আজ বিশ্ব পর্যটন দিবস। সুন্দরবনকেন্দ্রিক পর্যটনে নতুন করে সম্ভাবনা দেখা দিলেও পর্যটক কমে যাওয়ায় উদ্বেগে রয়েছেন ব্যবসায়ীরা। চারদিন পর শুরু হচ্ছে সুন্দরবনের নতুন পর্যটন মৌসুম। তবে এখনো কোনো বুকিং না পাওয়ায় হতাশ ট্যুর অপারেটররা।
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সাধারণত অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সুন্দরবনে পর্যটকের ভিড় থাকে। এ সময়ে আবহাওয়া অনুকূল থাকায় নদী-খাল ঘুরে বন ও বন্যপ্রাণী দেখার জন্য দেশি-বিদেশি পর্যটকরা সুন্দরবনে আসেন।
তবে গত অর্থবছরে সুন্দরবনে পর্যটকের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে যেখানে ২ লাখ ১৬ হাজার ১৪৩ জন পর্যটক সুন্দরবনে এসেছিলেন, সেখানে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পর্যটকের সংখ্যা কমে প্রায় ১ লাখে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে পর্যটন জাহাজে সুন্দরবন ভ্রমণ করেছেন মাত্র ৪০ হাজারের মতো পর্যটক।
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে সুন্দরবনে পর্যটক এসেছিলেন ১ লাখ ৮৯ হাজার ৫৭০ জন। এর মধ্যে দেশি ১ লাখ ৮৭ হাজার ৩০৯ এবং বিদেশি ২ হাজার ২৬১ জন। ওই বছর রাজস্ব আয় হয় ১ কোটি ৫১ লাখ ৭৪ হাজার ৩৯০ টাকা।
২০১৯-২০ অর্থবছরে পর্যটক এসেছিলেন ১ লাখ ৭২ হাজার ৯৭৯ জন। তাদের মধ্যে দেশি ১ লাখ ৭০ হাজার ৬৬২ এবং বিদেশি ২ হাজার ৩১৭ জন। রাজস্ব আয় হয় ১ কোটি ৮৭ লাখ ৬৫ হাজার ৮ টাকা।
২০২০-২১ অর্থবছরে পর্যটকের সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ১ লাখ ৪৬ হাজার ২১১ জনে। এর মধ্যে দেশি ১ লাখ ৪৫ হাজার ৮৯১ এবং বিদেশি ৩২০ জন। রাজস্ব আয় হয় ১ কোটি ৫৭ লাখ ৫৪ হাজার ১৬৬ টাকা।
২০২১-২২ অর্থবছরে পর্যটক সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১ লাখ ৫৫ হাজার ৪৭৭ জনে। এর মধ্যে দেশি ১ লাখ ৫৪ হাজার ৩৭৪ এবং বিদেশি ১ হাজার ১০৩ জন। রাজস্ব আয় হয় ২ কোটি ২৪ লাখ ৮৩ হাজার ৫৮০ টাকা।
২০২২-২৩ অর্থবছরে পর্যটক সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে ২ লাখ ১৬ হাজার ১৪৩ জনে দাঁড়ায়। এর মধ্যে দেশি পর্যটক ২ লাখ ১৪ হাজার এবং বিদেশি ২ হাজার ১৪৩ জন। ওই অর্থবছরে রাজস্ব আয় হয় ৩ কোটি ৯৪ লাখ ৩২ হাজার ৪৮০ টাকা।
ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব সুন্দরবন (টোয়াস) খুলনার সিনিয়র সহসভাপতি মাজহারুল ইসলাম কচি বলেন, সুন্দরবনকেন্দ্রিক পর্যটকের সংখ্যা ক্রমেই কমছে। গত বছর পর্যটন জাহাজে মাত্র ৪০ হাজারের মতো পর্যটক সুন্দরবন ভ্রমণ করেছেন। ছোট নৌযানে করমজলসহ বিভিন্ন স্থানে যাওয়া দর্শনার্থীর সংখ্যাও কমেছে।
তিনি বলেন, “অক্টোবরে পর্যটন মৌসুম শুরু হচ্ছে। কিন্তু এখনো কোনো বুকিং পাইনি। এ বছরও আশানুরূপ পর্যটক পাওয়া নিয়ে আমরা দুশ্চিন্তায় আছি।”
তার মতে, সুন্দরবনের পর্যটক কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ বনসংলগ্ন এলাকায় গড়ে ওঠা অবৈধ রিসোর্ট। এসব রিসোর্ট নানা ধরনের বিনোদনের বিজ্ঞাপন দিয়ে পর্যটকদের আকৃষ্ট করছে। ফলে অনেকেই সুন্দরবনের ভেতরে না গিয়ে এসব রিসোর্টেই সময় কাটাচ্ছেন।
তিনি বলেন, সুন্দরবনের নির্দিষ্ট নিয়মকানুনের কারণে পর্যটন জাহাজে অনেক ধরনের বিনোদনের ব্যবস্থা করা সম্ভব হয় না। ফলে তরুণদের একটি অংশ অন্য পর্যটনকেন্দ্রের দিকে ঝুঁকছে।
সুন্দরবনের প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা এবং দেশি-বিদেশি পর্যটক আকর্ষণে ২০ বছর মেয়াদি সুন্দরবন ইকোট্যুরিজম মহাপরিকল্পনা তৈরি করা হয়েছে।
পরিকল্পনায় সুন্দরবনের পরিবেশ অক্ষুণ্ন রেখে টেকসই পর্যটন উন্নয়ন, ব্যবস্থাপনা ও বিপণনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
মহাপরিকল্পনা তৈরির প্রক্রিয়ায় উপপ্রধান হিসেবে নেতৃত্ব দেওয়া খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেস্ট্রি অ্যান্ড উড টেকনোলজি ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক ড. মো. ওয়াসিউল ইসলাম বলেন, পরিকল্পনাটি তৈরিতে প্রায় দুই বছর সময় লেগেছে। সুন্দরবনের পরিবেশ ও অর্থনীতির সমন্বয়ে এটি একটি কারিগরি রোডম্যাপ।
তিনি বলেন, পরিকল্পনাটি বাস্তবায়ন হলে দেশীয় পর্যটন শিল্পের বিকাশের পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের অর্থনৈতিক ভিত্তি শক্তিশালী হবে এবং সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কার্যক্রম আরও গতিশীল হবে।
তার মতে, বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করার মাধ্যমে নতুন বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনেরও বড় সুযোগ রয়েছে। সুন্দরবনের নিরিবিলি পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও রাতের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বিদেশি পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় করে তুলতে পারলে পর্যটন খাত দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
এদিকে বিশ্ব পর্যটন দিবস উপলক্ষে রোববার সকাল ৯টায় ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব সুন্দরবন (টোয়াস) খুলনার উদ্যোগে বিশেষ রোড শোর আয়োজন করা হয়েছে। বিআইডব্লিউটিএ লঞ্চঘাট থেকে শুরু হয়ে রোড শোটি জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, শহীদ হাদিস পার্ক হয়ে শিববাড়ী মোড় পর্যন্ত যাবে।
সৈকত মোঃ সোহাগ / এফএস