ENGLISH EPAPER 📍 ঢাকা 📅 মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৪ আশ্বিন ১৪৩৩ তথ্য অধিদফতর নিবন্ধন নম্বর ০৬
শিরোনাম
Advertisement
পাইপলাইনের গ্যাসে হাহাকার
এলপিজিতে ৫০০ টাকার অনিয়ন্ত্রণ, চরম চাপে ভোক্তা ও অর্থনীতি
✎ অবজারভার প্রতিবেদক
⏲ প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ২:১০ পিএম
সংগৃহীত ছবি
X
Advertisement

সংগৃহীত ছবি

পাইপলাইনে প্রাকৃতিক গ্যাসের নজিরবিহীন সংকট, আন্তর্জাতিক বাজারে অস্বাভাবিক শিপিং চার্জ এবং সরকারি নীতিমালার সমন্বয়হীনতায় চরম অস্থিরতা তৈরি হয়েছে দেশে বোতলজাত তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) বাজারে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) কাগজ-কলমে সেপ্টেম্বরের জন্য ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম কমালেও বাস্তবে খুচরা বাজারে মিলছে তার সম্পূর্ণ উল্টো চিত্র। সরকার নির্ধারিত ১ হাজার ৫৮৫ টাকার সিলিন্ডার কিনতে গ্রাহকদের গুনতে হচ্ছে ১ হাজার ৮৫০ থেকে ২ হাজার ১০০ টাকা পর্যন্ত—অর্থাৎ সিলিন্ডারপ্রতি ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা বেশি। অনেক এলাকায় বাড়তি টাকা দিয়েও এলপিজি না পেয়ে খালি হাতে ফিরছেন গ্রাহকেরা।

পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, দেশে শিল্প, বিদ্যুৎ ও বাসাবাড়ি মিলে দৈনিক প্রাকৃতিক গ্যাসের মোট চাহিদা চার হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। বিপরীতে দেশীয় উত্তোলন ও আমদানিকৃত এলএনজি মিলে সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে গড়ে মাত্র ২৬শ মিলিয়ন ঘনফুট। আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির মূল্যবৃদ্ধি ও সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় সাশ্রয়ী মূল্যে তা আমদানি করতে বেকায়দায় পড়েছে রাষ্ট্রীয় এই প্রতিষ্ঠানটি। ফলাফলস্বরূপ, বাসাবাড়িতে পাইপলাইনের গ্যাসের চাপ না থাকায় এবং ২০১৫ সাল থেকে নতুন সংযোগ বন্ধ থাকায় হোটেল, রেস্তোরাঁ ও সাধারণ পরিবারগুলো বাধ্য হয়ে এলপিজির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। হঠাৎ করেই এই অতিরিক্ত গ্রাহকের চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে বেসরকারি এলপিজি অপারেটররা।

আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির মূল উপাদান প্রোপেন ও বিউটেনের সৌদি আরামকো ঘোষিত চুক্তিমূল্যের (সৌদি সিপি) ওপর ভিত্তি করে দেশে প্রতি মাসে দাম সমন্বয় করে বিইআরসি। সেপ্টেম্বরের সৌদি সিপির ওপর ভিত্তি করে কমিশন ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ১৩ টাকা কমিয়েছিল। কিন্তু বিইআরসির এই হিসেব বাস্তবে অকার্যকর হয়ে পড়েছে বিইআরসি কর্তৃক নির্ধারিত ‘জাহাজ ভাড়া’র  কারণে। বিইআরসি দাম নির্ধারণের সময় প্রতি টন এলপিজির ফ্রেইট বা জাহাজ ভাড়া ১৬০ ডলার হিসেবে ধরে থাকে। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা ও বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের কারণে আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথে এই ভাড়া এখন প্রতি টনে ৪০০ ডলারে পৌঁছেছে। 

উদ্যোক্তারা জানান, বাড়তি ভাড়ায় এলপিজি আমদানি করে সরকারি কম দামে বিক্রি করলে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিশাল লোকসান গুনতে হবে। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় ইউরোপ বা ধনী দেশগুলোর মতো বেশি দামে গ্যাস কেনায় পিছিয়ে পড়ছেন দেশীয় ব্যবসায়ীরা, যা সরবরাহ ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়ার উপক্রম করেছে।

বাজারে যখন দামের এই অগ্নিমূল্য, তখন সরকারি প্রতিষ্ঠান এলপিজিএল থেকে সরবরাহ করা সাড়ে ১২ কেজির বোতলের নির্ধারিত দাম মাত্র ৭৭৭ টাকা। অর্থাৎ, সরকারি বোতলের দাম বেসরকারি বোতলের নির্ধারিত দামের অর্ধেকেরও কম। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, এই সাশ্রয়ী সরকারি এলপিজি সাধারণ গ্রাহকদের হাতের নাগালে নেই। সীমিত সরবরাহের এই গ্যাস সাধারণ মানুষের কাছে না পৌঁছে নির্দিষ্ট সিন্ডিকেট ও কালোবাজারিদের পেটে যাচ্ছে বলে অভিযোগ গ্রাহকদের।

এলপিজির এই অনিয়ন্ত্রিত মূল্যবৃদ্ধি শুধু গৃহিণীদের রান্নাঘরের বাজেটেই আঘাত হানেনি, বরং এর বহুমাত্রিক পরোক্ষ প্রভাব পড়েছে পুরো মূল্যস্ফীতিতে। মোড়ের টি-স্টল, মাঝারি হোটেল ও বেকারিগুলো বাধ্য হয়ে খাবার ও নাস্তার দাম বাড়িয়ে দিয়েছে; কারণ সিলিন্ডারপ্রতি ৫০০ টাকা বাড়তি খরচের ধাক্কা সরাসরি খাবারের দামে গিয়ে পড়ছে। পাশাপাশি যেসব সিএনজি অটোরিকশা ও ব্যক্তিগত গাড়ি কম খরচে চলার জন্য ‘অটো গ্যাসে’ রূপান্তরিত হয়েছিল, সেগুলো অটোগ্যাস স্টেশনে সরবরাহ কম থাকায় এবং চড়া দামে গ্যাস কিনতে থাকায় যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া হাঁকাচ্ছে। এছাড়া মূল সরবরাহ সংকটের সুযোগে একশ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী মেয়াদউত্তীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ পুরনো সিলিন্ডারে অনিরাপদ উপায়ে গ্যাস রিফিল করে চড়া দামে বিক্রি করছে, যা জননিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের হুমকি তৈরি করছে।

কাপ্তানবাজার এলাকার এলপিজি বিক্রেতা জসিম উদ্দিন বলেন, ‘আমাদের অনেক সিলিন্ডার খালি। ডিলাররা গ্যাস দিচ্ছে না। গত তিনদিন ধরে প্রতি সিলিন্ডারে ২-৩শ টাকা দাম বেড়েছে।’

জসিম উদ্দিন  বলেন, ‘বর্তমানে জেএমআই ১৮শ ৫০ টাকা, ফ্রেশ ও যমুনা ১৮শ ৩০ টাকা, টোটাল ১৯শ টাকা এবং প্লাস্টিক (বেক্সিমকো) বিক্রি হচ্ছে ২১শ টাকায়। বাজারে বেক্সিমকোর সিলিন্ডারগুলোকে ‘প্লাস্টিক’ নামেই চেনে।

আমদানিকারকদের সংগঠন লোয়াব সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক জানান, পোর্ট বা প্ল্যান্ট লেভেলে কোনো বাড়তি দাম নেওয়া হচ্ছে না। নিবন্ধিত ডিলারদের কেউ অতিরিক্ত মূল্য নিলে তাদের সনদ বাতিলের হুঁশিয়ারি দিলেও তিনি দাবি করেন, খুচরা বাজারের এই অনিয়ন্ত্রণ ঠেকানোর দায়িত্ব মূলত সরকারের স্থানীয় প্রশাসন ও জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের। 

অন্যদিকে, বিইআরসির কর্মকর্তারা বলছেন, বার্ষিক চাহিদার চেয়ে অতিরিক্ত পরিমাণ এলপিজি আমদানি নিশ্চিত করার পরও পাইপলাইনের গ্যাস সংকটের কারণে বাজারে কৃত্রিম চাপ তৈরি হয়েছে, যা নিরসনে সব পক্ষের সাথে আলোচনা চলছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, সাময়িক তদারকির পাশাপাশি বিইআরসির আন্তর্জাতিক জাহাজ ভাড়ার আধুনিক মূল্যসূচক তৈরি, পাইপলাইনের গ্যাসের বিকল্প সহজলভ্য করা এবং সরকারি ৭৭৭ টাকার সিলিন্ডার সরাসরি বিতরণের সুনির্দিষ্ট উদ্যোগ না নিলে ভোক্তাদের ওপর এই অন্যায্য আর্থিক শোষণ বন্ধ করা সম্ভব নয়।

এসএ



Loading...
Loading...
আরো দেখুন
সম্পাদক: ইকবাল সোবহান চৌধুরী
অবজারভার লিমিটেডের পক্ষে সম্পাদক কর্তৃক গ্লোব প্রিন্টার্স, ২৪/এ, নিউ ইস্কাটন রোড, রমনা, ঢাকা থেকে প্রকাশিত।
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:আজিজ ভবন (৩য় তলা), ৯৩, মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা (সি/এ), ঢাকা-১০০০।

ফোন: পিএবিএক্স- ৪১০৫৩০০১-০৬; বিজ্ঞাপন: ৪১০৫৩০১২; ০১৭৯৩৩১৭৮২৯, ০১৫৫০৭০৭২৯১, ই-মেইল: [email protected], ‍[email protected] অনলাইন: ৪১০৫৩০১৪; ০১৫৫০৭০৭২৯৭ ই-মেইল: [email protected] ০১৫৫০৭০৭২৯৬
🔝
Advertisement