নতুন জাতীয় পে-স্কেলের গেজেট প্রকাশের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে পে-স্কেলের খসড়া বিজি প্রেসে পাঠানো হয়েছে। সেখান থেকে অর্থ মন্ত্রণালয় এবং পরে আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং শেষে সরকারি আদেশ বা এসআরও নম্বর দিয়ে তা প্রকাশ করা হবে।
বৃহস্পতিবার (০৩ সেপ্টেম্বর) অর্থ মন্ত্রণালয়ের পে-স্কেল নিয়ে কাজ করা এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আমরা গতকালই বিজি প্রেসে পাঠিয়েছি।
এখন সেখান থেকে এটি অর্থ মন্ত্রণালয়ে যাবে। সেখান থেকে আইন মন্ত্রণালয়ে ভেটিং হয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে এসআরও নম্বর পেয়ে প্রকাশ করা হবে।
গেজেট প্রকাশে কোনো ধরনের বিলম্ব করতে চায় না সরকার এমনটি জানিয়ে ওই কর্মকর্তা বলেন, যত দ্রুত সম্ভব পে-স্কেলের গেজেট প্রকাশ করা হবে। গেজেট প্রকাশের ক্ষেত্রে আমরা কোনো বিলম্ব করতে চাই না।
নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান নিয়েও সরকারের মধ্যে প্রস্তুতি চলছে। মন্ত্রিপরিষদের সচিব নাসিমুল গনি জানিয়েছেন, নতুন পে-স্কেলের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ মধ্যমেয়াদি বাজেট পরিকল্পনায় (এমটিবিএফ) বিবেচনায় রাখা হয়েছিল। ফলে এটি সরকারের জন্য হঠাৎ তৈরি হওয়া কোনো ব্যয় নয়।
তিনি বলেন, সরকার প্রতিবছর শুধু এক বছরের বাজেট করে না; বরং আগামী কয়েক বছরের সম্ভাব্য আয়-ব্যয়ের একটি আগাম হিসাবও করে। নতুন পে-স্কেলের সম্ভাব্য ব্যয়ও সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিবেচনায় ছিল।
এডিপিতে নজর
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, পে-স্কেল বাস্তবায়নে অর্থের সংস্থান করতে সরকারের প্রথম নজর উন্নয়ন বাজেট বা বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) দিকে। চলতি অর্থবছরে এডিপির আকার তিন লাখ কোটি টাকা। এর মধ্যে এক হাজারের বেশি প্রকল্প এখনো চূড়ান্ত অনুমোদন পায়নি। অনেক প্রকল্পের কাজও শুরু হয়নি।
কম অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত প্রকল্পগুলো পুনর্বিবেচনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। কোনো ভবন নির্মাণ প্রকল্প আগামী বছর শুরু করা সম্ভব হলে চলতি অর্থবছরে সেই অর্থ অন্য খাতে ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। একইভাবে ধীরগতির প্রকল্পে অর্থ ছাড়ের সময় পিছিয়ে দেওয়ার বিষয়ও বিবেচনা করা হচ্ছে।
এর পাশাপাশি বিদেশ সফর, প্রশিক্ষণ, সেমিনার, পরামর্শক নিয়োগ, ভবন সংস্কার ও আসবাব কেনার মতো ব্যয়ে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করে সাশ্রয়ের সুযোগ খোঁজা হচ্ছে।
তবে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির মূল বরাদ্দ কমানোর বিষয়ে সতর্ক সরকার। বয়স্ক, বিধবা ও প্রতিবন্ধী ভাতার মূল বরাদ্দ অপরিবর্তিত রেখে এসব কর্মসূচির প্রশাসনিক ব্যয় কমানোর মাধ্যমে সাশ্রয়ের চেষ্টা করা হচ্ছে।
রাজস্ব বাড়ানোর কৌশল
প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, নতুন জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়ন কোনো ব্যয়বহুল সিদ্ধান্ত নয়; বরং মূল্যস্ফীতির বাস্তবতায় সরকারি কর্মচারীদের ক্রয়ক্ষমতা ধরে রাখার প্রয়োজনীয় উদ্যোগ।
তিনি বলেন, ২০১৫ সালের পর থেকে জীবনযাত্রার ব্যয় দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। নতুন পে-স্কেলের অতিরিক্ত ব্যয় মেটাতে মধ্যমেয়াদি বাজেট কাঠামোর আওতায় রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর কৌশল নেওয়া হয়েছে।
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসসহ রাজস্ব প্রশাসনের বিভিন্ন ইউনিটে রেকর্ড পরিমাণ রাজস্ব আদায়ের ইতিবাচক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, করের আওতা বাড়ানো, কর ফাঁকি বন্ধ এবং ডিজিটাল রাজস্ব ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান করা সম্ভব।
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের (পিইবি) চেয়ারম্যান মাশরুর রিয়াজ মনে করেন, নতুন পে-স্কেলের জন্য অর্থ কোথা থেকে আসবে, সে বিষয়ে সরকারের সুস্পষ্ট ও টেকসই অর্থায়ন পরিকল্পনা আরও জোরালো করা দরকার।
তিনি বলেন, শুধু ঋণনির্ভর না হয়ে রাজস্ব আহরণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে হবে। একইসঙ্গে সরকারি ব্যয়ে অপচয় ও অদক্ষতা কমাতে হবে। পে-স্কেলটি তিন বছরে ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হলে সরকারের ওপর আর্থিক চাপ সহনীয় পর্যায়ে রাখা সম্ভব হবে।
আংশিক বাস্তবায়নে ৪৪ হাজার কোটি টাকা
চলতি বাজেটে নতুন পে-স্কেলের আংশিক বাস্তবায়নের জন্য প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকা সংরক্ষণের কথা বলা হয়েছে। তবে পুরো পে-স্কেল বাস্তবায়নে এর চেয়ে অনেক বেশি অর্থের প্রয়োজন হবে।
এর আগে সোমবার বিকেলে সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে নতুন বেতনস্কেল অনুমোদন দেওয়া হয়। একই বৈঠকে নতুন বেতনকাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সশস্ত্র বাহিনীর জন্য ‘যৌথবাহিনী নির্দেশাবলি ২০২৬’ অনুমোদন করা হয়েছে। নতুন পে-স্কেল ও সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্তগুলো ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর ধরা হয়েছে।
আগামী রোববার এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক আদেশ জারি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
টিআইএস