ইসলামের শেষ নবী ও রাসুল হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্মস্মরণে মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পালিত হচ্ছে ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.)। মহানবীর জীবন, চরিত্র, শিক্ষা ও মানবতার প্রতি তাঁর আহ্বান স্মরণের মধ্য দিয়ে দিনটি পালন করে থাকেন মুসলিমরা।
‘মিলাদ’ শব্দের অর্থ জন্ম বা জন্মলাভ। আর ‘মিলাদুন্নবী’ বলতে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্মস্মরণকে বোঝানো হয়। দেশ ও অঞ্চলভেদে এ উপলক্ষে আয়োজন ও পালনের রীতিতে ভিন্নতা থাকলেও মহানবীর জীবন ও আদর্শ স্মরণই এর মূল বিষয়।
ইসলামি ঐতিহ্য অনুযায়ী, মহানবী (সা.) মক্কা নগরীতে কুরাইশ বংশের বনু হাশিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। প্রচলিত মতে, তাঁর জন্ম ‘আমুল ফিল’ বা হাতির বছর, যা খ্রিস্টীয় আনুমানিক ৫৭০ বা ৫৭১ সালের সঙ্গে মিলে যায়। তাঁর পিতা আবদুল্লাহ ইবনে আবদুল মুত্তালিব এবং মা আমিনা বিনতে ওয়াহাব।
জন্মের আগেই পিতাকে হারান মহানবী (সা.)। ছয় বছর বয়সে তাঁর মা আমিনাও মৃত্যুবরণ করেন। এরপর দাদা আবদুল মুত্তালিব এবং পরে চাচা আবু তালিব তাঁর দায়িত্ব নেন।
শৈশব থেকেই সততা, বিশ্বস্ততা ও উত্তম চরিত্রের জন্য মক্কার মানুষের কাছে তিনি বিশেষভাবে পরিচিত ছিলেন। নবুয়ত লাভের আগেই তাঁকে ‘আল-আমিন’ বা বিশ্বস্ত এবং ‘আস-সাদিক’ বা সত্যবাদী নামে অভিহিত করা হতো।
৪০ বছর বয়সে নবুয়ত লাভ
৪০ বছর বয়সে মক্কার হেরা গুহায় মহানবী (সা.)-এর ওপর প্রথম ওহি নাজিল হয়। ফেরেশতা জিবরাইল (আ.)-এর মাধ্যমে আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহি লাভের মধ্য দিয়ে শুরু হয় তাঁর নবুয়তি জীবন।
তিনি মানুষকে এক আল্লাহর ইবাদত, সত্যবাদিতা, আমানতদারি, ন্যায়বিচার, দয়া, ক্ষমা এবং মানুষের অধিকার রক্ষার শিক্ষা দেন। এতিম-দরিদ্রদের পাশে দাঁড়ানো, দুর্বলদের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং মানুষের সঙ্গে মানবিক আচরণের ওপরও তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
তৎকালীন আরব সমাজে প্রচলিত গোত্রীয় অহংকার, সামাজিক বৈষম্য ও দুর্বলদের ওপর নির্যাতনের বিরুদ্ধে তাঁর আহ্বান ছিল গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক পরিবর্তনের সূচনা।
মদিনায় নতুন সমাজের ভিত্তি
মক্কায় দীর্ঘ সময় দাওয়াত ও নির্যাতনের পর ৬২২ খ্রিস্টাব্দে মহানবী (সা.) মদিনায় হিজরত করেন। ইসলামের ইতিহাসে এ হিজরত একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা এবং হিজরি সনের সূচনাবিন্দু।
মদিনায় তিনি বিভিন্ন ধর্ম ও গোত্রের মানুষের পারস্পরিক অধিকার, দায়িত্ব ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের ভিত্তিতে একটি সমাজ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। মদিনার সনদকে ইসলামের প্রাথমিক রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
বিদায় হজে মানবতার বার্তা
জীবনের শেষ পর্যায়ে মহানবী (সা.) বিদায় হজ পালন করেন। ৬৩২ খ্রিস্টাব্দে আরাফাতের ময়দানে দেওয়া তাঁর বিদায়ী ভাষণ ইসলামের নৈতিক ও সামাজিক শিক্ষার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত।
এ ভাষণে মানুষের জীবন, সম্পদ ও সম্মানের নিরাপত্তা, নারীর অধিকার, সুদ ও জাহেলি যুগের নানা অন্যায়ের অবসান এবং মুসলমানদের পারস্পরিক ভ্রাতৃত্বের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
কীভাবে প্রচলিত হলো মিলাদুন্নবী
মহানবী (সা.)-এর জন্মদিন উপলক্ষে বর্তমান সময়ের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে ‘মিলাদ’ পালনের রীতি তাঁর জীবদ্দশায় বা সাহাবিদের যুগে প্রচলিত ছিল—এমন নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক প্রমাণ পাওয়া যায় না।
ঐতিহাসিক গবেষণায় সাধারণভাবে বলা হয়, মহানবীর জন্মস্মরণকে কেন্দ্র করে আনুষ্ঠানিক মাওলিদ বা মিলাদ আয়োজন কয়েক শতাব্দী পরে মুসলিম সমাজে বিকশিত হয়। এর সুনির্দিষ্ট সূচনাকাল ও প্রথম আয়োজক নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
কিছু ঐতিহাসিক সূত্রে ফাতেমীয় শাসনামলের মিসরে মাওলিদ পালনের প্রাথমিক প্রাতিষ্ঠানিক রীতির কথা পাওয়া যায়। পরে ইরাকের ইরবিলসহ মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে বড় পরিসরে মাওলিদ আয়োজনের নজির দেখা যায়।
১২ রবিউল আউয়াল কেন গুরুত্বপূর্ণ
মহানবী (সা.)-এর জন্মতারিখ নিয়ে ইসলামি ইতিহাসে মতভেদ রয়েছে। তবে ১২ রবিউল আউয়াল তাঁর জন্মদিন হিসেবে মুসলিম বিশ্বের একটি বড় অংশে বহুল প্রচলিত।
একই তারিখে মহানবী (সা.)-এর ইন্তেকাল হয়েছে বলেও ব্যাপকভাবে প্রচলিত রয়েছে। তবে জন্ম ও ইন্তেকালের সুনির্দিষ্ট তারিখ নিয়ে ঐতিহাসিক ও আলেমদের মধ্যে বিভিন্ন মত রয়েছে।
বাংলাদেশে নানা আয়োজন
দেশ ও সমাজভেদে ঈদে মিলাদুন্নবী পালনের ধরন ভিন্ন। কোথাও মসজিদে আলোচনা ও দোয়া, কোথাও মহানবীর জীবনী নিয়ে ওয়াজ ও মাহফিল, আবার কোথাও কোরআন তিলাওয়াত, নাত, দরুদ ও সালাম পাঠ, দান-সদকা এবং দরিদ্র মানুষের মধ্যে খাবার বিতরণের আয়োজন করা হয়।
বাংলাদেশেও বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক সংগঠনের উদ্যোগে এ উপলক্ষে আলোচনা সভা, মিলাদ মাহফিল, দোয়া, সেমিনারসহ নানা কর্মসূচি আয়োজন করা হয়ে থাকে।
তবে মিলাদ পালনের বিধান ও পদ্ধতি নিয়ে মুসলিম আলেমদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। একদল আলেম এটিকে মহানবী (সা.)-এর জন্ম ও জীবন স্মরণের বৈধ ও প্রশংসনীয় আয়োজন হিসেবে দেখেন। অন্যদিকে আরেকদল আলেম মনে করেন, ইসলামের প্রথম যুগে নির্দিষ্ট দিনকে কেন্দ্র করে এ ধরনের আনুষ্ঠানিক আয়োজন ছিল না।
ভালোবাসা, ন্যায় ও মানবতার শিক্ষা
ঈদে মিলাদুন্নবীর মূল তাৎপর্য মহানবী (সা.)-এর জীবন ও চরিত্র স্মরণে নিহিত। তাঁর শিক্ষা ও আদর্শে সত্যবাদিতা, ন্যায়বিচার, ক্ষমাশীলতা, দয়া, সহমর্মিতা এবং মানুষের অধিকার রক্ষার বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
এতিম, দরিদ্র, অসহায়, প্রতিবেশী, নারী ও শিশুসহ সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষায় তাঁর শিক্ষায় গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের বিষয়টিও তাঁর জীবন ও মদিনার সমাজব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ দিক।
সময়ের সঙ্গে মিলাদুন্নবী অনেক সমাজে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক উৎসবে পরিণত হয়েছে। কোথাও এটি বড় পরিসরে পালিত হয়, আবার কোথাও মহানবীর জীবন পাঠ, দরুদ ও দোয়ার মাধ্যমে দিনটি পালন করা হয়।
তবে শুধু জন্মস্মরণ নয়, মহানবী (সা.)-এর সত্যবাদিতা, আমানতদারি, ন্যায়বোধ, ক্ষমাশীলতা, প্রতিবেশীর অধিকার ও মানুষের প্রতি মমত্ববোধকে নিজেদের জীবনে ধারণ করাই এ দিনের অন্যতম বড় শিক্ষা।
প্রায় দেড় হাজার বছর পরও মহানবী (সা.)-এর জীবন ও শিক্ষা মুসলিম সমাজের ধর্মীয়, সামাজিক ও নৈতিক চিন্তায় গভীর প্রভাব রেখে চলেছে। তাই ঈদে মিলাদুন্নবীকে ঘিরে নানা মত ও আয়োজন থাকলেও তাঁর জীবন ও চরিত্র মুসলমানদের কাছে অনুসরণীয় আদর্শ।
ভালোবাসা, ন্যায়, শান্তি ও মানবিকতার শিক্ষা ব্যক্তিজীবন থেকে সমাজজীবনে ছড়িয়ে দেওয়ার মধ্য দিয়েই মহানবী (সা.)-এর জীবন ও আদর্শ স্মরণ আরও অর্থবহ হয়ে উঠতে পারে।
-টিএস