১:৫৩ পিএম আপডেট: ১৩.০৯.২০২৬ ৩:২৮ পিএম
X
Advertisement

চা বাগানের সবুজে ঘেরা জনপদ। চারদিকে উৎসবের আমেজ। মাঠজুড়ে মানুষের ঢল। কারও পরনে ঐতিহ্যবাহী পোশাক, কারও হাতে বাদ্যযন্ত্র। ঢোলের তালে তালে চলছে নৃত্য। কখনও গান, কখনও লোককথা। আবার কখনও ঐতিহ্যবাহী নৃত্যের ছন্দে মুখর পুরো পরিবেশ। নিজেদের ভাষা, সংস্কৃতি ও হাজার বছরের শেকড়ের গল্প যেন নতুন করে বলছিলেন চা বাগানের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মানুষ।

এভাবেই ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা ও আনন্দঘন পরিবেশে হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার নালুয়া চা বাগানে অনুষ্ঠিত হয়েছে আদিবাসী সম্প্রদায়ের অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক উৎসব ‘কারাম পূজা’। 

শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) দিনব্যাপী নালুয়া চা বাগানের ফুটবল মাঠে আয়োজিত এ উৎসবে সমবেত হন কয়েক হাজার মানুষ। আয়োজকদের হিসাবে, উৎসবে প্রায় তিন থেকে চার হাজার মানুষের সমাগম ঘটে।



কারাম উৎসব শুধু পূজা-অর্চনার আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ ছিল না। এটি পরিণত হয় চা বাগানের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষের মিলন, আনন্দ, সম্প্রীতি ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য তুলে ধরার এক বৃহৎ আয়োজনে।

নালুয়া চা বাগানের আদিবাসীদের আয়োজনে এবং বিভিন্ন আদিবাসী সম্প্রদায়ের সার্বিক সহযোগিতায় অনুষ্ঠিত উৎসবে সিলেট, মৌলভীবাজার, সাতগাঁও, সুরমা, দেওন্দী, লালচান্দ, চান্দপুর, চণ্ডিছড়া, চাকলাউ, আমু ও নালুয়া চা বাগানসহ বিভিন্ন বাগান থেকে সাংস্কৃতিক দল অংশ নেয়।

উরাঁও, মুন্ডা, সাঁওতাল, খাড়িয়া, বাড়াইক, তাঁতী, কর্মকার, ভূমিজ, তুরিয়া, মাহালীসহ বিভিন্ন আদিবাসী সম্প্রদায়ের ১৪ থেকে ১৫টি নৃত্য ও সাংস্কৃতিক দল উৎসবে অংশ নেয়। একের পর এক দল মঞ্চে উঠে নাচ ও গান পরিবেশন করে। তাদের পরিবেশনায় ফুটে ওঠে নিজস্ব ভাষা, লোকজ ঐতিহ্য, জীবনযাপন ও সংস্কৃতির নানা রং।

কারাম মূলত একটি গাছকে কেন্দ্র করে পালিত ধর্মীয় উৎসব। আদিবাসী বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষের কাছে কারাম গাছ পবিত্রতার প্রতীক। একই সঙ্গে এটি মঙ্গল, কল্যাণ ও সৌভাগ্যের প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত।

কারাম পূজার সঙ্গে জড়িয়ে আছে দুই ভাই ধর্মা ও কর্মার কাহিনি। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, ধর্মা ধর্ম ও ন্যায়নীতির পথে চলায় নানা বিপদ থেকে রক্ষা পান। অন্যদিকে কর্মা ধর্মীয় বিধান ও নীতি অনুসরণ না করায় ক্ষতির মুখে পড়েন। এই কাহিনির মধ্য দিয়ে সৎপথে চলা, ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং ন্যায়নীতির প্রতি আনুগত্যের শিক্ষা তুলে ধরা হয়।

উৎসব উপলক্ষে কারাম ডাল অস্থায়ী মণ্ডপে স্থাপন করা হয়। এরপর চলে পূজা-অর্চনা, নাচ-গান ও লোককথা বলার আয়োজন। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলে আসা এসব আচার-অনুষ্ঠানই কারাম উৎসবকে দিয়েছে আলাদা বৈশিষ্ট্য।

উৎসব শেষে পরদিন কারাম ডাল উঠিয়ে নেওয়ারও রীতি রয়েছে। এ সময় গ্রামের তরুণ-তরুণীসহ বিভিন্ন বয়সী নারী-পুরুষ নেচে-গেয়ে বাড়ি বাড়ি ঘুরে পুকুরে কারাম ডাল বিসর্জন দেন।



চা বাগানের শ্রমজীবী মানুষের কাছে তাই কারাম উৎসবের অপেক্ষা শুরু হয় অনেক আগে থেকেই। বছরের নির্দিষ্ট সময় এলেই যেন বদলে যায় বাগানের চেনা পরিবেশ। কর্মব্যস্ত জীবনের নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও উৎসবটি হয়ে ওঠে আনন্দ ভাগাভাগি করে নেওয়ার বিশেষ উপলক্ষ।

নালুয়া চা বাগানের ফুটবল মাঠে অনুষ্ঠিত উৎসবের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ ছিল সাংস্কৃতিক পরিবেশনা। বিভিন্ন চা বাগান থেকে আসা দলগুলো নিজস্ব ঢঙে নৃত্য ও গান পরিবেশন করে।

কেউ তুলে ধরেন নিজেদের সম্প্রদায়ের লোকজ কাহিনি, কেউ নৃত্যের ছন্দে ফুটিয়ে তোলেন গ্রামীণ জীবনের চিত্র। আবার কোনো কোনো দলের পরিবেশনায় উঠে আসে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা লোকসংস্কৃতির নানা অনুষঙ্গ।

এক দলের পরিবেশনা শেষ হওয়ার পর আরেক দল মঞ্চে ওঠে। দর্শকরাও করতালি ও উচ্ছ্বাসে তাদের উৎসাহ দেন। একপর্যায়ে পুরো উৎসবের মাঠ পরিণত হয় বিভিন্ন সংস্কৃতির এক মিলনমেলায়।

নালুয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বাবু হরেন্দ্র উরাঁও, আমুরোড হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজের সিনিয়র শিক্ষক রামেশ্বর ভৌমিক এবং দেবরাম মুন্ডার যৌথ সঞ্চালনায় প্রথম অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন নালুয়া চা বাগানের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য রতন মুন্ডা। দ্বিতীয় অধিবেশনে সঞ্চালকের দায়িত্ব পালন করেন আকাশ মুন্ডা ও জয়দেব ভৌমিক।

নেচে-গেয়ে কারাম উৎসবের উদ্বোধন করেন অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হবিগঞ্জের জেলা প্রশাসক ড. জি এম সরফরাজ।

বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের গোপনীয় শাখা ও জেএম শাখার সহকারী কমিশনার পৃথ্বীন্দ্র চাকমা, চুনারুঘাট উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. তৌফিক আনোয়ার, আহমদাবাদ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. জাকির হোসেন পলাশ, নালুয়া চা বাগানের ব্যবস্থাপক তারিফ আহমেদ, সহকারী ব্যবস্থাপক অরূপ চাকমা, সাব্বির আহমেদ, আব্দুর রউফ, আসফাক নাসের তৌকির, বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সম্পাদক নৃপেন পাল, সাবেক মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান খায়রুন আক্তার এবং সিলেট মহানগর হাসপাতালের পরিচালক মাসুদ আহমেদ।

এ ছাড়া বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ, জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, সাংস্কৃতিক কর্মী ও বিভিন্ন চা বাগানের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।



উৎসবের শেষ পর্বেও ছিল বিশেষ আয়োজন। এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের হাতে সম্মাননা স্মারক তুলে দেওয়া হয়। এতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে উৎসাহ ও আনন্দ দেখা যায়।

পরে সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া দলগুলোর মধ্যে বিজয়ীদের পুরস্কৃত করা হয়। কারাম উৎসব উদযাপন কমিটি ও সিলেট মহানগর হাসপাতালের পরিচালক মাসুদ আহমেদের পক্ষ থেকে এসব পুরস্কার দেওয়া হয়।

প্রথম স্থান অধিকারী সাংস্কৃতিক দলকে ৫ হাজার টাকা, দ্বিতীয় স্থান অধিকারী দলকে সাড়ে ৪ হাজার টাকা এবং তৃতীয় স্থান অধিকারী দলকে ৪ হাজার টাকা দেওয়া হয়। এ ছাড়া প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া প্রতিটি সাংস্কৃতিক দলকে ৩ হাজার টাকা করে পুরস্কৃত করা হয়।

সবশেষে অনুষ্ঠানের সভাপতি ও স্থানীয় ইউপি সদস্য রতন মুন্ডা আগত অতিথি, বিভিন্ন চা বাগান থেকে আসা সাংস্কৃতিক দল, আয়োজক ও দর্শনার্থীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। তাঁর বক্তব্যের মধ্য দিয়ে দিনব্যাপী কারাম উৎসবের সমাপ্তি ঘটে।

চা বাগানের শ্রমজীবী আদিবাসী জনগোষ্ঠীর কাছে কারাম পূজা কেবল একটি ধর্মীয় উৎসব নয়; এটি তাদের অস্তিত্ব, শেকড় ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে থাকা এক ঐতিহ্য।

প্রতিবছর এ উৎসবের মধ্য দিয়ে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয় পূর্বপুরুষদের বিশ্বাস, লোককথা, নৃত্য, গান ও জীবনধারার নানা অনুষঙ্গ। আধুনিকতার দ্রুত পরিবর্তনের মধ্যেও নিজেদের ভাষা ও সংস্কৃতিকে ধরে রাখার প্রত্যয় যেন প্রতিফলিত হয় কারামের প্রতিটি আয়োজনে।

নালুয়া চা বাগানের মাঠে তাই সেদিন শুধু একটি পূজা অনুষ্ঠিত হয়নি—নাচ, গান ও লোকজ ঐতিহ্যের মধ্য দিয়ে মানুষ উদযাপন করেছে নিজেদের শেকড়ের সঙ্গে সম্পর্ক। কয়েক হাজার মানুষের মিলনমেলায় কারাম হয়ে উঠেছিল সম্প্রীতি, ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের এক জীবন্ত উৎসব।

এমএস জিলানী আখঞ্জী /এফএস 
Advertisement
Loading...
Loading...
আরো দেখুন
সম্পাদক: ইকবাল সোবহান চৌধুরী
অবজারভার লিমিটেডের পক্ষে সম্পাদক কর্তৃক গ্লোব প্রিন্টার্স, ২৪/এ, নিউ ইস্কাটন রোড, রমনা, ঢাকা থেকে প্রকাশিত।
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:আজিজ ভবন (৩য় তলা), ৯৩, মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা (সি/এ), ঢাকা-১০০০।

ফোন: পিএবিএক্স- ৪১০৫৩০০১-০৬; বিজ্ঞাপন: ৪১০৫৩০১২; ০১৭৯৩৩১৭৮২৯, ০১৫৫০৭০৭২৯১, ই-মেইল: [email protected], ‍[email protected] অনলাইন: ৪১০৫৩০১৪; ০১৫৫০৭০৭২৯৭ ই-মেইল: [email protected] ০১৫৫০৭০৭২৯৬
🔝
Advertisement