হলিউডের স্বর্ণযুগের অন্যতম জনপ্রিয় অভিনেত্রী ও অস্কারজয়ী ইভা মেরি সেন্ট মারা গেছেন।
গত মঙ্গলবার ৬ই অক্টোবর লস অ্যাঞ্জেলেসের নিজ বাড়িতে পরিবারের সদস্য ও স্বজনদের উপস্থিতিতে স্বাভাবিক কারণে ১০২ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়। পরিবারের মুখপাত্র জেফ স্যান্ডারসন মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
‘অন দ্য ওয়াটারফ্রন্ট’ ও ‘নর্থ বাই নর্থওয়েস্ট’-এর মতো হলিউডের কালজয়ী সিনেমায় অভিনয় করে খ্যাতি পাওয়া ইভা মেরি সেন্ট ছিলেন জীবিত অস্কারজয়ীদের মধ্যে সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ। তাঁর মৃত্যুতে হলিউডের স্বর্ণযুগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের অবসান হলো।
১৯২৪ সালে নিউ জার্সির নিউয়ার্কে জন্ম ইভা মেরি সেন্টের। শৈশবে তাঁর ইচ্ছা ছিল শিক্ষক হওয়ার। পরে থিয়েটারের প্রতি আগ্রহ তৈরি হলে অভিনয়কে পেশা হিসেবে বেছে নেন। নিউইয়র্কে হার্বার্ট বার্গহফ স্টুডিও এবং পরে অ্যাক্টরস স্টুডিওতে অভিনয়ের প্রশিক্ষণ নেন। অ্যাক্টরস স্টুডিও ছিল পদ্ধতিগত অভিনয়চর্চার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র, যার অন্যতম সহপ্রতিষ্ঠাতা ছিলেন পরিচালক এলিয়া কাজান।
১৯৫৪ সালে এলিয়া কাজানের ‘অন দ্য ওয়াটারফ্রন্ট’ সিনেমার মাধ্যমে বড় পর্দায় অভিষেক হয় তাঁর। প্রথম সিনেমাতেই এডি ডয়েল চরিত্রে অভিনয় করে বাজিমাত করেন তিনি। মার্লন ব্র্যান্ডোর বিপরীতে অভিনয় করা চরিত্রটি ছিল দৃঢ়চেতা ও নীতিবোধসম্পন্ন এক তরুণীর, যিনি ছবির গল্পে নৈতিকতার প্রতীক হয়ে ওঠেন।
অভিষেকেই সাফল্য আসে। ‘অন দ্য ওয়াটারফ্রন্ট’-এর জন্য সেরা পার্শ্ব অভিনেত্রীর অস্কার জিতে নেন ইভা মেরি সেন্ট। পুরস্কার গ্রহণের সময় তিনি নয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। মঞ্চে রসিকতা করে বলেছিলেন, ‘হয়তো এখানেই আমার সন্তান জন্ম নেবে!’ বাস্তবে তাঁর সন্তানের জন্ম হয় অস্কার জয়ের মাত্র দুই দিন পর।
মার্লন ব্র্যান্ডোর সঙ্গে অভিনয়ের অভিজ্ঞতা নিয়েও পরে কথা বলেছেন তিনি। ব্র্যান্ডোকে তাঁর কাছে আকর্ষণীয় মনে হলেও একই সঙ্গে কিছুটা ভীতিকরও লেগেছিল। এক সাক্ষাৎকারে ইভা মেরি সেন্ট বলেছিলেন, ব্র্যান্ডোর মনে হয়েছিল যেন তিনি তাঁর ভেতরটা পর্যন্ত দেখে ফেলতে পারতেন।
১৯৫৯ সালে আলফ্রেড হিচককের ‘নর্থ বাই নর্থওয়েস্ট’-এ ক্যারি গ্র্যান্টের বিপরীতে অভিনয় করে নিজের তারকাখ্যাতিকে আরও দৃঢ় করেন ইভা মেরি সেন্ট। ছবিতে ইভা অভিনয় করেন রহস্যময় ও আকর্ষণীয় ইভ কেন্ডাল চরিত্রে। তাঁর চরিত্রটি একই সঙ্গে বুদ্ধিদীপ্ত, আত্মবিশ্বাসী এবং বিপজ্জনক যা পরবর্তী সময়ে জনপ্রিয় হয়ে ওঠা গুপ্তচরকাহিনির নারী চরিত্রগুলোর অন্যতম আদর্শ হয়ে দাঁড়ায়।
হিচককের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা ছিল তাঁর অভিনয়জীবনের অন্যতম স্মরণীয় অধ্যায়। ইভা মেরি সেন্ট জানিয়েছিলেন, হিচকক তাঁকে যেন বাইরে থেকে ভেতরের দিকে তৈরি করেছিলেন চুল, সাজসজ্জা, জুতা, গয়না, ব্যাগ ও দস্তানা পর্যন্ত সবকিছুর ওপর নজর দিয়েছিলেন। তাঁর ভাষায়, সেই বাহ্যিক রূপই তাঁকে একজন গুপ্তচর নারীর অনুভূতি তৈরি করে দিয়েছিল।
‘নর্থ বাই নর্থওয়েস্ট’-এর পরও একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিনেমায় অভিনয় করেন তিনি। ১৯৬০ সালে অটো প্রিমিঞ্জারের ‘এক্সোডাস’-এ পল নিউম্যানের বিপরীতে এবং ‘অল ফল ডাউন’-এ ওয়ারেন বিটির সঙ্গে অভিনয় করেন। তবে পরবর্তী সময়ে পরিবারকে বেশি সময় দিতে চলচ্চিত্রে কাজের পরিমাণ কমিয়ে দেন তিনি। পরিচালক জেফ্রি হেইডেনের সঙ্গে সংসার ও সন্তান পালনে মনোযোগী হন।
দীর্ঘ বিরতির পর ২০০৬ সালে আবার বড় পর্দায় ফেরেন ইভা মেরি সেন্ট। ‘সুপারম্যান রিটার্নস’ সিনেমায় ক্লার্ক কেন্টের দত্তক মা মার্থা কেন্ট চরিত্রে অভিনয় করেন। তখন তাঁর বয়স আশির কোঠায়। এরপর ‘উইন্টার্স টেল’ এবং ২০১৯ সালের ‘ম্যারিয়েট ইন একস্ট্যাসি’তেও অভিনয় করেন।
টেলিভিশনেও ছিল তাঁর উল্লেখযোগ্য সাফল্য। ১৯৯০ সালে ‘পিপল লাইক আস’ টেলিভিশন মিনিসিরিজে অভিনয়ের জন্য এমি পুরস্কার পান। নিউইয়র্কের উচ্চবিত্ত সমাজকে ঘিরে নির্মিত ওই সিরিজে তাঁর অভিনয় ক্যারিয়ারের অন্যতম শেষ বড় সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হয়।
অভিনয়ে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে হলিউড ওয়াক অব ফেমে তাঁর নামে দুটি তারকা রয়েছে একটি চলচ্চিত্রে এবং অন্যটি টেলিভিশনে অবদানের জন্য।
দীর্ঘ অভিনয়জীবন নিয়ে এক সাক্ষাৎকারে ইভা মেরি সেন্ট বলেছিলেন, মানুষ যত বেশি দিন বাঁচে, তত বেশি অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে এবং তত বেশি বুদ্ধিমান হয়ে ওঠে। জীবনের নানা আবেগ ও অভিজ্ঞতা একজন অভিনেতাকে চরিত্রকে আরও গভীরভাবে বুঝতে সাহায্য করে বলেও মনে করতেন তিনি।
১০২ বছরের জীবনে ইভা মেরি সেন্ট শুধু অস্কারজয়ী অভিনেত্রীই ছিলেন না, তিনি ছিলেন হলিউডের এক দীর্ঘস্থায়ী উত্তরাধিকার। ‘অন দ্য ওয়াটারফ্রন্ট’ থেকে ‘নর্থ বাই নর্থওয়েস্ট’ তাঁর অভিনীত চরিত্রগুলো চলচ্চিত্র ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
এফএস