দূর থেকে দেখলে ভুল হওয়ারই কথা। সবুজ পাতার ফাঁকে ফাঁকে ঝুলছে গোলাকার ফল। কোনোটি সবুজ, কোনোটি আবার হলুদ। তরমুজের সঙ্গে বেশ মিল। কিন্তু কাছে গিয়ে দেখা গেল, তরমুজ নয়-এগুলো সাম্মাম, পরিচিত আরেক নামে রক মেলন।
কাপাসিয়ার উত্তর খামারের একটি বাগানে এখন এমন দৃশ্যই পথচারী ও কৃষকদের কৌতূহল বাড়াচ্ছে। নতুন এই ফল দেখতে আসা মানুষগুলোর চোখে শুধু বিস্ময় নয়, আছে হিসাবও। জমিতে এমন ফল করলে কত টাকা লাগবে, ফলন পেতে কতদিন সময়, আর বাজারে বিক্রি করে কতটা আয় করা সম্ভব-এসব প্রশ্ন ঘুরছে তাদের মুখে।
আর এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই যেন নিজের বাগানটিকে কৃষকদের জন্য উন্মুক্ত করে দিয়েছেন উদ্যোক্তা মো. কামরুজ্জামান খান।
কামরুজ্জামানের বাড়ি উপজেলার সূর্যনারায়ণপুর গ্রামে। এবার তিনি প্রচলিত ফসলের বাইরে গিয়ে রক মেলন চাষের উদ্যোগ নিয়েছেন। তরগাঁও ইউনিয়নের উত্তর খামার এলাকায় বর্গা নেওয়া প্রায় সাড়ে ৮ বিঘা জমিতে চলছে তার এই চাষ।
বাড়ি থেকে বাগানের দূরত্ব প্রায় ১৫ কিলোমিটার। প্রতিদিন এতটা পথ পাড়ি দিয়ে জমির খোঁজ রাখা সহজ নয়। তার ওপর প্রতি বিঘা জমির জন্য বছরে ১৫ হাজার টাকা বর্গা দিতে হচ্ছে।
তারপরও নতুন ফলের বাজার সম্ভাবনা যাচাই করতে এই উদ্যোগ নিয়েছেন তিনি।
বাগানে ব্যবহার করা হয়েছে মালচিং ফিল্ম। মাটির ওপর বিছানো সেই ফিল্মের ফাঁক দিয়ে বেড়ে উঠেছে রক মেলনের গাছ। কোথাও গাছের পরিচর্যা চলছে, কোথাও লতাগুলো মাচায় তুলে দেওয়া হচ্ছে। শ্রমিকদের ব্যস্ততায় বোঝা যায়, নতুন ফল হলেও এর পরিচর্যায় কোনো ছাড় নেই।
কামরুজ্জামানের জন্য সবচেয়ে বড় স্বস্তির জায়গা বাজার। এরই মধ্যে প্রায় ৫০ হাজার টাকার ফল বিক্রি করেছেন তিনি। পুরো বাগানের ফল বিক্রি শেষ হলে তার প্রত্যাশা ৬ থেকে ৭ লাখ টাকা বিক্রি করার।
চলতি মাসে পাইকারদের কাছে প্রতি কেজি রক মেলন ৮০ থেকে ১০০ টাকা দরে বিক্রি করেছেন বলে জানান তিনি।
তবে উদ্যোক্তা নিজেই জানেন, বিক্রির পুরো অর্থ লাভ নয়। জমির বর্গা, বীজ, সার, সেচ, শ্রমিকের মজুরি, মালচিং ফিল্ম, মাচা তৈরি ও পরিচর্যাসহ সব খরচ বাদ দিয়েই প্রকৃত লাভের হিসাব করতে হবে।
এ পর্যন্ত বাগানে প্রায় এক লাখ টাকা খরচ হয়েছে। সামনে আরও ব্যয়ের হিসাব যোগ হবে।
আর বাজারে সরবরাহ বাড়লে দাম কমে যেতে পারে-এই ঝুঁকিও রয়েছে। ফলে এখনকার ভালো দাম ভবিষ্যতেও থাকবে, এমন নিশ্চয়তা দিচ্ছেন না কামরুজ্জামান।
বাগানে কাজ করেন শ্রমিক রতন মিয়া। মাসে ১৫ হাজার টাকা বেতনে তিনি গাছের পানি দেওয়া, আগাছা পরিষ্কার, ফলের পরিচর্যা এবং মাচায় লতা তুলে দেওয়ার কাজ করেন। প্রয়োজন অনুযায়ী অতিরিক্ত শ্রমিকও নেওয়া হয়।
রতনের মতো শ্রমিকের হাতের পরিচর্যাতেই ধীরে ধীরে বড় হচ্ছে বাগানের ফল। আর সেই ফল দেখতে এসে অন্য কৃষকেরা নিজেদের জমির সঙ্গে মিলিয়ে দেখছেন এই চাষের সম্ভাবনা।
কেউ চারা সংগ্রহের জায়গা জানতে চান। কেউ এক বিঘায় বিনিয়োগের হিসাব জানতে চান। কেউ আবার জানতে চান-ফল পেতে কতদিন লাগে?
এই প্রশ্নগুলোই এখন কামরুজ্জামানের বাগানের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দৃশ্য।
কারণ একটি নতুন ফলের চাষ তখনই অন্যদের আগ্রহী করে তোলে, যখন তারা সেখানে নিজের জমির জন্যও সম্ভাবনা দেখতে পান।
কাপাসিয়া উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্য বলছে, সাম্মাম উৎপাদনে সাধারণত ৭৫ থেকে ৯০ দিন সময় লাগে। সঠিক ব্যবস্থাপনায় প্রতি বিঘা জমি থেকে প্রায় ২ থেকে ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত বিক্রির সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এই অঙ্ককে নিশ্চিত আয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; ফলন, উৎপাদন ব্যয় ও বাজারদরের ওপর প্রকৃত আয় নির্ভর করবে।
কাপাসিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কার্যালয়ের অতিরিক্ত কৃষি কর্মকর্তা সৈয়দ শাকিল আহম্মেদ বলেন, রক মেলনে বেটা-ক্যারোটিন ও ভিটামিন সি রয়েছে। পাশাপাশি পটাশিয়াম, ফলিক অ্যাসিড, ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেশিয়ামও পাওয়া যায়। ফলে পুষ্টিগুণের কারণে বাজারে এর চাহিদা তৈরির সুযোগ রয়েছে।
তিনি জানান, কাপাসিয়ার তরগাঁও, টোক, বারিষাব ও সনমানিয়া এলাকার পুরনো ব্রহ্মপুত্র ও শীতলক্ষ্যা নদীর অববাহিকার দোআঁশ মাটি রক মেলন চাষের জন্য উপযোগী। তবে ভালো ফলনের জন্য সেচ, পরিচর্যা, রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ এবং সঠিক সময়ে ফল সংগ্রহে গুরুত্ব দিতে হবে।
কামরুজ্জামানের বাগান থেকে এখনই কাপাসিয়ার কৃষিতে বড় কোনো পরিবর্তনের ঘোষণা দেওয়ার সুযোগ নেই। একটি মৌসুমের ফলন দিয়ে কোনো নতুন ফসলের দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনাও নিশ্চিত করা যায় না।
প্রয়োজন হবে একাধিক মৌসুমের হিসাব—কত টাকা বিনিয়োগ হলো, কত ফলন পাওয়া গেল, কত দামে বিক্রি হলো এবং সব খরচ বাদ দিয়ে কৃষকের হাতে শেষ পর্যন্ত কত টাকা থাকল।
তবে এরই মধ্যে একটি পরিবর্তন চোখে পড়ছে।
যে কৃষক এতদিন অন্যের জমিতে ধান, সবজি কিংবা পরিচিত ফলের চাষ দেখে অভ্যস্ত ছিলেন, তিনিই এখন অপরিচিত একটি ফলের বাগানে দাঁড়িয়ে বিনিয়োগের হিসাব করছেন।
সেখানেই হয়তো কামরুজ্জামানের উদ্যোগের সবচেয়ে বড় গল্প।
মরু অঞ্চলের ফল সাম্মাম এখন কাপাসিয়ার মাটিতে। আর ফলের সঙ্গে সঙ্গে বোনা হচ্ছে নতুন এক কৃষিচিন্তার বীজ-প্রচলিত ফসলের বাইরে গিয়ে বাজারের চাহিদা বুঝে চাষের সম্ভাবনা খোঁজার।
এই সম্ভাবনা কতটা দূর যাবে, তার উত্তর অবশ্য দেবে সময় ও বাজার। কিন্তু উত্তর খামারের বাগানে ঝুলে থাকা সবুজ-হলুদ ফলগুলো এরই মধ্যে কৃষকদের সামনে একটি নতুন প্রশ্ন তুলে দিয়েছে-চেনা জমিতে অচেনা ফল চাষ করেও কি বদলানো যায় কৃষকের আয়-ব্যয়ের হিসাব?
রফিক সরকার /এসএ