একসময় নাট্যমঞ্চে অভিনয় করতেন। ছিলেন সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত। ছাত্রজীবনে সক্রিয় ছিলেন রাজনীতিতে। এরপর শিক্ষকতা, সরকারি দায়িত্ব, পৌরসভার চেয়ারম্যান, সংসদ সদস্য, প্রতিমন্ত্রী, বিএনপির মুখপাত্র ও দীর্ঘদিন দলের মহাসচিব- জীবনের নানা বাঁক পেরিয়ে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবার বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি।
বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) জাতীয় সংসদে অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ২৫৫ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন বিএনপির এই প্রবীণ নেতা। তাঁর একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী ও লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রম পেয়েছেন ৮৮ ভোট।
নির্বাচনি কর্মকর্তা ও প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন ভোট গণনা শেষে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে বিজয়ী ঘোষণা করেন।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে মোট ৩৪৯টি ভোটের মধ্যে ৩৪৩টি ভোট পড়ে। দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত জাতীয় সংসদের অধিবেশন কক্ষে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। ভোট শেষে সংসদকক্ষেই ব্যালট গণনা করে ফলাফল ঘোষণা করা হয়।
ফল ঘোষণার পরপরই সংসদে নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতিকে অভিনন্দন জানান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানসহ সংসদ সদস্যরা। প্রধান নির্বাচন কমিশনার ফল ঘোষণা করার পর প্রধানমন্ত্রী ও মির্জা ফখরুল পরস্পরের সঙ্গে হাত মেলান। পরে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমানসহ অন্য সংসদ সদস্যরা তাঁকে শুভেচ্ছা জানান।
শুক্রবার (২১ আগস্ট) বঙ্গভবনে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেওয়ার কথা রয়েছে।
নাট্যমঞ্চেই হাতেখড়িমির্জা ফখরুলের পরিচয় কেবল রাজনীতিক হিসেবে নয়। ছাত্রজীবন থেকেই নাট্যচর্চা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। ঠাকুরগাঁওয়ের নাট্যচর্চার সঙ্গে তাঁর ছিল ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। অভিনয়ের পাশাপাশি নাটক পরিচালনাও করেছেন।
সম্প্রতি প্রচারিত জনপ্রিয় ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘ইত্যাদি’তে নিজের সাংস্কৃতিক জীবনের নানা অজানা অধ্যায়ের কথা তুলে ধরেন মির্জা ফখরুল। তিনি জানান, নাট্যজন ফণী ভূষণ পালিতের হাতেই তাঁর নাট্যচর্চার হাতেখড়ি।
খ্যাতিমান চিত্রনায়ক রহমান ছিলেন তাঁর মামাতো ভাই। ঢাকাই চলচ্চিত্রের ‘নবাব’খ্যাত অভিনেতা আনোয়ার হোসেনের সঙ্গেও মঞ্চে অভিনয় করেছেন তিনি। নাটক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি ক্রিকেট খেলেছেন এবং ক্রীড়া সংগঠক হিসেবেও কাজ করেছেন।
এক অনুষ্ঠানে তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছিল- নাট্যজন, শিক্ষক ও রাজনীতিক; কোন পরিচয় তাঁর কাছে বেশি উপভোগ্য? জবাবে সাংস্কৃতিক জগতকেই এগিয়ে রাখেন মির্জা ফখরুল।
ছাত্ররাজনীতি থেকে শিক্ষকতামির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁওয়ে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন আইনজীবী ও সংসদ সদস্য। মা মির্জা ফাতেমা আমিন।
ঢাকা কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিষয়ে পড়াশোনা করেন তিনি। অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পাশাপাশি ছাত্রজীবনেই রাজনীতিতে সক্রিয় হন।
তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে সংগঠনটির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় ছাত্র ইউনিয়নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন তিনি।
১৯৭২ সালে বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে শিক্ষা ক্যাডারে যোগ দেন মির্জা ফখরুল। ঢাকা কলেজের অর্থনীতি বিভাগে শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন। পরে বিভিন্ন সরকারি কলেজে অধ্যাপনা করেন।
সরকারি দায়িত্বের অংশ হিসেবে পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর এবং ইউনেস্কো জাতীয় কমিশনেও কাজ করেন। ১৯৭৯ সালে তৎকালীন উপ-প্রধানমন্ত্রী এস এ বারীর ব্যক্তিগত সচিবের দায়িত্ব পান।
পৌরসভা থেকে জাতীয় রাজনীতি১৯৮৬ সালে সরকারি চাকরি ছেড়ে পুরোপুরি রাজনীতিতে সক্রিয় হন মির্জা ফখরুল। ১৯৮৮ সালে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।
এরপর জাতীয় রাজনীতিতে তাঁর উত্থান শুরু হয়। ১৯৯০ সালে বিএনপিতে যোগ দেন তিনি। ১৯৯২ সালে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি নির্বাচিত হন। ধাপে ধাপে দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে উঠে আসেন।
২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন মির্জা ফখরুল। বিএনপি সরকার গঠন করলে খালেদা জিয়ার মন্ত্রিসভায় কৃষি এবং পরে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।
বিএনপির কঠিন সময়ে কান্ডারি২০০৯ সালের পর বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে মির্জা ফখরুলের ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ওই বছর দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব নির্বাচিত হন তিনি।
২০১১ সালে বিএনপির তৎকালীন মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনের মৃত্যুর পর ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পান মির্জা ফখরুল।
২০১৬ সালের বিএনপির ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলে পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব নির্বাচিত হন তিনি। এরপর দীর্ঘ সময় দলের শীর্ষ নেতৃত্বের অন্যতম প্রধান মুখ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
খালেদা জিয়ার কারাবন্দিত্ব এবং দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দীর্ঘ প্রবাসজীবনের সময়ে দেশের ভেতরে বিএনপির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন মির্জা ফখরুল।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচি ও আন্দোলনকে কেন্দ্র করে তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয়। ২০২৩ সালের ২৮ অক্টোবর ঢাকার বিএনপির মহাসমাবেশকে কেন্দ্র করে সংঘাতের পরদিন তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। কয়েক মাস কারাগারে থাকার পর ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে মুক্তি পান।
আবার সংসদে, এবার রাষ্ট্রপতি২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে আবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন মির্জা ফখরুল। বিএনপি সরকার গঠন করলে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান তিনি।
তবে রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপির প্রার্থী হওয়ার পর দলের মহাসচিব ও জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ করেন মির্জা ফখরুল।
এরপরই শুরু হয় তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় নতুন অধ্যায়।
২৫৫ ভোটে রাষ্ট্রপতিগত ২৪ জুলাই রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করার পর রাষ্ট্রপতি পদটি শূন্য হয়। এরপর জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করছিলেন।
নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিএনপি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে প্রার্থী করে। তাঁর বিপরীতে প্রার্থী হন ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী অলি আহমদ।
বৃহস্পতিবারের ভোটে মির্জা ফখরুল পান ২৫৫ ভোট। অলি আহমদ পান ৮৮ ভোট। মোট ৩৪৩ জন সংসদ সদস্য ভোট দেন।
ফল ঘোষণার পর সংসদ সদস্যরা তুমুল করতালির মাধ্যমে মির্জা ফখরুলকে অভিনন্দন জানান। একে একে সংসদ সদস্যরা তাঁর আসনের সামনে গিয়ে শুভেচ্ছা জানান।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও অভিনন্দনমির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকেও অভিনন্দন আসতে শুরু করেছে।
ফল ঘোষণার কয়েক মিনিটের মধ্যেই ঢাকায় চীনা দূতাবাসের ফেসবুক পেজ থেকে নতুন রাষ্ট্রপতিকে অভিনন্দন জানানো হয়। অভিনন্দন বার্তায় চীন বলেছে, বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ককে তারা অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়। নতুন যুগে যৌথ প্রচেষ্টায় ‘অভিন্ন ভবিষ্যতের জন্য চীন-বাংলাদেশ কমিউনিটি’ গড়ে তুলতে নিবিড়ভাবে কাজ করতে প্রস্তুত তারা।
এরপর মির্জা ফখরুলকে অভিনন্দন জানিয়েছে ঢাকার ব্রিটিশ হাইকমিশনও।
বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) এক বার্তায় ব্রিটিশ হাইকমিশন বলেছে, বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ায় মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে তারা আন্তরিক অভিনন্দন জানাচ্ছে।
বার্তায় আরও বলা হয়, বাংলাদেশ ও যুক্তরাজ্যের মধ্যকার ঘনিষ্ঠ ও দীর্ঘস্থায়ী অংশীদারিত্বকে আরও সুদৃঢ় করতে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে কাজ করার প্রত্যাশা করছে যুক্তরাজ্য।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ফল ঘোষণার পরপরই চীন, যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন মহল থেকে আসা অভিনন্দন নতুন রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণের শুরুতেই আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক আরও জোরদারের প্রত্যাশার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বঙ্গভবনের পথে নতুন অধ্যায়ঠাকুরগাঁওয়ের নাট্যমঞ্চ থেকে শুরু হয়েছিল যার সাংস্কৃতিক যাত্রা, সেই মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাজনৈতিক পথচলা গড়িয়েছে ছাত্ররাজনীতি, শিক্ষকতা, সরকারি চাকরি, পৌরসভা, সংসদ, মন্ত্রিসভা এবং বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব পেরিয়ে রাষ্ট্রপতির পদে।
দীর্ঘ পাঁচ দশকের বেশি সময়ের রাজনৈতিক জীবনে তিনি দেখেছেন জয়-পরাজয়, সরকার ও বিরোধী দলের রাজনীতি, আন্দোলন, মামলা ও কারাবাস।
বিএনপির দুর্দিনে দলের অন্যতম প্রধান কান্ডারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করা মির্জা ফখরুল এবার দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে বসতে যাচ্ছেন।
মঞ্চের অভিনেতা থেকে শিক্ষক, শিক্ষক থেকে রাজনীতিক, রাজনীতিক থেকে মন্ত্রী এবং বিএনপির মহাসচিব- জীবনের প্রতিটি বাঁক পেরিয়ে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নতুন গন্তব্য এখন বঙ্গভবন।
-টিএস