উত্তরের নদীবিধৌত জেলা গাইবান্ধা। জেলার উত্তর ও পূর্ব প্রান্ত ঘেঁষে বয়ে চলেছে তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র ও যমুনা। নদী, চর, কাশবন আর বিস্তীর্ণ সবুজের সমন্বয়ে গাইবান্ধার প্রকৃতি যেন আপন সৌন্দর্যে ভরপুর। তবে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এমন বিপুল সম্ভাবনা থাকলেও পর্যটন শিল্পের বিকাশ ঘটেনি কাঙ্ক্ষিত মাত্রায়।
কৃষিনির্ভর অর্থনীতির এই জেলায় অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি পর্যটনকেন্দ্রিক সুযোগ-সুবিধাও সীমিত। ফলে অবসর কিংবা ভ্রমণের জন্য জেলার মানুষকে প্রায়ই ছুটতে হয় রংপুর, বগুড়া, দিনাজপুরসহ আশপাশের জেলাগুলোতে। দীর্ঘ পথ, যাতায়াতের খরচ ও সময়ের কারণে অনেকের পক্ষেই নিয়মিত জেলার বাইরে ঘুরতে যাওয়া সম্ভব হয় না। তাদের কাছে তাই স্বল্প খরচে প্রকৃতির সান্নিধ্য পাওয়ার অন্যতম আকর্ষণ হয়ে উঠেছে গাইবান্ধার চরাঞ্চল।
বিশেষ করে বিকেল গড়িয়ে সূর্য পশ্চিম আকাশে হেলে পড়লেই ফুলছড়ি, সাঘাটা ও সুন্দরগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন চরাঞ্চলে দেখা যায় মানুষের আনাগোনা। কেউ পরিবার নিয়ে, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে আবার কেউ একান্তে প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করতে ছুটে আসেন নদীর তীরে।
বিকেলের নরম আলোয় ব্রহ্মপুত্রের বিস্তীর্ণ জলরাশি, নদীর বুকে ছোট ছোট নৌকা, দূরে জেগে ওঠা চর, কাশফুলের দোল, সবুজ ফসলের মাঠ আর পশ্চিম আকাশের রঙ বদলের দৃশ্য মুহূর্তেই বদলে দেয় চারপাশের পরিবেশ। সূর্যাস্তের সময় নদীর পানিতে লাল-কমলা আভা ছড়িয়ে পড়লে সৃষ্টি হয় আরও মনোমুগ্ধকর দৃশ্য।
দিনভর কর্মব্যস্ততা শেষে অনেকের কাছেই নদীর পাড়ে বসে কিছুটা সময় কাটানো হয়ে ওঠে প্রশান্তির উপলক্ষ। শিশুদের ছোটাছুটি, তরুণদের আড্ডা, পরিবারের সদস্যদের গল্প কিংবা নদীর বুকে নৌকাভ্রমণ সব মিলিয়ে বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চরাঞ্চলগুলোতে তৈরি হয় ভিন্ন এক আবহ।
সম্প্রতি গাইবান্ধা জেলার ফুলছড়ি উপজেলার বালাসীঘাটে গিয়ে দেখা যায় শরতের কাশফুলের সৌন্দর্য উপভোগ করতে ছোট ছোট ইঞ্জিন চালিত নৌকায় চড়ে বিভিন্ন চরের দিকে ছুটছে ভ্রমণ পিপাসু পর্যটকরা ।
বালাসীঘাটের নৌকার মাঝি সিদ্দিক আলী জানান, ছুটির দিন কিংবা বিকেল হলেই বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ এসব স্থানে বেড়াতে আসেন। অনেকেই মোটরসাইকেল বা ব্যক্তিগত যানবাহনে পরিবার-পরিজন নিয়ে নদীর পাড়ে আসেন। কেউ সঙ্গে করে খাবার নিয়ে আসেন, কেউ আবার স্থানীয়ভাবে পাওয়া চা-নাশতা খেয়ে সময় কাটান।
তবে এসব জায়গায় পর্যটকদের জন্য তেমন কোনো পরিকল্পিত ব্যবস্থা নেই। নেই নির্দিষ্ট পর্যটন স্পট, বসার স্থান, নিরাপদ নৌভ্রমণের ব্যবস্থা, পরিচ্ছন্ন শৌচাগার কিংবা পর্যাপ্ত খাবারের দোকান। কোথাও কোথাও যাতায়াতের পথও দুর্গম। ফলে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য থাকলেও প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর অভাবে পর্যটন সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
নদী ও চর নিয়ে কাজ করা ইয়ুথ নেট গ্লোবালের পরিচালক মারুফ হোসেন জানান, পরিকল্পিত উদ্যোগ নেওয়া হলে গাইবান্ধার নদী ও চরাঞ্চলকে ঘিরে গড়ে উঠতে পারে সম্ভাবনাময় পর্যটনকেন্দ্র। ব্রহ্মপুত্র ও যমুনার চরগুলোতে নির্দিষ্ট দর্শনীয় স্থান তৈরি, নদীভিত্তিক পর্যটন চালু, নিরাপদ নৌযানের ব্যবস্থা, পর্যটকদের বসার স্থান, পরিচ্ছন্নতা ব্যবস্থাপনা, খাবারের দোকান ও স্থানীয় বাজার গড়ে তোলা গেলে পর্যটনের পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।তবে পর্যটন বিকাশের নামে নদী ও চরাঞ্চলের স্বাভাবিক পরিবেশ যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেদিকেও নজর দেওয়া জরুরি। পরিকল্পিতভাবে পরিবেশবান্ধব পর্যটন ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে প্রকৃতির সৌন্দর্য অক্ষুণ্ন রেখেই এর অর্থনৈতিক সম্ভাবনা কাজে লাগানো সম্ভব।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে গাইবান্ধার জেলা প্রশাসক ডঃ মনিরুজ্জামান বলেন, আমরা চরাঞ্চলের সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি । নদী ও চর নিয়ে সরকার ও বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার কিছু উদ্যোগ আছে তাই সমন্বিত ভাবে কাজ করতে পারলে চরের উন্নয়ন হওয়ার পাশাপাশি সেখানকার মানুষের আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটবে।
তাসলিমুল হাসান সিয়াম/এসএ