বর্তমানে বাংলাদেশে জ্বালানি সংকট মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। গ্যাসসংকট বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের গণ্ডি পেরিয়ে পুরো অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্রগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে দেশজুড়ে লোডশেডিং তীব্র আকার ধারণ করেছে। গ্যাস ও বিদ্যুৎ-সংকটের কারণে ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্পের উৎপাদন এবং মানুষের গৃহস্থালির কাজকর্ম ব্যাহত হচ্ছে। চাহিদার তুলনায় উৎপাদন কমে যাওয়ায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ (পিজিসিবি)-এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, তালিকাভুক্ত ১৪৩টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে অন্তত ৬২টি জ্বালানি-সংকটে রয়েছে। এর মধ্যে ২৬টি গ্যাসভিত্তিক, ৩৩টি তরল জ্বালানিভিত্তিক এবং ২টি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র–ইরান যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের প্রকট সংকট তৈরি হয়েছে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে তেলের দাম হু হু করে বাড়ছে। কারণ, এই হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করেই বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ জ্বালানি বাণিজ্য পরিচালিত হয়। ফলে শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের অনেক দেশই জ্বালানি সংকটের মুখে পড়েছে। বাংলাদেশ আগে থেকেই রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে জ্বালানিসহ নানা ধরনের অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে ছিল। নতুন করে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সংকট আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে, যা বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য মারাত্মক উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি করেছে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ চাহিদার ৯৫ শতাংশ তেল এবং ৩০ শতাংশ গ্যাস আমদানি করে। দেশের মোট জ্বালানি ব্যবহারের ৬৩ শতাংশই ডিজেল। একসময় ডিজেলের প্রায় পুরোটা মধ্যপ্রাচ্যের কুয়েত থেকে আসত। তবে গত দুই দশকে আমদানির উৎসে বড় পরিবর্তন এসেছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের আমদানির তথ্য বলছে, ২০০৬–০৭ অর্থবছরে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) আমদানি করা ডিজেলের ৯১ শতাংশই কুয়েত থেকে এসেছিল। তখন ভারত থেকে আমদানি ছিল ৯ শতাংশ। তবে এখন সে অবস্থা আর নেই। বর্তমানে ভারত, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, চীন, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরবসহ আরও কয়েকটি দেশ থেকে জ্বালানি আমদানি করা হয়। বর্তমান পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি ৪১ শতাংশ ডিজেল সিঙ্গাপুর থেকে, ২৪ শতাংশ মালয়েশিয়া থেকে এবং ১৫ শতাংশ ভারত থেকে আমদানি করা হয়েছে। অন্যদিকে, তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) যুক্তরাষ্ট্র, ওমান, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং ইরাক থেকে আমদানি করা হয়। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি অসম বাণিজ্য চুক্তি করেছে। যার কারণে বর্তমান সরকারকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বেশি দামে জ্বালানি কিনতে হচ্ছে। এছাড়া এই জ্বালানিবাহী জাহাজ বাংলাদেশে পৌঁছাতে ১৫–২০ দিন সময় লাগছে। স্বাভাবিকভাবেই পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে তেলের দামও বেড়ে যাচ্ছে।
বিগত রাজনৈতিক শাসনামলে ভারত থেকে ডিজেল আমদানি সহজ করতে দুই দেশের মধ্যে বাংলাদেশ–ভারত মৈত্রী পাইপলাইন নির্মাণ করা হয়। ভারতীয় অর্থায়নে নির্মিত প্রায় ১৩০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পাইপলাইন ২০২২ সালের ডিসেম্বর মাসে চালু হয়। এই পাইপলাইনের মাধ্যমে ভারতের আসাম রাজ্যের গোলাঘাট জেলার নুমালিগড় রিফাইনারি থেকে ডিজেল সরাসরি বাংলাদেশের দিনাজপুরের পার্বতীপুর ডিপোতে পৌঁছায়। অর্থাৎ রিফাইনারি থেকে পাইপলাইনে তেল পাঠানোর দুই দিনের মধ্যেই বাংলাদেশে পৌঁছে যায়। ফলে সময় ও অর্থ—উভয়েরই সাশ্রয় হয়।
পরবর্তী রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্কে টানাপোড়েন সৃষ্টি হলে ভারত থেকে তেল আমদানি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর গত মার্চ মাস থেকেই ভারত থেকে ডিজেল আমদানি আবার শুরু হয়েছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন চলতি বছরে এক লাখ টনেরও বেশি ডিজেল আমদানির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। ইতোমধ্যে পাইপলাইনের মাধ্যমে ভারত থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জ্বালানি বাংলাদেশে পৌঁছেছে। বাংলাদেশ সম্প্রতি সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে ভারতের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ পরিশোধিত জ্বালানি তেল কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সরকারি দ্বিপাক্ষিক (জি-টু-জি) চুক্তির আওতায় ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ছয় মাসের জন্য প্রায় ১৬ হাজার ৮৮৮ কোটি ৫২ লাখ টাকা মূল্যের পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির প্রস্তাব অনুমোদনের সুপারিশ করা হয়েছে।
২০১৭ সালে তৎকালীন রাজনৈতিক প্রশাসনের সময়ে ভারতের আদানি গ্রুপের সঙ্গে বিদ্যুৎ আমদানির চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। তখন বিরোধী দলগুলো এ চুক্তির প্রবল সমালোচনা করেছিল। কিন্তু বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পরও ভারতের আদানি গ্রুপের কাছ থেকে ১,৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির সিদ্ধান্ত বহাল রেখেছে। এমনকি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন থাকা সত্ত্বেও আদানির সঙ্গে চুক্তি বাতিল করেনি। বর্তমানে আদানি বাংলাদেশের মোট উৎপাদিত প্রায় ১৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুতের ১০ শতাংশ সরবরাহ করে। যা বাংলাদেশের বিদ্যুৎ সরবরাহব্যবস্থা সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এখন প্রমাণিত হয়েছে, চুক্তিটি বাংলাদেশের জন্য কতটা প্রয়োজনীয় ছিল।
গত কয়েক বছরে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে জ্বালানি ক্ষেত্রে সহযোগিতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ডিজেল সরবরাহ, পাইপলাইনের মাধ্যমে জ্বালানি পরিবহন এবং বিদ্যুৎ বাণিজ্যের পাশাপাশি এখন পরিশোধিত জ্বালানি তেল সরবরাহেও ভারতের ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের ইন্ডিয়ান অয়েল করপোরেশন লিমিটেড (আইওসিএল)-এর কাছ থেকে নিয়মিত জ্বালানি তেল কেনার সিদ্ধান্ত শুধু বাণিজ্যিক সম্পর্কের দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ নয়; বরং এটি ভারত–বাংলাদেশ কৌশলগত সম্পর্কেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ।
বাংলাদেশের সামনে ভারতের ভূখণ্ড ব্যবহার করে নেপাল ও ভুটান থেকে বিদ্যুৎ আমদানির সুযোগ রয়েছে। পরীক্ষামূলকভাবে বাংলাদেশ সঞ্চালন লাইনের মাধ্যমে নেপাল থেকে ৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানিও করেছে। ইতোমধ্যে গ্যাসসংকট সমাধানে মিয়ানমারের সহায়তা চেয়েছে বাংলাদেশ। দেশটি থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস আমদানির প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জ্বালানি আমদানির উৎস আরও বৈচিত্র্যময় করা প্রয়োজন। একক কোনো অঞ্চল বা দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। বৈশ্বিক অস্থিরতার এই সময়ে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতিবেশী দেশ—বিশেষ করে ভারত, নেপাল, ভুটান ও মিয়ানমারের সঙ্গে একটি কার্যকর আঞ্চলিক সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলা অত্যন্ত প্রয়োজন। এসব দেশের সঙ্গে ডিজেল, গ্যাস এবং বিদ্যুৎ গ্রিডের পারস্পরিক সংযোগ স্থাপন করা গেলে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী ও টেকসই হবে।
আরএন