এ বছরের ঈদ-উল-আযহার সময়ে পশু কুরবানির জন্য ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন ৬২৫টি এবং ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন ৫৪৯ টি স্থান নির্ধারণ করে দিয়েছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল ঢাকা শহরকে কোরবানির পশুর বর্জ্য মুক্ত রাখা। উভয় সিটি কর্পোরেশনের দাবি অনুযায়ী তারা জনগণকে সহায়তা করার জন্য প্রতিটি নির্ধারিত স্থানে ছাউনি ও পানির বন্দোবস্তের সঙ্গে সঙ্গে একজন ইমাম ও একজন অভিজ্ঞ কসাই এর বন্দোবস্ত করেছিল। যদিও কার্যক্ষেত্রে ছাউনি ব্যতীত অন্য কোনো সুবিধাদি পরিলক্ষিত হয়নি। কিন্তু অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় ছিল যে বিগত কয়েক বছরে অনেক প্রচারণা সত্ত্বেও খুব অল্প কিছু নাগরিকই এই সব স্থানে কোরবানির জন্য আসে। তারা বেশির ভাগই খোলা রাস্তার উপরেই পশু কোরবানি করে। যার ফলে যানবাহন ও অন্য নাগরিকদের জন্য ব্যাপক সমস্যার সৃষ্টি হয়। তারা আসলে কর্তৃপক্ষের নির্দেশ অনুসরণ করার কোনো দরকার-ই বোধ করেনা।
সিটি কর্পোরেশনগুলোর কর্মকর্তারাও যেন এমনটা হবে তা আগেই জানতো। যার ফলে শহরের সর্বত্র থেকে আবর্জনা পরিষ্কারের জন্য যথাযথ পদক্ষেপ তারা আগেই নিয়ে রেখেছিল। এটা অবশ্যই প্রশংসার দাবি রাখে যে, এবার বেশির ভাগ জায়গাতেই নাগরিকেরা স্বউদ্যোগেই কোরবানির পশুর বর্জ্য পরিষ্কার করেছে এবং সিটি কর্পোরেশনের কর্মীরাও ঢাকা শহরকে পরিষ্কার করতে প্রশংসনীয় কাজ করেছে। কিন্তু এটা অত্যন্ত উদ্বেগজনক যে, আমরা কর্তৃপক্ষের একটি নির্দেশ মান্য করতে উদ্যোগী হচ্ছি না এবং সকলেই যেন এটিকে মেনে নিয়েছে। এটি যেন বাংলাদেশের জনগনের একটি বৈশিষ্ট্যে রূপ নিয়েছে।
কিছুদিন আগে নিরাপদ সড়কের দাবিতে ছাত্ররা একটি শক্ত আন্দোলন গড়ে তুলেছিল। তাদের দাবি ও কার্যক্রমের মধ্যে প্রশিক্ষিত চালক, শৃঙ্খলাপূর্ণ লেন ব্যবস্থা, ফিটনেসযুক্ত যানবাহন ইত্যাদি বিষয়গুলো থাকলেও আইনের প্রতি জনগনের শ্রদ্ধাশীলতার বিষয়টি সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। এই আন্দোলনরত ছাত্ররাও অনেকে ট্রাফিক নিয়মের ব্যাপারে খুব কমই জানে এবং তারাও বাস্তবে প্রতিনিয়তই এই আইনগুলোকে ভঙ্গ করে। এর মূল কারণ হচ্ছে তাদেরকে আসলে কখনোই তাদের বাবা-মা অথবা শিক্ষকেরা এই নিয়ম-কানুনগুলো সম্পর্কে শেখায়নি। এই ব্যাপক প্রচার পাওয়া আন্দোলনটি আসলে ট্রাফিক আইন পুনঃপ্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে নয় বরং সহপাঠীর মৃত্যুতে তৈরি হওয়া ক্ষোভের একটি প্রতিফলন ছিল মাত্র।
আমাদের দেশের জনগণ ক্রমাগত রাস্তাঘাটে চলার সময় আইন ভঙ্গ করে থাকে। রাস্তা আটকে গণপরিবহনের চালকদের যাত্রী উঠানো অবশ্যই অপরাধ। কিন্তু আমরা জনগণেরাই এভাবে গণপরিবহনে অবৈধভাবে উঠে থাকি। মাঝে মাঝেই আমরা রিক্সাচালকদেরকে উলটো পথে যেতে বলি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আমরা কখনো রাস্তা পারাপারে ফুটওভার ব্রিজ বা আন্ডারপাস ব্যবহার করি না এবং যখন খুশি তখন রাস্তা পার হই। এর ফলে অগণিত দুর্ঘটনা ঘটে থাকে এবং আমরা যদি ঠিকমত অনুসন্ধান করি তাহলে সড়ক দুর্ঘটনার পিছনে এটি একটি প্রধান কারণ হিসেবে উঠে আসবে। অবশ্যই এটি কখনোই গ্রহণযোগ্য নয় যে, রাস্তায় ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলবে অথবা লাইসেন্সবিহীন চালক একটি বাস চালাবে। কিন্তু আমরা আসলেই সড়কে ঘটে যাওয়া নানা ঘটনা দুর্ঘটনার একটি মূল কারণকে সম্পূর্ণরূপে এড়িয়ে যাচ্ছি।
ট্রাফিক সপ্তাহ ২০১৮ চলাকালীন সময়ে জনগণকে রাস্তায় চলাচলের নিয়মকানুন সম্বন্ধে সচেতন করতে রোভার-স্কাউট নিয়োজিত করা হয়। কিন্তু বিভিন্ন মিডিয়াতে আসা কিছু ছবি থেকে দেখা যায় কিভাবে সর্বাত্মক চেষ্টা করার পরেও তারা জনগণকে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন করা থেকে বিরত রাখতে ব্যর্থ হয়। এটি আমাদের নিয়ম কানুন মানতে যে অনীহা তারই বহিঃপ্রকাশ। আশংকাজনকভাবে আমাদের শিশুরাও প্রতিনিয়ত তাদের বাবা-মা ও বড়দের থেকে এই নিয়ম না মানার জীবনযাত্রাটাই শিখছে। এই আচরণ চলতে থাকলে সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিহত করা অসম্ভব হবে। সন্দেহাতীতভাবে যদি আমরা সচেতন হই এবং সেভাবেই কাজকর্ম করি তাহলে রাস্তাঘাটে দুর্ঘটনা অনেকাংশেই কমে যাবে।
বাংলাদেশের সকল শহরেই যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা ফেলা একটি বড় সমস্যা। বর্তমানে গ্রামগুলিতেও এই সমস্যা পরিলক্ষিত হচ্ছে। আমরা যখন এমনটা করি তখন কেউ আমাদের বাধা দেয়া না। ময়লা-আবর্জনা ফেলার জন্য যথেষ্ট নির্ধারিত জায়গা না থাকাটা অবশ্যই এর একটা বড় কারণ। কিন্তু যদি সেই বন্দোবস্ত থাকে, তাহলেও আমরা সেটা ব্যবহার করতে খুব একটা উৎসাহী হইনা। ঢাকা শহরের বিভিন্ন স্থানে সিটি কর্পোরেশন বেশ কিছু ডাস্টবিন স্থাপন করেছিল, যদিও তা জনসংখ্যার হিসেবে পরিমাণে খুবই কম। কিন্তু এই ডাস্টবিনগুলোও প্রায়শই ব্যবহৃত হয় না। বরং আমরা রাস্তায় ময়লা আবর্জনা ফেলে দিই। এ থেকে মারাত্মক পরিবেশ দূষণ হতে পারে জেনেও আমরা এ ধরনের আচরণ পরিহারে সচেষ্ট নই।
উন্মুক্তস্থানে ধুমপান না করার জন্য আইন থাকা সত্ত্বেও সর্বদাই সারা দেশে এই ধরনের কাজে লিপ্ত অবস্থায় লোকজনের দেখা পাওয়া যায়। যদিও তারা আইনটি সম্পর্কে সচেতন তবুও তারা এটিকে অনুসরণ করার প্রয়োজন অনুভব করে না। ধুমপান করা শেষ হলে তারা সিগারেটের বাকি অংশটুকু যেকোনো স্থানে ছুঁড়ে ফেলে দেয়। আমাদের দেশে যানবাহনগুলো অযথাই রাস্তায় হর্ণ বাজাতে থাকে যা থেকে মারাত্মক শব্দ দূষণের সৃষ্টি হয়। যখনই আমরা কোনো কিছুর জন্য লাইনে দাঁড়াই যেমন; চিকিৎসকের সিরিয়াল নেয়ার জন্য অথবা খেলার টিকেট কাটার জন্য আমরা লাইন ভঙ্গ করার জন্য সবসময়ই প্রস্তুত থাকি। এমনকি ঘুষ দিয়ে সামনে চলে যেতেও আমরা সদা প্রস্তুত।
যখনই আমাদের দেশে বিমানবন্দরে একজন বিদেশি নাগরিক অবতরণ করে, একেবারে শুরু থেকেই তারা নানা ধরনের অনিয়ম দেখতে পায় এবং এটি আমাদের দেশ ও নাগরিকদের সম্পর্কে একটি খারাপ ধারণা প্রদান করে। আমাদের জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রে আমরা বিশৃঙ্খলতার ছাপ রেখে যাচ্ছি এবং একদিন আমাদের উন্নয়নের সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে এই বিষয়টি সামনে চলে আসবে।
নিয়মিত আয়কর প্রদান করলেও আমাদের ব্যবহার ও চরিত্র একজন ভালো নাগরিকের যোগ্য নয়। এবং এ ক্ষেত্রে শিক্ষাগত যোগ্যতার বিচারে আমাদের নাগরিকদের মধ্যে আসলে কোনো ভেদাভেদ নেই। আমাদের নাগরিকদের যে চরিত্র তা বিশ্বের বেশির ভাগ দেশেই অচিন্ত্যনীয়। ক্রমাগত নিয়ম শৃঙ্খলা ভঙ্গ করা আমাদের অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেছে। বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ, খাদ্য নিরাপত্তা, মিউনিসিপালিটি বিধি, ট্রাফিক বিধি ইত্যাদিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে আমাদের পর্যাপ্ত আইনকানুন রয়েছে। কিন্তু আমাদেরকে এই আইনগুলো জানানো অথবা শেখানো হয় না। তার উপরে কর্তৃপক্ষ কঠোরভাবে এই আইন কানুনগুলো প্রয়োগে সক্রিয় নয়। এটি আসলে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত এবং এই সমস্যাটির দিকে আমাদেরকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সমাধানের পথ খুঁজতে হবে।
সকল উন্নত এবং প্রায় সব উন্নয়নশীল দেশে বাচ্চাদেরকে তাদের শিক্ষাজীবনের শুরু থেকেই শৃঙ্খলার বিষয়গুলি শেখানো হয় যাতে করে তাদের মাঝে নীতি ও বিবেকের বিকাশ ঘটে। শিশুদের হাতেকলমে কিভাবে রাস্তায়, উন্মুক্ত স্থানে অথবা বাড়িতে আচরণ করতে হয় তা শেখানো হয়ে থাকে। এশিয়ার কিছু দেশে এমনকি বাচ্চারা তাদের বাবা মাকে কিভাবে শ্রদ্ধা করবে সেটিও শেখানো হয়। তারা নিয়মিত বাচ্চাদেরকে তাদের ব্যবহার ও নিয়ম কানুন বোঝার উপরে মূল্যায়ন করে থাকে। শিশুদের বাবা-মা এবং শিক্ষকেরা সকলেই খুবই সতর্ক থাকে যেন তাদের বাচ্চাটি ভুল কিছু না শেখে।
বাচ্চাদের ব্যাপারে ঐ দেশগুলোতে এই সতর্কতার কারণ হলো বাচ্চাদের বাবা-মায়েরাও একই রকম শিক্ষা লাভ করেছে। কিন্তু আমাদের দেশে এরকম শিক্ষার মারাত্মক অভাব। আমাদের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় নৈতিক ও আচারিক শিক্ষা অন্তর্ভূক্ত নয় এবং এ ব্যাপারে কোনো গুরুত্বও নেই। এর ফলে বাচ্চারা তাদের আশপাশ থেকেই সবকিছু শেখে এবং তা সম্পূর্ণই নিয়ম বহির্ভূত কর্মকান্ডে ভরা। ফলে ভুল আচরণের একটি ধারা এদেশে তৈরি হয়েছে এবং অন্তত আগামী দুই প্রজন্মের জন্য এ থেকে বের হয়ে আসা খুব কঠিন।
বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের এখনই এ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা উচিত। তাদের যথাযথ নম্বরসহ চারিত্রিক প্রশিক্ষণকে শিক্ষা ব্যবস্থায় অন্তর্ভূক্ত করতে হবে। শিক্ষা জীবনে এগিয়ে যেতে হলে একজন ছাত্রকে অবশ্যই চারিত্রিক পরীক্ষায় পাশ করতে হবে। বিভিন্ন পরিবেশগত ও ট্রাফিক আইন বাচ্চাদেরকে জুনিয়র স্কুলেই যথার্থভাবে শিক্ষা দিতে হবে।
যেহেতু শিক্ষকেরা আমাদের দেশের পরবর্তী প্রজন্মগুলোকে শৃঙ্খলার চেতনা প্রদান করার ক্ষেত্রে চাবিকাঠি, যেহেতু তাদেরকে শিশুদের চারিত্রিক উন্নয়নের ওপরে যথাযথ গুরুত্ব দেয়ার জন্য সঠিকভাবে প্রশিক্ষিত হতে হবে। বাল্যকাল থেকেই সভ্য আচরণ করার জন্য সচেতনতা তৈরি করতে হবে। বাবা-মাদেরকেও এ প্রশিক্ষণের অন্তর্ভূক্ত করতে হবে। আমাদের শহর ও গ্রাম উভয় এলাকার বেশিরভাগ শিশুই প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যায় বিধায় একটু অতিরিক্ত চেষ্টার মাধ্যমে আমাদের দেশের প্রেক্ষাপট ও অবস্থা পরিবর্তনের এক বিশাল সুযোগ আমাদের হাতে রয়েছে।
ভিশন ২০২১, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা, ভিশন ২০৪১ সহ নানা ধরনের প্রশংসনীয় উন্নয়ন কর্মকান্ডের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ এগিয়ে চলেছে। এবং এসকল নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে আমরা খুবই ভালো করছি। কিন্তু নাগরিকদের জীবনযাত্রায় কোনো পরিবর্তন না হলে এসব কিছুর কোনো মানেই থাকবে না। আমাদেরকে সচেতন হতে হবে এবং সভ্য আচরণ প্রদর্শন করতে হবে যাতে করে নাগরিক হিসেবে আমরা সরকারের উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে আমাদের ভূমিকা যথাযথভাবে পালন করতে পারি। যদি আমরা এ লক্ষ্যে সফল হই তাহলেই বিশ্বের কাছে আমরা আমাদের অবস্থান ধরে রাখতে পারবো এবং আমাদের দেশকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে সক্ষম হবো। এখনই এ লক্ষ্যে কাজ শুরু করার অন্তিম সময় এবং আমরা আশা রাখি নীতিনির্ধারক, কর্তৃপক্ষ ও জনগণের সমন্বয়ে খুব দ্রুতই এ লক্ষ্য অর্জনের যাত্রা শুরু হবে।
লেখক: প্রধান সম্পাদক, মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী (এমএনএ); সম্পাদক, কিশোর বাংলা এবং ভাইস চেয়ারম্যান, ডেমোক্রেসী রিসার্চ সেন্টার (ডিআরসি)।