দেশের সবচাইতে বড় ইলিশের বাজার চাঁদপুর বড় স্টেশন মাছঘাটে বেড়েছে ইলিশের সরবরাহ ফলে হাঁক ডাক বেড়েছে ক্রেতা ও বিক্রেতাদের মাঝে । গত সপ্তাহের তুলনায় আমদানি বাড়ায় কর্মব্যস্ততা বেড়েছে মৎস্য ব্যবসায়ী ও শ্রমিকদের মাঝে। বর্তমানে মাছঘাটে প্রতিদিন গড়ে ৩০০ মণের বেশি ইলিশ আসছে। তবে সরবরাহ বাড়লেও দাম এখনো সাধারণ ক্রেতাদের নাগালের বাইরে বলে জানিয়েছেন তারা।
খোঁজ নিয়ে দেখাযায় ইলিশের সরবরাহ বাড়ার পরেও দামে প্রভাব পড়েনি, ফলশ্রুতিতে হতাশ ক্রেতা সাধারণ।
বুধবার (৩০সেপ্টেম্বর) সকাল ১১টায় শহরের বড় স্টেশন মাছঘাটে সরজমিন এমন চিত্র দেখা গেছে। চোখ ঘুরালেই দেখাযায় প্রতিটি আড়তের সামনে ইলিশের স্তূপ। আগের তুলনায় ইলিশের সরবরাহ বাড়ায় চাঁদপুর বড়স্টেশন মাছঘাটে বিক্রেতাদের হাঁকডাকে মুখরিত। কোথাও ইলিশ বাছাই করা হচ্ছে, আবার কোথাও বরফ দিয়ে প্যাকেটজাত করা হচ্ছে। দক্ষিণাঞ্চল, সাগরের মোহনা এবং চাঁদপুরের পদ্মা-মেঘনা থেকে ইলিশ মাছঘাটে আসলেও দাম চড়া।
বাজার ঘুরে দেখা যায়, ৮০০ থেকে ৯০০ গ্রাম ওজনের একটি ইলিশ কিনতে ক্রেতাকে গুনতে হচ্ছে প্রায় ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩৫০ টাকা। অন্যদিকে এক কেজি বা তার বেশি ওজনের একটি ইলিশের দাম পড়ছে ২ হাজার ৫০০ টাকা।
ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ইলিশের বর্তমান দাম তাদের পারিবারিক বাজেটে বাড়তি চাপ তৈরি করছে। অনেকেই দাম শুনে মাছ না কিনেই বাজার থেকে ফিরে যাচ্ছেন। কেউ কেউ দাম কমার অপেক্ষায় রয়েছেন।
লাকসাম থেকে মাছঘাটে ইলিশ কিনতে আসা মিজানুর রহমান বলেন, ইলিশের দাম অনেক বেশি। ৮০০-৯০০ গ্রামের মাছও দেড় হাজার টাকা কেজি। একটি মাছ কিনতেই প্রায় ১ হাজার ৩০০ টাকা চলে যাচ্ছে। এই দামে নিয়মিত ইলিশ কেনা সম্ভব না।
ঢাকা থেকে আসা সফিকুর বলেন, জীবিকার প্রয়োজনে রাজধানীতে বসবাস করলেও নিজের বাড়ি চাঁদপুর জেলায় হওয়ার পরেও আমরা ইলিশ কিনতে হচ্ছে অধিক দামে তাই এক কেজির ইলিশ ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। সংসারের অন্য খরচ আছে। তাই ইচ্ছা থাকলেও ইলিশ কিনতে পারছি না।
ফরিদগঞ্জ থেকে আসা আরেকজন ক্রেতা প্রহর সরকার বলেন, ইলিশ বাঙালির পছন্দের মাছ। কিন্তু দাম যদি সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে না থাকে, তাহলে মানুষ কীভাবে কিনবে? দাম কিছুটা কমলে হয়তো কিনতে পারতাম।
বিক্রেতাদের ভাষ্য, ইলিশের দাম বেড়ে যাওয়ায় বিক্রিতে প্রভাব পড়েছে। বাজারে ক্রেতারা মাছের দাম জানতে চাইলেও অনেকে দাম শুনে আর কিনছেন না। বড় মাছের পরিবর্তে তুলনামূলক ছোট ইলিশের দিকে ঝুঁকছেন কেউ কেউ।
বড় স্টেশন মাছঘাটের বিক্রেতা জলিল লস্কর বলেন, দাম বেশি হওয়ায় বিক্রি আগের মতো নেই। ক্রেতারা এসে দাম জিজ্ঞেস করছেন, এরপর অনেকে আর কিনছেন না। ৮০০-৯০০ গ্রামের মাছও দেড় হাজার টাকা কেজি হওয়ায় সাধারণ ক্রেতার জন্য চাপ হয়ে যাচ্ছে।
বিক্রেতা উত্তম দাস বলেন, এক কেজির ওপরের ইলিশ ২ হাজার ২০০ টাকা কেজি। বড় মাছের দাম শুনে অনেকে ছোট মাছ খুঁজছেন।
এদিকে বাজারে দেশি ইলিশের পাশাপাশি ভারত থেকে আমদানি করা ইলিশও বিক্রি হচ্ছে। তবে কয়েকজন ক্রেতা জানিয়েছেন, ভারতীয় ইলিশের স্বাদ ও মান দেশি ইলিশের মতো মনে না হওয়ায় তারা তা কিনতে আগ্রহী নন। দেশি ইলিশ পছন্দ হলেও বেশি দামের কারণে সেটিও কেনা সম্ভব হচ্ছে না তাদের।
এদিকে ক্রেতা মো.বিল্লাল হোসেন বলেন, দেশি ইলিশের স্বাদ ভালো। ভারত থেকে আসা ইলিশ খেয়ে তেমন ভালো লাগেনি। তাই দেশি ইলিশই নিতে চাই। কিন্তু দেশি ইলিশের দাম এত বেশি যে চাইলেও কেনা যাচ্ছে না।
ইলিশের আড়তদার মিজানুর রহমান কালু ভুইয়া বলেন, গত দুই দিন হাতিয়ার মাছ কিছুটা এসেছে। তবে চাঁদপুরের স্থানীয় ইলিশ খুবই কম। এ কারণে দাম বেশি।
ক্রেতাদের মতে, ৮০০ থেকে ৯০০ গ্রাম ওজনের ইলিশের দামই যদি কেজিতে ১ হাজার ৫০০ টাকা হয় এবং এক কেজি বা তার বেশি ওজনের মাছ কিনতে কেজিপ্রতি ২ হাজার ২০০ টাকা গুনতে হয়, তাহলে নিম্ন ও মধ্য আয়ের পরিবারের জন্য নিয়মিত ইলিশ কেনা কঠিন।
চাঁদপুর মৎস্য বণিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক হাজী শবেবরাত সরকার বলেন, চাঁদপুর মাছঘাটে এখনো পর্যাপ্ত ইলিশ নেই। তবে আগের তুলনায় আমদানি কিছুটা বেড়েছে। ফলে গত সপ্তাহের তুলনায় দামও কিছুটা কমেছে। এখন প্রতিদিন গড়ে কেজিতে ৫০ থেকে ১০০ টাকা করে দাম কমছে।
চাঁদপুর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ ফকরুল ইসলাম জানান, ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে জাটকা সংরক্ষণ, নিষিদ্ধ সময়ে মাছ ধরা ও অবৈধ জাল দিয়ে মাছ ধরা বন্ধ করা প্রয়োজন। তিনি সরকার ঘোষিত আগামী ৮ অক্টোবর থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত শুরু হওয়া মা ইলিশ রক্ষা অভিযান সফল করতে প্রশাসন, জেলে, মৎস্য বিভাগ তথা সকল জনগনের প্রতি আহবান জানান। নদীতে ইলিশের বিচরণ ও সরবরাহ বাড়লে বাজারে দামও স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলেও তিনি জানান।
শ্যামল সরকার/এসএ