ENGLISH EPAPER 📍 ঢাকা 📅 বুধবার, ৭ অক্টোবর ২০২৬, ২২ আশ্বিন ১৪৩৩ তথ্য অধিদফতর নিবন্ধন নম্বর ০৬
শিরোনাম
Advertisement
প্রতিবন্ধকতা জয় করে স্বাবলম্বী হচ্ছেন চরাঞ্চলের প্রতিবন্ধীরা
✎ অবজারভার ডিজিটাল ডেস্ক
⏲ প্রকাশিত: শনিবার, ৩ অক্টোবর, ২০২৬, ২:৪৯ পিএম আপডেট: ০৩.১০.২০২৬ ২:৫২ পিএম
সংগৃহীত ছবি
X
Advertisement

সংগৃহীত ছবি

যমুনা-ব্রহ্মপুত্রের বিস্তীর্ণ চর। নদীভাঙন, দারিদ্র্য আর নানা প্রতিকূলতার সঙ্গে প্রতিদিনের লড়াই এখানকার মানুষের। সেই লড়াইয়ে পিছিয়ে নেই প্রতিবন্ধী মানুষও। একসময় যাদের নিয়ে পরিবারে ছিল দুশ্চিন্তা, সমাজে ছিল নানা সীমাবদ্ধতা সেই মানুষগুলোই এখন স্বাবলম্বী হওয়ার পথে এগিয়ে যাচ্ছেন। কেউ ভেড়া পালন করে আয় করছেন, কেউ দোকান পরিচালনা করছেন, আবার কেউ সঞ্চয় গড়ে তুলছেন। নিজের জীবনে স্বস্তি আনার পাশাপাশি পরিবার ও সমাজের অর্থনীতিতেও রাখছেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।

গাইবান্ধার প্রত্যন্ত চরের ২৫ বছর বয়সী রোহিজুল। শ্রবণ ও বাক প্রতিবন্ধিতা নিয়ে জন্ম নেওয়া এই তরুণকে ঘিরে দীর্ঘদিন উদ্বিগ্ন ছিলেন মা আলেয়া বেগম। ছেলে কীভাবে নিজের জীবন চালাবেন, ভবিষ্যতে পরিবারের ওপর কতটা নির্ভরশীল থাকবেন এসব চিন্তা কুরে কুরে খেত তাকে। তবে গত দুই বছরে সেই দুশ্চিন্তার অনেকটাই কেটে গেছে।

প্রায় দুই বছর আগে রোহিজুলের পরিবারকে দুটি স্ত্রী ভেড়া দেয় বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ফ্রেন্ডশিপ। সেখান থেকেই শুরু। ভেড়া দুটির বংশবৃদ্ধি হয়েছে। এরই মধ্যে দুই দফায় চারটি ভেড়া বিক্রি করেছেন তারা। বর্তমানে তাদের খামারে রয়েছে নয়টি ভেড়া।

রোহিজুলের মা আলেয়া বেগম বলেন, ‘আমার বেটা প্রতিবন্ধী ছিল। ফ্রেন্ডশিপ আমাদের খোঁজ নিয়ে দুইটা ভেড়া দেয়। দুইটাই স্ত্রী ভেড়া। এগুলো থেকে দুইবার দুইটা করে মোট চারটা ভেড়া বিক্রি করেছি। এখন মোট ভেড়া আছে নয়টা। দুই বছরেই এমন অবস্থা হয়েছে।’

শুধু ভেড়া পালন নয়, এর সঙ্গে সঙ্গে বদলে গেছে তাদের জীবনযাপনও। ভেড়ার পরিচর্যা, খাবার ও রোগ প্রতিরোধের বিষয়গুলো শিখেছেন আলেয়া বেগম। প্রতিদিন সকালে ভেড়াগুলোকে চরে নিয়ে যান। কয়েক ঘণ্টা চরাঞ্চলের ঘাস খাওয়ার পর দুপুরে বাড়িতে ফিরিয়ে আনেন। বিকেলেও আবার চরাঞ্চলে নিয়ে যাওয়া হয়। পাশাপাশি খুদ ও ভূষিও দেওয়া হয়।

আলেয়া বেগম বলেন, ‘খাওয়া-দাওয়া ঠিক না থাকলে ভেড়াগুলো বিরক্ত করে। ভেড়ার একটা খারাপ রোগ হলো পাতলা পায়খানা, আর নাক দিয়ে শীত পড়ে। টিকা দিলে এগুলোর কিছুই হয় না। ভেড়া সুস্থ থাকে, বাচ্চাও নষ্ট হয় না।’

রোহিজুলের মতো চরের প্রতিবন্ধী মানুষদের স্বাবলম্বী করার পাশাপাশি তাদের অধিকার ও সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করতে কাজ করছে ফ্রেন্ডশিপ। শুধু আর্থিক সহায়তা নয়, পরিবার ও সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনেও নেওয়া হচ্ছে নানা উদ্যোগ।

এরই অংশ হিসেবে বিভিন্ন এলাকায় গড়ে তোলা হয়েছে ‘সেলফ-হেলপ গ্রুপ’। স্থানীয় বাসিন্দাদের নিয়ে গঠিত এসব দলের নিয়মিত বৈঠকে প্রতিবন্ধিতা, বাল্যবিবাহ, শিশু নির্যাতন, অধিকার, সঞ্চয় ও সামাজিক সচেতনতার মতো বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।

৪৫ বছর বয়সী সুফিয়া বেগম বলেন, ‘আমরা প্রতি মাসে মিটিং করি। সঞ্চয়ের উদ্দেশ্যে টাকা জমা করি। প্রতিবন্ধিতা, বাল্যবিবাহসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।’

৪০ বছর বয়সী নূর নাহার ও ৩৫ বছর বয়সী শম্পা রাণী সূত্রধর জানান, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে তাদের এলাকায় এ উদ্যোগ শুরু হয়েছে। প্রতি মাসের বৈঠকে সামাজিক বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে আলোচনা করা হয়। পাশাপাশি নিয়মিত সঞ্চয় করা হচ্ছে। বিশেষ করে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা কীভাবে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারেন, সে বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়।

চরের আরেক বাসিন্দা স্বস্তি রাণী। প্রতিবন্ধিতা তার জীবনকে থামিয়ে দিতে পারেনি। বরং পরিবারের পুরোনো ছোট দোকানটিকেই আয়ের উৎস হিসেবে গড়ে তুলেছেন তিনি। দীর্ঘদিন ধরে দোকান থাকলেও অর্থের অভাবে ব্যবসার পরিসর বাড়াতে পারেননি। ফ্রেন্ডশিপের সহযোগিতা পাওয়ার পর বদলাতে শুরু করেছে সেই চিত্র।

স্বস্তি রাণীর মা বলেন, ‘আমাদের এই দোকান অনেক পুরোনো। আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে ব্যবসা বাড়াতে পারিনি। আমার পরিবারের দুজন প্রতিবন্ধী—স্বামী ও মেয়ে। ফ্রেন্ডশিপের মাধ্যমে দোকান উন্নত করেছি। দোকানের পরিসর বাড়িয়েছি। পাঁচ-ছয় মাসে আমার ব্যবসা বেড়েছে।’

ফ্রেন্ডশিপ সেবা প্রজেক্টের টেকনিক্যাল সুপারভাইজার শিমু আক্তার বলেন, ‘প্রথমে যখন কাজ শুরু করি, তখন আমাদের হাতে কোনো তথ্য ছিল না। বাড়ি বাড়ি গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করেছি। বিভিন্ন ক্যাটাগরির প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের তথ্য নিয়ে একটি তালিকা তৈরি করেছি। তাদের দেখভালের জন্য কেয়ারগিভার কারা আছেন, কারা স্কুলে পড়ে, কারা পড়ে না, কারা চলতে পারে আর কারা পারে না এসব তথ্যও নিয়েছি।’

তার ভাষ্য অনুযায়ী, জরিপের মাধ্যমে প্রতিবন্ধিতার ১২ ধরনের শ্রেণি নিয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। সেলফ-হেলপ গ্রুপের বৈঠকে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের মৌলিক চাহিদা, অধিকার, বাল্যবিবাহসহ বিভিন্ন সামাজিক বিষয়ে আলোচনা করা হয়। উঠান বৈঠকে সংস্থার সেফগার্ড নীতিও তুলে ধরা হয়। পাশাপাশি সদস্যদের মধ্যে জনপ্রতি মাসে ১০০ টাকা করে সঞ্চয়ের ব্যবস্থা রয়েছে।

ফ্রেন্ডশিপের সংশ্লিষ্ট প্রজেক্ট ম্যানেজার আহকাম সাইফুল্লাহ বলেন, ‘সেলফ-হেলপ গ্রুপের মাধ্যমে গ্রামের মানুষের মধ্যে প্রতিবন্ধিতা বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো হচ্ছে। এটি গ্রামের স্থানীয় বাসিন্দাদের একটি দল। আমরা তাদের সহযোগিতা করছি। পাশাপাশি গ্রুপের সদস্যরা যেন অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে পারেন, সে উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘কমিউনিটিভিত্তিক অধিকার সম্পর্কে তাদের সচেতন করা হচ্ছে। এই গ্রুপের মাধ্যমে সবাইকে বোঝানো হচ্ছে, প্রতিবন্ধিতা কোনো বোঝা নয়। তারা নিজেরাও সঞ্চয় করছেন এবং সেই সঞ্চয়ের মাধ্যমে একজন আরেকজনকে সহযোগিতা করছেন। জীবনমান উন্নয়নে প্রশিক্ষণও দেওয়া হচ্ছে। মূলত এই দলটির মাধ্যমে কমিউনিটি পর্যায়ে স্থানীয় মানুষকে দক্ষ নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে কাজ করছি।’

ফ্রেন্ডশিপের ইনক্লুসিভ সিটিজেনশিপ বিভাগের প্রধান ব্যারিস্টার আয়শা তাসিন খান বলেন, ‘গাইবান্ধার চরে শ্রবণ ও বাক প্রতিবন্ধী ছেলেটি আমাদের কার্যক্রমের আওতায় আসার পর তাকে যথাযথ সহায়তা দেওয়া হয়। ভেড়া পালন করে সে এখন পরিবারের জন্য সম্পদে পরিণত হয়েছে। কারণ সে যা উপার্জন করছে, তা পরিবারের অর্থনীতিতে যোগ হচ্ছে।’

একসময় যে মানুষটিকে পরিবার ভাবত ভবিষ্যতের বোঝা, সেই রোহিজুলই এখন পরিবারের সম্পদ। তার হাতে থাকা ভেড়াগুলো যেন শুধু পশু নয় তার আত্মনির্ভরতার প্রতীক।

এসএ
Advertisement
Loading...
Loading...
আরো দেখুন
সম্পাদক: ইকবাল সোবহান চৌধুরী
অবজারভার লিমিটেডের পক্ষে সম্পাদক কর্তৃক গ্লোব প্রিন্টার্স, ২৪/এ, নিউ ইস্কাটন রোড, রমনা, ঢাকা থেকে প্রকাশিত।
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:আজিজ ভবন (৩য় তলা), ৯৩, মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা (সি/এ), ঢাকা-১০০০।

ফোন: পিএবিএক্স- ৪১০৫৩০০১-০৬; বিজ্ঞাপন: ৪১০৫৩০১২; ০১৭৯৩৩১৭৮২৯, ০১৫৫০৭০৭২৯১, ই-মেইল: [email protected], ‍[email protected] অনলাইন: ৪১০৫৩০১৪; ০১৫৫০৭০৭২৯৭ ই-মেইল: [email protected] ০১৫৫০৭০৭২৯৬
🔝
Advertisement