চট্টগ্রামে ডেঙ্গুর বিস্তার রোধে মাঠপর্যায়ে জোর তৎপরতা চালাচ্ছেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। সীতাকুণ্ড ও কর্ণফুলীর পর এবার হাটহাজারীতে ঝটিকা মশকনিধন ও পরিচ্ছন্নতা অভিযানে অংশ নিয়েছেন তিনি। শুধু প্রশাসনিক তদারকিই নয়, নিজ হাতে ফগার মেশিন দিয়ে ওষুধ ছিটিয়ে সাধারণ মানুষকে সচেতন করার কাজে নেমেছেন জেলা প্রশাসক। তাঁর লক্ষ্য—প্রশাসনের উদ্যোগের পাশাপাশি জনপ্রতিনিধি, সামাজিক সংগঠন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করে ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে একটি সর্বাত্মক সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা।
শনিবার হাটহাজারী পৌরসভা ও উপজেলার ১৪টি ইউনিয়নের ১৫টি চিহ্নিত ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় একযোগে এ মশকনিধন ও পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করা হয়। উপজেলা প্রশাসন ও পৌরসভার যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত একটি সচেতনতামূলক শোভাযাত্রা (র্যালি) শেষে জেলা প্রশাসক নিজে ফগার মেশিন দিয়ে মশকনিধনের ওষুধ স্প্রে করেন। একই সময়ে এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস ও লার্ভা নিধনে লার্ভিসাইড ছিটানো হয়।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে ধারাবাহিক উদ্যোগের অংশ হিসেবে গত ২৬ সেপ্টেম্বর সীতাকুণ্ডে সাত দিনব্যাপী বিশেষ কর্মসূচির উদ্বোধন করেছিলেন জেলা প্রশাসক। পৌরসভা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে পরিচালিত ওই অভিযানে সাতটি অতি-ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাকে বিশেষ প্রাধান্য দেওয়া হয় এবং সংগ্রহ করা হয় ১৬টি ফগার মেশিন ও প্রয়োজনীয় কীটনাশক। সেখানেও তিনি নিজে নালা পরিষ্কার ও মশকনিধনের কাজে সরাসরি যুক্ত ছিলেন।
এরপর গত ৩ অক্টোবর কর্ণফুলী উপজেলায় ডেঙ্গু প্রতিরোধ কার্যক্রমে অংশ নেন জেলা প্রশাসক। সৈন্যারটেক থেকে ব্রিজঘাট পর্যন্ত সচেতনতামূলক র্যালি শেষে চরপাথরঘাটা ইউনিয়ন পরিষদ এলাকায় মশকনিধন অভিযানের শুভসূচনা করেন। সেদিন সেখানকার ১০টি চিহ্নিত ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বিশেষ কর্মসূচি বাস্তবায়িত হয়। তারই ধারাবাহিকতায় এবার হাটহাজারীতে বিস্তৃত পরিসরে এই পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালানো হলো।
জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, ‘পরিচ্ছন্ন করি নগর-গ্রাম, গড়ি নান্দনিক চট্টগ্রাম’ স্লোগানকে সামনে রেখে গত ২৫ জুলাই থেকে সমগ্র জেলাজুড়ে বিশেষ পরিচ্ছন্নতা অভিযান চলছে। কর্মসূচির প্রথম দিনেই প্রায় ৬ হাজার ২০০ কর্মকর্তা-কর্মচারী অংশ নিয়ে বিভিন্ন সরকারি দপ্তর ও স্থাপনা থেকে প্রায় ১৩৫ টন বর্জ্য অপসারণ করেন।
পরবর্তী সময়ে জেলার প্রায় ১ হাজার ২০০ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিভিন্ন জলাশয় ও গুরুত্বপূর্ণ জনপরিসরে এ কার্যক্রম চালানো হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় গত ১২ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া তিন মাসব্যাপী বিশেষ ডেঙ্গু প্রতিরোধ কর্মসূচি। এর আওতায় জেলার প্রায় দুই হাজার মসজিদ ও এর আশপাশের প্রাঙ্গণেও পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।
পাশাপাশি ডেঙ্গু আক্রান্তদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, জেনারেল হাসপাতাল এবং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে ডেঙ্গু ডেডিকেটেড শয্যা ও পর্যাপ্ত পরীক্ষার কিট সরবরাহের সুব্যবস্থা জোরদার করেছে জেলা প্রশাসন।
হাটহাজারীর আয়োজনে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, সেপ্টেম্বর মাসে চট্টগ্রামজুড়ে ডেঙ্গু নিয়ে যে তীব্র আতঙ্ক ছিল, অক্টোবর মাসে এসে তা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এসেছে এবং প্রাণহানির হারও কমেছে।
এর আগে কর্ণফুলীর কর্মসূচিতে জেলা প্রশাসক জানিয়েছিলেন, সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চট্টগ্রামে ডেঙ্গুতে ২১ জনের মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে সীতাকুণ্ড ও কর্ণফুলী উপজেলায় সংক্রমণ ছিল সবচেয়ে বেশি। তবে সীতাকুণ্ডে বিশেষ কর্মসূচি জোরদার করার পর টানা এক সপ্তাহে কোনো মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি।
প্রাণহানি রোধে জেলা প্রশাসক আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, “আমরা চাই না আমাদের কোনো একটি মূল্যবান প্রাণ এভাবে ঝরে যাক, কোনো পরিবারের আলো এভাবে নিভে যাক। কারণ, এই তরুণ ও নতুন প্রজন্মই আগামীতে দেশকে আলোকিত করবে এবং বিশ্বমঞ্চে নেতৃত্ব দেবে।”
ডেঙ্গু মহামারি রুখতে যৌথ সামাজিক দায়িত্বের ওপর গুরুত্বারোপ করে জেলা প্রশাসক বলেন, একা কোনো ব্যক্তি বা সরকারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে এ ধরনের প্রাদুর্ভাব সম্পূর্ণ নির্মূল করা সম্ভব নয়। প্রশাসনের সাথে রাজনৈতিক নেতৃত্ব, সমাজকর্মী ও সাধারণ জনগণকে এক হয়ে লড়তে হবে। মশার প্রজননক্ষেত্র ধ্বংস, বাসাবাড়ি পরিষ্কার রাখা ও পাত্রে জমে থাকা পানি ফেলে দিতে সবাইকে সচেতন হতে হবে।
কর্মসূচিতে তরুণ সমাজের অংশগ্রহণ দেখে সন্তোষ প্রকাশ করে তিনি গণমাধ্যমকর্মীদের সমাজের নেতিবাচক খবরের পাশাপাশি এসব ইতিবাচক ও সেবামূলক উদ্যোগগুলো বেশি বেশি তুলে ধরার আহ্বান জানান।
হাটহাজারীর এ কর্মসূচিতে চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. শরীফ উদ্দিন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌর প্রশাসক মুহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মুমিন, সহকারী কমিশনার (ভূমি), উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও স্থানীয় সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
জেলা প্রশাসক আশাবাদ ব্যক্ত করেন, সর্বস্তরের জনগণের সহায়তা ও এ প্রতিরোধমূলক তদারকি বজায় থাকলে নির্ধারিত তিন মাসের আগেই চট্টগ্রামকে ডেঙ্গুমুক্ত করে সংক্রমণ শূন্যে নামিয়ে আনা সম্ভব হবে।
এসএ