মোংলা বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে জিটুজি ভিত্তিতে চীনের অর্থায়নে ‘মোংলা বন্দরের সুবিধাদির সম্প্রসারণ ও উন্নয়ন’ শীর্ষক একটি প্রকল্প গত বছর (২ ফেব্রুয়ারি ২০২৫) একনেকে অনুমোদিত হয়েছে। প্রকল্পটির অধীনে আধুনিক যন্ত্রপাতিসহ ২টি অত্যাধুনিক কন্টেইনার জেটি নির্মাণ করা হবে।
প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বন্দরের কার্যক্রমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শিপিং এজেন্ট, সিএন্ডএফ এজেন্ট, স্টিভেডরিং প্রতিষ্ঠান ও শ্রমিক শ্রেণির জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। প্রকল্পটি ডিসেম্বর ২০২৮ সালে সমাপ্তির জন্য নির্ধারিত রয়েছে।
মঙ্গলবার সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে এ কথা বলেন মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল আরিফ আহমেদ মোস্তফা। বেলা সাড়ে ১১টায় খুলনাস্থ মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের অডিটোরিয়ামে এ সভার আয়োজন করা হয়।
সভায় মোংলা বন্দরের চেয়ারম্যান বলেন, প্রকল্পটির অধীনে কন্টেইনার জেটি দুটির মোট ৩৬৮ মিটার দৈর্ঘ্যের অবকাঠামো, ৮৭ হাজার ৬০০ বর্গমিটার লোডেড কন্টেইনার ইয়ার্ড, ৩৪ হাজার ১৭০ বর্গমিটার খালি কন্টেইনার ইয়ার্ড এবং ৪ হাজার ২৬০ বর্গমিটার বিপজ্জনক কার্গো হ্যান্ডলিং ইয়ার্ড নির্মাণ করা হবে।
প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বার্ষিক ১ কোটি ৫০ লাখ টন কার্গো এবং ৪ লাখ টিইইউ কন্টেইনার হ্যান্ডলিং করা সম্ভব হবে।
আরিফ আহমেদ মোস্তফা বলেন, মোংলা বন্দরের পশুর চ্যানেলের নাব্যতা সংরক্ষণের লক্ষ্যে প্রকল্পের অধীনে ৫ বছর মেয়াদে পশুর চ্যানেলের বিভিন্ন স্থানে ৩৩০.৯০ লাখ ঘনমিটার সংরক্ষণ ড্রেজিং কাজ সম্পন্ন করা হবে। প্রকল্পটির আওতায় জুন ২০২৬ পর্যন্ত ৫ লাখ ঘনমিটার ড্রেজিং কাজ সম্পন্ন হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে মোংলা বন্দরের জেটি পর্যন্ত ৯.৫০ মিটার ড্রাফটের জাহাজ হ্যান্ডলিং করা সম্ভব হবে। প্রকল্পটি ডিসেম্বর ২০২৯ সালে সমাপ্তির জন্য নির্ধারিত রয়েছে।
অনুমোদন প্রক্রিয়াধীন প্রকল্প সম্পর্কে চেয়ারম্যান বলেন, ১টি ন্যূনতম ৩ হাজার ৫০০ কিউবিক মিটার ধারণক্ষমতার ট্রেইলিং সাকশন হপার ড্রেজার, ২টি ২৮ ইঞ্চি কাটার সাকশন ড্রেজারসহ আনুষঙ্গিক সরঞ্জাম সংগ্রহ করা হবে। এছাড়া পশুর চ্যানেলে নদীশাসনের জন্য সম্ভাব্যতা সমীক্ষা এবং ২টি মুরিং বোট সংগ্রহ করা হবে।
চলমান প্রকল্প প্রসঙ্গে চেয়ারম্যান বলেন, ‘বন্দরের জন্য সহায়ক জলযান সংগ্রহ (১ম সংশোধিত)’ প্রকল্পের আওতায় সমুদ্রগামী জাহাজ সুষ্ঠু ও দক্ষতার সঙ্গে হ্যান্ডলিং করার জন্য মোংলা বন্দরের সহায়ক জলযান সংগ্রহ কার্যক্রম বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। প্রকল্পের অধীনে ২টি টাগবোট, ১টি বয়া লেইং ভেসেল, ১টি সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ ভেসেল, ১টি পাইলট মাদার ভেসেল এবং ১টি সার্ভে অ্যান্ড রিসার্চ ভেসেল সংগ্রহের কার্যক্রম শেষ পর্যায়ে রয়েছে।
প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে নিরাপদ চ্যানেল নির্মাণ, সমুদ্রগামী জাহাজ সুষ্ঠুভাবে হ্যান্ডলিং এবং দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় জরুরি উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা সম্ভব হবে। প্রকল্পটি জুন ২০২৭ সালে সমাপ্তির জন্য নির্ধারিত রয়েছে।
এছাড়া ‘পশুর চ্যানেলের ইনার বারে ড্রেজিং (২য় সংশোধিত)’ প্রকল্পের আওতায় পশুর চ্যানেলের ইনার বার এলাকায় ৭.৫ মিটার সিডি নাব্যতা অর্জনের লক্ষ্যে ২৩৭.০৬ লাখ ঘনমিটার ড্রেজিং কাজ সম্পন্ন করা হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে মোংলা বন্দরের জেটি পর্যন্ত ৯.৫ থেকে ১০ মিটার ড্রাফটের জাহাজ হ্যান্ডলিংয়ের সুবিধা সৃষ্টি হবে। এতে বন্দরের সক্ষমতা বহুগুণ বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে। তবে সম্প্রতি প্রকল্পটি ডিলিস্টিংয়ের কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
মোংলা বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ভারতীয় এলওসি-৩-এর অর্থায়নে ‘আপগ্রেডেশন অব মোংলা পোর্ট’ শীর্ষক প্রকল্পটি বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। প্রকল্পের অধীনে মোংলা বন্দরে আধুনিক যন্ত্রপাতিসহ ২টি কন্টেইনার টার্মিনাল, কন্টেইনার হ্যান্ডলিং ইয়ার্ড, কন্টেইনার ডেলিভারি ইয়ার্ড নির্মাণসহ অন্যান্য সুবিধা সৃষ্টি করা হবে। এতে বন্দরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শিপিং এজেন্ট, সিএন্ডএফ এজেন্ট, স্টিভেডরিং প্রতিষ্ঠান ও শ্রমিক শ্রেণির জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষে মোট ৮১৫টি জাহাজ আগমন করে। এ অর্থবছরে কার্গো হ্যান্ডলিংয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৯১ লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক টন। বন্দরে ১ কোটি ২২ লাখ ৫১ হাজার মেট্রিক টন কার্গো হ্যান্ডলিংয়ের মধ্য দিয়ে লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হওয়ার পাশাপাশি পূর্ববর্তী অর্থবছরের তুলনায় ১৮ লাখ ৩৯ হাজার মেট্রিক টন, অর্থাৎ ১৭.৬৬ শতাংশ বেশি কার্গো হ্যান্ডলিং করা হয়।
এছাড়া অর্থবছরে কন্টেইনার হ্যান্ডলিংয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২৫ হাজার টিইইউ। এর বিপরীতে ২৯ হাজার ৭১৪ টিইইউ কন্টেইনার হ্যান্ডলিংয়ের মধ্য দিয়ে লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হওয়ার পাশাপাশি পূর্ববর্তী অর্থবছরের তুলনায় ৮ হাজার ২৫৮ টিইইউ, অর্থাৎ ৩৮.৪৯ শতাংশ বেশি কন্টেইনার হ্যান্ডলিং করা হয়।
বন্দর চেয়ারম্যান জানান, ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩৪৭ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। এ অর্থবছরে বন্দরে ৩৮৭ কোটি ৯৫ লাখ ১২ হাজার টাকা রাজস্ব আয় হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হওয়ার পাশাপাশি পূর্ববর্তী অর্থবছরের তুলনায় ৪০ কোটি ৮২ লাখ ৬৪ হাজার টাকা, অর্থাৎ ১১.৭৬ শতাংশ বেশি রাজস্ব আয় হয়েছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে মোংলা বন্দরের মাধ্যমে ১২ হাজার ৭৫টি রিকন্ডিশন্ড গাড়ি আমদানি হয়েছে, যা পূর্ববর্তী অর্থবছরের তুলনায় ৪৯৬টি বেশি বলে জানান চেয়ারম্যান।
সভায় উপস্থিত ছিলেন সদস্য (হারবার ও মেরিন) কমডোর মোঃ শফিকুল ইসলাম সরকার, সদস্য (প্রকৌশল ও উন্নয়ন) (দায়িত্বপ্রাপ্ত বিকল্প কর্মকর্তা) প্রকৌশলী শেখ শওকত আলী, প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা কালাচাঁদ সিংহ, পরিচালক (বোর্ড) কমান্ডার এস এম আফজালুল ইসলাম, হারবার মাস্টার ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম, উপপরিচালক (জনসংযোগ) মোঃ সালাহ্ উদ্দিন কবির, খুলনা প্রেস ক্লাবের সভাপতি মোস্তফা সরওয়ার, সাধারণ সম্পাদক তরিকুল ইসলাম প্রমুখ।
এসএস/আরএন