ঢাকা ম্যাস র্যাপিড ট্রানজিট উন্নয়ন প্রকল্পের লাইন-১ ও লাইন-৫ নির্মাণে প্রায় ৪৬ হাজার কোটি টাকার বিভিন্ন অবকাঠামোগত কাজের ক্রয়প্রস্তাব অনুমোদন ও সুপারিশ করেছে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি।
ভূগর্ভস্থ ও উড়ালপথ, স্টেশন, ডিপো, ট্র্যাক, বিদ্যুৎ, সংকেত ও টেলিযোগাযোগব্যবস্থাসহ বিভিন্ন কাজ রয়েছে এসব প্যাকেজে।
বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত কমিটির বৈঠকে লাইন-১ এর চারটি এবং লাইন-৫ এর একটি প্যাকেজের পূর্তকাজের ক্রয়প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়। একই সঙ্গে লাইন-১ এর আরও দুটি এবং লাইন-৫ উত্তর রুটের একটি প্যাকেজের ক্রয়প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য সুপারিশ করা হয়েছে।
বাড্ডা থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত ভূগর্ভস্থ পথ
প্রস্তাবিত কাজগুলোর মধ্যে বড় একটি অংশ হলো লাইন-১ এর সিপি-০৬ প্যাকেজ। এর আওতায় বাড্ডা স্টেশনের উত্তর প্রান্ত থেকে বিমানবন্দর স্টেশন পর্যন্ত ৫ দশমিক ১৮২ কিলোমিটার ভূগর্ভস্থ পথ নির্মাণ করা হবে।
এ অংশে ৪ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ দুটি সুড়ঙ্গ এবং তিনটি ভূগর্ভস্থ স্টেশন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। স্টেশনগুলো হবে বিমানবন্দর, বিমানবন্দর টার্মিনাল-৩ ও খিলক্ষেত। টানেল বোরিং মেশিন (টিবিএম) চালুর জন্য একটি শ্যাফটও নির্মাণ করা হবে।
ভ্যাট ও করসহ এ কাজের ব্যয় ধরা হয়েছে ১১ হাজার ৫৯০ কোটি ৫৮ লাখ টাকা। প্রাক্-যোগ্যতা পাওয়া সাতটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দুটি দরপ্রস্তাব দেয় এবং উভয়টিই কারিগরিভাবে গ্রহণযোগ্য হয়। পরে জাপানের নিশিমাতসু, টিপিএল ও টোডার যৌথ উদ্যোগকে সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে সুপারিশ করা হয়। তবে ভ্যাট ও কর বাদে তাদের দর সরকারি প্রাক্কলিত দরের চেয়ে ৩২ দশমিক ০৫ শতাংশ বেশি।
ট্র্যাক ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় বড় ব্যয়
লাইন-১ এর সিপি-০৯ প্যাকেজে ট্র্যাক নির্মাণের পাশাপাশি বিদ্যুৎ সরবরাহের বিভিন্ন অবকাঠামো স্থাপন করা হবে। এর মধ্যে রেল, টার্নআউট, পয়েন্ট ও ক্রসিংয়ের পাশাপাশি ১৩২ কেভি প্রাথমিক ফিডার, রিসিভিং উপকেন্দ্র, সহায়ক উপকেন্দ্র, ৩৩/০.৪১৫ কেভি বিদ্যুৎ বিতরণ নেটওয়ার্ক এবং ১ হাজার ৫০০ ভোল্টের ওভারহেড বিদ্যুৎব্যবস্থা থাকবে।
এ প্যাকেজে ব্যয় হবে ১১ হাজার ৬৫ কোটি ৫৮ লাখ টাকা। প্রাক্-যোগ্যতা পাওয়া দুটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে একটি দরপ্রস্তাব দেয়। ভারতের এলঅ্যান্ডটি ও সুমিতোমোর যৌথ উদ্যোগকে সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে সুপারিশ করা হয়েছে। তাদের দর সরকারি প্রাক্কলনের চেয়ে ৪৯ দশমিক ৯২ শতাংশ বেশি।
সিপি-১০ প্যাকেজে থাকবে মেট্রোরেলের সংকেত ও টেলিযোগাযোগব্যবস্থা, প্ল্যাটফর্মের পর্দা-দরজা এবং সম্পদ ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা। এতে যোগাযোগভিত্তিক স্বয়ংক্রিয় ট্রেন নিয়ন্ত্রণ, অপটিক্যাল ফাইবার নেটওয়ার্ক এবং এলটিইভিত্তিক বেতার যোগাযোগব্যবস্থা স্থাপন করা হবে।
এ কাজের ব্যয় ধরা হয়েছে ৬ হাজার ৪৪৬ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। ভারতের লারসেন অ্যান্ড টুব্রোকে সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে সুপারিশ করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির দর সরকারি প্রাক্কলনের চেয়ে ৫০ দশমিক ৮৯ শতাংশ বেশি।
ডিপো ও উড়ালপথেও হাজার কোটি টাকার কাজ
লাইন-১ এর সিপি-০২ প্যাকেজে ডিপোর ওয়ার্কশপ, স্টাবিলিং শেড, অপারেশন ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র, কারিগরি ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র, বিভিন্ন উপকেন্দ্র ও ট্র্যাক নির্মাণ করা হবে। ভ্যাট ও করসহ এ কাজের ব্যয় ৪ হাজার ২৮৫ কোটি টাকা। সিনোহাইড্রো ও এসইবিসিএলের যৌথ উদ্যোগকে কাজটি দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।
অন্যদিকে, লাইন-৫ এর সিপি-০৩ প্যাকেজে মোট ৬ দশমিক ৫০ কিলোমিটার উড়ালপথ নির্মাণ করা হবে। এর মধ্যে হেমায়েতপুর থেকে আমিনবাজার পর্যন্ত ৫ দশমিক ৬ কিলোমিটার এবং নতুনবাজারের পর থেকে ভাটারা পর্যন্ত শূন্য দশমিক ৯ কিলোমিটার পথ রয়েছে।
এ অংশে হেমায়েতপুর, বলিয়ারপুর, বিলামালিয়া, আমিনবাজার ও ভাটারায় পাঁচটি উড়ালস্টেশন নির্মাণ করা হবে। কাজটির ব্যয় ২ হাজার ৬৭১ কোটি টাকা। চীনের সিআরইসি, এমআইএল ও এমবিইএলের যৌথ উদ্যোগকে সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে সুপারিশ করা হয়েছে। তাদের দর সরকারি প্রাক্কলনের চেয়ে শূন্য দশমিক ৬৯ শতাংশ বেশি।
আরও তিন প্যাকেজের প্রস্তাব
লাইন-১ এর সিপি-০৪ প্যাকেজে রামপুরা স্টেশনের উত্তর প্রান্ত থেকে নতুনবাজার স্টেশন পর্যন্ত প্রধান লাইন ও স্টেশন নির্মাণ করা হবে। এর মূল চুক্তিমূল্য ১৮ হাজার ৩৭ কোটি ২৬ লাখ টাকা। জাপানের টোকিউ-মিল যৌথ উদ্যোগকে দরদাতা হিসেবে সুপারিশ করা হয়েছে।
সিপি-০৭ প্যাকেজে ট্রানজিশন থেকে বালু নদের শুরু পর্যন্ত ৫ দশমিক ৭ কিলোমিটার প্রধান লাইন ও স্টেশন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মূল চুক্তিমূল্য ২ হাজার ৫৩৪ কোটি টাকা। কাজটি পেতে পারে সিআরইসি-মিল-এমবিইসি যৌথ উদ্যোগ।
লাইন-৫ উত্তর রুটের সিপি-০২ প্যাকেজে ডিপোর পূর্ত ও ভবন নির্মাণ করা হবে। এর মূল চুক্তিমূল্য ১ হাজার ৮৪৮ কোটি টাকা। কনকর্ড প্রগতি কনসোর্টিয়াম ও হ্যানিল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশনের যৌথ উদ্যোগকে দরদাতা হিসেবে সুপারিশ করা হয়েছে।
২০৩৩ সালের মধ্যে বাস্তবায়নের লক্ষ্য
মেট্রোরেল লাইন-১ ও লাইন-৫ দুই প্রকল্পের প্রথম সংশোধিত প্রকল্প গত ১৬ সেপ্টেম্বর একনেকে অনুমোদিত হয়েছে। উভয় প্রকল্পের মেয়াদ ২০১৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর থেকে ২০৩৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে।
লাইন-৫ গাবতলী থেকে শুরু হয়ে রাজধানীর টেকনিক্যাল মোড়, কল্যাণপুর, শ্যামলী, কলেজ গেট, আসাদ গেট, শুক্রাবাদ, কারওয়ান বাজার, হাতিরঝিল, তেজগাঁও, আফতাবনগর, আফতাবনগর সেন্টার, আফতাবনগর পূর্ব ও নাসিরাবাদ হয়ে দাসেরকান্দি পর্যন্ত যাওয়ার কথা।
অন্যদিকে লাইন-১ দুটি রুটে নির্মিত হচ্ছে বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর এবং নতুনবাজার থেকে পূর্বাচল।
ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল) প্রকল্প দুটি বাস্তবায়ন করছে। বাংলাদেশ সরকার ও জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা) যৌথভাবে এসব প্রকল্পে অর্থায়ন করছে।
এসএস