২০২৩ সালের অক্টোবরে ইসরায়েলে যে ভয়াবহ হামলা করেছিল ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকা নিয়ন্ত্রণকারী গোষ্ঠী হামাস এবং তার সহযোগী প্যালেস্টাইনিয়ান ইসলামিক জিহাদের সশস্ত্র যোদ্ধারা, আজ ৭ অক্টোবর সেই হামলার তৃতীয় বছর পূর্ণ হলো।
ইসরায়েলজুড়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে আজ বুধবার স্মরণ করা হচ্ছে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামলার স্মৃতি এবং হামলায় নিহতদের। এই স্মরণ কর্মসূচিগুলোকে ঘিরে নেওয়া হয়েছে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা।
এদিকে আগামী ২৭ অক্টোবর ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেটের নির্বাচন হবে। নির্বাচনের মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে ইসরায়েল হামাসের ৭ অক্টোবরের হামলার তৃতীয় বার্ষিকী পালন করছে। আসন্ন নির্বাচনে দেশটির ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ সেই দিনটিই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে বলেই মনে করছেন রাজনীতি বিশ্লেষকরা। ভোটাররা এমন এক নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন যেখানে ইসরায়েলের ইতিহাসের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী সেই দিনটি একটি প্রধান ইস্যু হয়ে থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজায় আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধবিরতি শুরুর পর এই প্রথম স্মরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হচ্ছে। এর আগেও স্মরণ অনুষ্ঠান হয়েছিল, তবে সে সসময় গাজায় সামরিক অভিযান পরিচালনা করছিল ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ)।
হামাস যোদ্ধাদের হামলায় নিহত বহু মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে দিনব্যাপী বিভিন্ন স্মরণ অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
ইসরায়েলের সরকারি পরিসংখ্যানের ওপর ভিত্তি করে এএফপি-র হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ভোরের দিকে ফিলিস্তিনি যোদ্ধারা সীমান্ত অতিক্রম করে দক্ষিণ ইসরায়েলে গুলিবর্ষণ, রকেট ও গ্রেনেড হামলা চালায়, সেই হামলায় ১ হাজার ২২১ জন মানুষ নিহত হন।
হামলাকারীরা ২৫১ জনকে জিম্মি করে গাজায় নিয়ে যায়, যাদের মধ্যে ৪৪ জন ২০২৫ সালের যুদ্ধবিরতির আগেই আগেই মারা গিয়েছিলেন।
তিন বছর আগে ঠিক যে সময়ে (স্থানীয় সময় ভোর ৬:২৯ মিনিটে) হামাসের হামলা শুরু হয়েছিল, সেই সময়ে গাজা সীমান্তের কাছে কিবুতজ কফার আজায় একটি শ্রদ্ধা নিবেদন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। ওই হামলায় সেখানে ৬৪ জন বাসিন্দা নিহত এবং ১৮ জন অপহৃত হয়েছিলেন।
দক্ষিণ ইসরায়েলের নোভা মিউজিক ফেস্টিভ্যালের স্থানেও আরেকটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে; সেখানে হামলাকারীরা ৩৭০ জনেরও বেশি মানুষকে হত্যা এবং বহু মানুষকে জিম্মি করেছিল।
এছাড়া বুধবার সন্ধ্যায় তেল আবিবের একটি পার্কে হামলায় স্বজন হারানো শোকসন্তপ্ত পরিবারগুলো একটি সমাবেশের আয়োজন করছে।
উচ্চ সতর্কতা
ইসরায়েলের সাধারণ নির্বাচনের তিন সপ্তাহ আগে এবং তেল আবিবগামী একটি যাত্রীবাহী বিমানে হামলাচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার এক সপ্তাহ পর এই অনুষ্ঠানগুলো কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।
ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু মঙ্গলবার জানিয়েছেন যে, হামলার বার্ষিকীতে গাজায় মোতায়েনকৃত সেনাদের ওপর হামলার বিষয়ে হামাসের পরিকল্পনার গোয়েন্দা তথ্যের পরিপ্রেক্ষিতে তিনি সেনাবাহিনীকে উচ্চ সতর্কাবস্থায় রেখেছেন। সোমবার রাষ্ট্রীয় স্মরণসভা অনুষ্ঠিত হয়; এতে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেন যে গাজায় হামাসের কোনো শাসন থাকবে না এবং ৭ অক্টোবরের হামলায় জড়িত বা জিম্মি আটকে রাখা ব্যক্তিদের লক্ষ্য করে অভিযান অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার করেন।
হামাসের নজিরবিহীন হামলার জবাবে ইসরায়েল ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু করে, যার ফলে গাজার অধিকাংশ এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে এবং ৭৪ হাজার ২০০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। নিহতদের শতকরা ৫৬ ভাগই শিশু ও নারী।
এ পরিসংখ্যান গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দেওয়া, যা হামাস-নিয়ন্ত্রিত হলেও জাতিসংঘ তাদের তথ্যকে নির্ভরযোগ্য বলে মনে করে।
হামলা পরবর্তী তিন বছরে ইসরায়েল মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে তার সামরিক কার্যক্রমের পরিধি বাড়িয়েছে—লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর সাথে সংঘাত থেকে শুরু করে ইরান পর্যন্ত বিভিন্ন ফ্রন্টে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল।
এদিকে গত অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা সত্ত্বেও গাজায় মানবিক পরিস্থিতি অত্যন্ত শোচনীয় রয়ে গেছে; সেখানে এখনো লাখ লাখ মানুষ তাঁবু ও অস্থায়ী কাঠামোয় বসবাস করতে বাধ্য হচ্ছে।
যুদ্ধবিধ্বস্ত এই অঞ্চলের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এবং পুনর্গঠনের কাজও কার্যত স্থবির হয়ে আছে।
ইসরায়েল দাবি করছে যে তারা গাজা উপত্যকার ৬০ শতাংশেরও বেশি এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে এবং বিমান হামলা অব্যাহত রেখেছে; একইসঙ্গে তারা হামাসের হুমকি নির্মূল ও ৭ অক্টোবরের হামলায় জড়িতদের লক্ষ্যবস্তু করার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর থেকে ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় সেখানে ১,৪৩০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছে।