পথশিশুদের সংখ্যা কমিয়ে আনতে সরকারের বাস্তবভিত্তিক কর্মসূচি গ্রহণ এবং এ খাতে পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নারী উন্নয়ন শক্তি (এনইউএস)-এর উদ্যোগে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
রোববার (১২ এপ্রিল) সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের মায়েদের নিয়ে ঢাকার বনশ্রীতে বিশ্ব পথশিশু দিবস ২০২৬ উপলক্ষে এই আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।
সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন নারী উন্নয়ন শক্তির সভাপতি ও নির্বাহী পরিচালক ড. আফরোজা পারভীন। উপস্থাপিত তথ্যানুযায়ী, ইউনিসেফ বাংলাদেশের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বাংলাদেশে প্রায় ৩৪ লাখ (৩.৪ মিলিয়ন) শিশু পথপরিস্থিতিতে বসবাস করছে। এদের অনেকেই রাস্তায় বসবাস ও জীবিকা নির্বাহ করে এবং চরম অনিশ্চয়তা ও ঝুঁকির মধ্যে দিন কাটায়। এছাড়াও দেশে প্রায় ৫৬.৯ মিলিয়ন শিশু (০–১৭ বছর) রয়েছে, যাদের একটি বড় অংশ দারিদ্র্য, সহিংসতা, শিশুশ্রম ও বাল্যবিবাহের ঝুঁকিতে রয়েছে; এর মধ্যে প্রায় ১১.৩% শিশু শিশুশ্রমে নিয়োজিত।
সভায় বক্তারা পথশিশুদের বহুমাত্রিক সংকট ও প্রধান সমস্যাসমূহ তুলে ধরেন, যেমন: নিরাপদ আশ্রয় ও বাসস্থানের অভাব, শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হওয়া, স্বাস্থ্যসেবা ও পুষ্টির ঘাটতি, শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের ঝুঁকি, মাদকাসক্তি ও অপরাধে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা, সামাজিক বৈষম্য ও অবহেলা।
ফোরাম ফর কালচার অ্যান্ড হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট-এর নির্বাহী পরিচালক ড. সুলতান মোহাম্মদ রাজ্জাক বলেন, পথশিশুদের সমস্যার সমাধান সাময়িক সহায়তার মাধ্যমে নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও রাষ্ট্রীয় বাজেটের মাধ্যমে সরকারকেই এগিয়ে আসতে হবে। ইয়াং উইমেন ফর ডেভেলপমেন্ট রাইটস অ্যান্ড ক্লাইমেট (ওয়াইডব্লিউডিআরসি)-এর এক্সিকিউটিভ চেয়ারপারসন নুসরাত সুলতানা আফরোজ বলেন, পথশিশুদের জন্য আলাদা সুরক্ষা কাঠামো ও দক্ষতা উন্নয়নমূলক কর্মসূচি জরুরি, যাতে তারা মূলধারার জীবনে ফিরে আসতে পারে। গ্লোবাল ওয়ার্কফোর্স সার্ভিসেস (জিডব্লিউএস)-এর প্রতিনিধি লামিয়া হাসান উল্লেখ করেন, দক্ষতা উন্নয়ন, কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি না করলে পথশিশু সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। এফসিএইচডি-এর নির্বাহী সদস্য শাহানারা বেগম বলেন, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং পরিবারভিত্তিক সহায়তা কর্মসূচি জোরদার করা জরুরি।
সভায় আরও বক্তব্য রাখেন ডোমেস্টিক ওয়ার্কার এমপ্লয়ার অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশ-এর প্রচার সম্পাদক সেলিনা খাতুন, নারী উন্নয়ন শক্তির নির্বাহী সদস্য বিলকিস আক্তার এবং সুবিধাবঞ্চিত নারীদের প্রতিনিধি মনোয়ারা বেগমসহ আরও অনেকে।
মূল দাবি ও সুপারিশসমূহ: বক্তারা সম্মিলিতভাবে সরকারের প্রতি নিম্নোক্ত দাবিগুলো উত্থাপন করেন—
১. পথশিশুদের জন্য বিশেষ বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধি করা
২. জাতীয় পর্যায়ে সমন্বিত পুনর্বাসন কর্মসূচি গ্রহণ করা
৩. বিনামূল্যে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা
৪. শিশুশ্রম নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা
৫. দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা
৬. পথশিশু সুরক্ষায় আইন বাস্তবায়ন জোরদার করা
সভায় বক্তারা জোর দিয়ে বলেন, পথশিশুরা সমাজের বোঝা নয়; বরং সম্ভাবনাময় মানবসম্পদ। সঠিক পরিকল্পনা, পর্যাপ্ত বাজেট এবং আন্তরিক উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে তাদের জীবন পরিবর্তন করা সম্ভব। তাই এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া সময়ের দাবি।
/আরএন