
’প্রোটিন যা শক্তি যোগায় এবং সুরক্ষা দেয়’-এ স্লোগান সামনে রেখে প্রতিবছরের মতো এ বছরও অক্টোবর মাসের দ্বিতীয় শুক্রবার ( আজ) পালিত হচ্ছে বিশ্ব ডিম দিবস-২০২৬। এই দিবসের উদ্দেশ্য হলো, মানুষকে ডিমের পুষ্টিগুণ সম্পর্কে সচেতন করা, নিয়মিত ডিম খাওয়ায় উৎসাহ দেওয়া এবং ডিম নিয়ে প্রচলিত ভ্রান্ত ধারণাগুলো দূর করা। কিন্তু জাতীয় ভাবে এ দিনটি পালন করা হবে ১৩ অক্টোবর। কিন্তু বিভিন্ন বেসরকারি সংগঠন স্থানীয় পর্যায়ে এ দিনটি পালনের ঘোষণা দিয়েছে।
প্রাণীসম্পদ মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে দেশে ডিমের উৎপাদন ছিল ১ হাজার ৪৯৩ কোটি পিস। যা সবশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে গিয়ে ঠেকেছে ২ হাজার ৫০৯ কোটি পিসে। যেখানে এই এক দশকে উৎপাদন বেড়েছে ৬৮ শতাংশের বেশি। অর্থাৎ বর্তমানে প্রতিদিন ৬ কোটি পিসের বেশি ডিম উৎপাদন হচ্ছে।
এই উৎপাদনের ৮০ শতাংশই আসে প্রান্তিক খামারিদের কাছ থেকে। সস্তা প্রোটিনের সহজলভ্য এই যোগান যারা নিরবিচ্ছিন্নভাবে দিয়ে যাচ্ছে তারাই আবার বছরের বড় একটি অংশ থাকে বিপদে। কারণ বেশিরভাগ সময়ই খামারিদের ডিম বিক্রি করতে হয় উৎপাদন খরচের কমে।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পোল্ট্রি ফিড, বাচ্চা, ওষুধ ও জ্বালানির দাম বাড়ায় খামার পর্যায়ে উৎপাদন খরচ বাড়ছে। অন্যদিকে মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব ও সরবরাহ চেইনের ত্রুটির কারণে খামারিদের বিক্রয়মূল্য (ফার্ম-গেট প্রাইস) এবং খুচরা বাজারের মূল্যের মধ্যে বড় ব্যবধান থেকে যাচ্ছে। ফলে প্রান্তিক খামারিরা লোকসানে পড়ছেন।
জানা গেছে, বর্তমানে খামারি পর্যায়ে প্রতিটি ডিমের উৎপাদন খরচ ১০ দশমিক ৫০ টাকা বা তারও বেশি। তবে প্রতিটি ডিম খামারি বিক্রি করছেন এর চেয়ে কম দামে। অথচ ফিডের দাম বেড়ে যাওয়ায় বেড়েছে উৎপাদন খরচ।
বগুড়া সদরের পোলট্রি খামারি হাফিজুর রহমান বলেন, গত ২০ থেকে ২৫ দিনের ব্যবধানে বিভিন্ন ধরনের প্রাণিজ খাবারের দাম কেজিতে দুই থেকে তিন টাকা বেড়েছে। ৫০ কেজির এক বস্তা ফিডের দাম বেড়েছে সর্বোচ্চ ১৫০ টাকা। তবে ব্রান ও ভুট্টার দাম বেড়েছে সবচেয়ে বেশি। ৫০ কেজির এক বস্তা ব্রানের দাম ১ হাজার ৩০০ টাকা থেকে বেড়ে ১ হাজার ৮০০ টাকা হয়েছে। ভুট্টার দাম কেজিতে ২৫ টাকা থেকে বেড়ে ৩৭ টাকা হয়েছে। ৫০ কেজির এক বস্তা পোলট্রি ফিডের দাম বেড়ে সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৬৭৫ টাকা পর্যন্ত উঠেছে।
তিনি বলেন, এই অবস্থায়ও ডিমের উৎপাদনের খরচের কমে আমাদেরকে ডিম বিক্রি করতে হচ্ছে। কারণ আমরা বাজার নির্ধারণ করতে পারি না। বাজার যেভাবে দাম ঠিক করে দেয় সেটার উপরই আমাদের ভরসা করতে হয়।
দেখাগেছে, ঢাকার বাজারে এখন প্রতিটি ফার্মের মুরগির বাদামি ডিম বিক্রি হচ্ছে ১৩ টাকা বা তারও বেশি দামে। অর্থাৎ উৎপাদন খরচের চেয়ে ২ দশমিক ৫০ টাকা বেশি দামে বাজারে ডিম বিক্রি হচ্ছে। কিন্তু উৎপাদনকারীর ভাগে কয়েক পয়সা লাভও তোলা দায় হয়ে দাড়িয়েছে।
প্রান্তিক খামারিদের সংগঠন বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশন (বিপিআইএ) এর তথ্য বলছে, বাংলাদেশে বর্তমানে নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত লেয়ার (ডিম উৎপাদনকারী) খামারের সংখ্যা প্রায় ৪০ হাজারের বেশি। এর মধ্যে ২০ হাজার ৪৬৪টি নিবন্ধিত।
বিপিআইএ এর সভাপতি মোশারফ হোসেন চৌধুরী বলেন, ডিমের দাম বৃদ্ধি নিয়ে ভোক্তাদের মধ্যে নানা বিভ্রান্তি রয়েছে। বলা হচ্ছে খামারিরা ডিমের দাম বৃদ্ধি করছে। কিন্তু খামার থেকে বাজার পর্যন্ত ডিম আসতে মাঝখানে কিছু মধ্যস্বত্তভোগীদের কারণে বাজারে ডিমের দাম বাড়ছে। এই মধ্যস্বত্তভোগীরাই মূলত প্রতিটি ডিমে দুই টাকা বা তারও বেশি নিয়ে থাকে।
তিনি বলেন, সরকারের উচিৎ খামারীরা যাতে করে ডিম সরাসরি বাজারে আনতে পারে এমন একটি সরবরাহ চেইন তৈরি করা। বাজার ব্যবস্থার এ উন্নয়ন সরকারকে সহায়তা করতে হবে। পাশাপাশি পোলট্রি শিল্পের ৫০ ভাগের বেশি খরচ হয় খাদ্যের পেছনে। এক্ষেত্রে খাদ্য মূল্য কমাতে উদ্যোগ প্রয়োজন।
বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাষ্ট্রিজ সেন্টাল কাউন্সিলের (বিপিআইসিসি) আহবায়ক মশিউর রহমান বলেন, খামারিরা বছরের বেশিরভাগ সময়েই ডিমের উৎপাদন খরচ পাওয়া নিয়ে সংকটে থাকেন। সরকারের হিসেবে উৎপাদন খরচের তালিকা থাকলেও সে সময় সর্বনিম্ন মূল্য বেধে দেওয়া হয় না। তবে ডিমের দাম বেড়ে গেলে তখন আবার সর্বোচ্চ মূল্য বেধে দেওয়া হয়। এ কারণে উৎপাদনকারীর ন্যয্য মূল্য নিশ্চিত হয় না।
খামারীরা জানান, ফিডের দাম বাড়ায় উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার প্রতিবাদে গত চার মাসে দেশের বিভিন্ন এলাকায় পথে নেমেছেন খামারিরা। কারণ তারা উৎপাদন খরচের কমে ডিম বিক্রি করেছেন। গত জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রাজশাহী, গাজীপুর, পাবনা, কিশোরগঞ্জ, কুমিল্লা, নরসিংদী, ঢাকা, কুষ্টিয়া ও ময়মনসিংহে মানববন্ধন, বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ, ডিম ভেঙে প্রতিবাদ ও স্মারকলিপি দেওয়ার কর্মসূচি হয়েছে। কারণ খামারিরা লোকসানে ডিম বিক্রি করছিলেন। এসব কর্মসূচিতে ফিডের দাম কমানো, কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক-কর কমানো এবং ডিম-মুরগির ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতের দাবি জানানো হয়। এ সময়ে উৎপাদনকারীরা ৮ থেকে ৯ টাকা দরে প্রতিটি ডিম বিক্রি করেছে। ডিমের দাম যখন বেড়ে যায় সরকার সর্বোচ্চ বিক্রয়মূল্য নির্ধারণ করে দেয়। কিন্তু যখন দাম একেবারে কমে আসে তখন ভোক্তার উপকার হয়, কিন্তু খামারি সর্বসান্ত হয়ে যায়, লোকসানের ভার বেড়ে যায়। তবে সরকার খামারির সর্বনিম্ন বিক্রয়মূল্য ঠিক করে দেয় না। যে দাবি খামারিরা দীর্ঘদিন ধরেই জানিয়ে আসছে।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, খামারি দাম না পেলেও তার উৎপাদন বন্ধ করে দেন না। কারণ এটা এমন একটা প্রক্রিয়া যেখান থেকে চাইলেই বেরিয়ে আসা যায় না। কারণ বিনিয়োগ করে ডিম দেওয়ার উপযোগী মুরগি তৈরি করার করার পর তাকে থামিয়ে দেওয়া যায় না। আশায় থাকতে হয়, কখন এটা বাড়বে।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) জানিয়েছে, নির্ধারিত মানদন্ড অনুযায়ী প্রতি বছর একজন সুস্থ স্বাভাবিক মানুষের অন্তত ১০৪টি ডিম খাওয়া উচিত। তবে বাংলাদেশে এখন ডিমের এই প্রাপ্যতা এফএও এর নির্ধারিত সংখ্যাকে ছাড়িয়ে গেছে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের হিসেব বলছে, প্রতি বছর এখন বাংলাদেশে জনপ্রতি মানুষের জন্য ১৪০টির বেশি ডিমের সরবরাহ থাকে। তবে সরকার ও খাত সংশ্লিষ্টদের লক্ষ্য আরও দূরে। ২০৩০ সালের মধ্যে মাথাপিছু ডিমের উৎপাদন বছরে ২০০টিতে নিয়ে যেতে চান তারা। দেশের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি রপ্তানিতেও রয়েছে বিশেষ মনোযোগ।
টিআই