জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে আওয়ামী সরকারের সাবেক ৭ সংসদ সদস্য, তাদের স্ত্রী ও সাবেক মেয়রসহ ১৮ জনের বিরুদ্ধে পৃথক ১৮ মামলা অনুমোদন দিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তাদের বিরুদ্ধে ৭৭ কোটি টাকার সম্পদ অর্জনের তথ্য পাওয়া গেছে।
বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) দুদকের প্রধান কার্যালয় থেকে পৃথক মামলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে সংস্থাটির সচিব সাইদুর রহমান খান জানিয়েছেন।
যাদের বিরুদ্ধে মামলা অনুমোদন হয়েছে তারা হলেন-কুষ্টিয়া-৪ আসনের সাবেক এমপি সেলিম আলতাফ জর্জ ও আবদুর রউফ, রউফের স্ত্রী জান্নাতুন নাহার, কুষ্টিয়া-১ আসনের সাবেক এমপি মো. রেজাউল হক চৌধুরী ও তার ভাই দৌলতপুর উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান বুলবুল আহমেদ টোকেন চৌধুরী, হবিগঞ্জ-৩ আসনের সাবেক এমপি আবু জাহির, ফেনী-৩ আসনের সাবেক এমপি হাজী রহিম উল্লাহ, লক্ষ্মীপুর-২ আসনের সাবেক এমপি নুর উদ্দিন চৌধুরী নয়ন ও তার স্ত্রী চৌধুরী রুবিনা ইয়াছমিন লুবনা এবং সংরক্ষিত মহিলা আসনের সাবেক এমপি ফরিদা ইয়াসমিন।
এছাড়া তালিকায় রয়েছেন বসুরহাট পৌরসভার সাবেক মেয়র আবদুল কাদের মির্জা ও তার স্ত্রী আখতার জাহান বকুল, যশোর পৌরসভার সাবেক মেয়র জহিরুল ইসলাম চাকলাদার ও তার স্ত্রী শামীমা শারমিন, খুলনা জেলা পরিষদের সাবেক প্রশাসনিক কর্মকর্তা এস এম মাহাবুবুর রহমান ও তার স্ত্রী জাকিয়া মাহাবুব।
আসামিদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪-এর ২৬(২) ও ২৭(১) ধারা, দণ্ডবিধির ১০৯ ধারা এবং কারও কারও ক্ষেত্রে মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর ৪(২) ও ৪(৩) ধারায় মামলাগুলো দায়ের করা হবে বলে জানিয়েছে দুদক সচিব।
অনুসন্ধান প্রতিবেদন সূত্রে জানা যায়, কুষ্টিয়া-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য সেলিম আলতাফ জর্জের বিরুদ্ধে ৬৪ লাখ ৪৮ হাজার ৪৭৮ টাকার সম্পদের তথ্য গোপন ও ১ কোটি ১ লাখ ৬৪ হাজার ৩ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন অভিযোগে মামলা রুজুর অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে কুষ্টিয়া-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আবদুর রউফ ও তার স্ত্রী জান্নাতুন নাহারের বিরুদ্ধে পৃথক দুটি মামলা রুজুর অনুমোদন দিয়েছে দুদক। যেখানে আবদুর রউফের বিরুদ্ধে ২ কোটি ৬৫ লাখ ১০ হাজার ৬০৫ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ আনা হয়েছে। আর অপর মামলায় তার স্ত্রী জান্নাতুন নাহারের বিরুদ্ধে ১ কোটি ৩৯ লাখ ৯৯ হাজার ২৯২ টাকার অসংগত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ আনা হয়েছে।
কুষ্টিয়া-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মো. রেজাউল হক চৌধুরীর বিরুদ্ধে ৩৭ লাখ ২৬ হাজার ৬০০ টাকার তথ্য গোপন এবং ২ কোটি ৪৬ লাখ ৯২ হাজার ৫৩৫ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে মামলার সিদ্ধান্ত দিয়েছে দুদক।
একই সঙ্গে তার ছোট ভাই ও দৌলতপুর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মো. বুলবুল আহমেদ টোকেন চৌধুরীর বিরুদ্ধেও পৃথক আরও একটি মামলার অনুমোদন দিয়েছে কমিশন। যেখানে ৪ লাখ ১৪ হাজার টাকার তথ্য গোপন ও ১ কোটি ৭৯ লাখ ৩৫ হাজার ২৬৮ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ আনা হয়েছে।
এদিকে হবিগঞ্জ-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মো: আবু জাহিরের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও মানিলন্ডারিংয়ের অভিযোগে মামলা রুজুর অনুমোদন দিয়েছে দুদক। অভিযোগে ৭ কোটি ২৭ লাখ ৩৬ হাজার ৬২৭ টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ অর্জনের তথ্য গোপন ও ৯ কোটি ৩২ লাখ ৭১ হাজার ৫৫৯ টাকার অবৈধ সম্পদ অভিযোগ আনা হয়েছে। এছাড়াও চারটি ব্যাংক হিসাবে ২২ কোটি ৫৬ লাখ ৩ হাজার ৭৫৬ টাকা স্থানান্তরের অভিযোগও রয়েছে।
ফেনী-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য হাজী রহিম উল্লাহর বিরুদ্ধে মামলা রুজুর অনুমোদন দিয়েছে দুদক। অভিযোগে ৩ কোটি ৮৪ লাখ ৪৬ হাজার ৫২১ টাকার সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে।
কমিশন থেকে লক্ষ্মীপুর-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য নুর উদ্দিন চৌধুরী নয়নের বিরুদ্ধে ৭৯ লাখ ৯৯ হাজার ৬৪২ টাকার অসংগত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে আরও একটি মামলা অনুমোদন দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে দুদক।
একই অনুমোদনে তার স্ত্রী চৌধুরী রুবিনা ইয়াছমিন লুবনার বিরুদ্ধেও ১ কোটি ৮২ লাখ ৫১ হাজার ৫৮৯ টাকার অসংগত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে প্রধান আসামি ও স্বামীকে সহায়তাকারী হিসেবে যুক্ত করে আরেকটি মামলার সিদ্ধান্ত রয়েছে।
দুদক আরও জানিয়েছে, নোয়াখালীর বসুরহাট পৌরসভার সাবেক মেয়র আবদুল কাদের মির্জা ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে মোট তিনটি পৃথক মামলা রুজুর অনুমোদন দিয়েছে দুদক। এর মধ্যে আবদুল কাদের মির্জার বিরুদ্ধে ১ কোটি ১৯ লাখ ৯৬ হাজার ৯৫০ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে একটি মামলা, তার স্ত্রী আখতার জাহান বকুলের বিরুদ্ধে ১ কোটি ৫০ লাখ ৮৩ হাজার ৪০০ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে স্বামী কাদের মির্জাসহ দ্বিতীয় মামলার সিদ্ধান্ত রয়েছে। এছাড়া তাদের ছেলে ও রড-সিমেন্ট ব্যবসায়ী মির্জা মাসরুর কাদের তাশিকের বিরুদ্ধে বাবার সহায়তায় ৮১ লাখ ৭৩ হাজার ৭৪৫ টাকার অসংগত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে তৃতীয় মামলার অনুমোদন দিয়েছে কমিশন।
যশোর পৌরসভার সাবেক মেয়র জহিরুল ইসলাম চাকলাদারের বিরুদ্ধে ২৪ কোটি ৫৮ লাখ ৪৫ হাজার ২২১ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগেও মামলার সিদ্ধান্ত দিয়েছে দুদক।
একই সঙ্গে তার স্ত্রী শামীমা শারমিনের বিরুদ্ধেও ৬ কোটি ৭২ লাখ ৯ হাজার ৪৫৩ টাকার অসংগত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে স্বামীকে সহায়তাকারী হিসেবে যুক্ত করে শামীমার বিরুদ্ধে পৃথক আরেকটি মামলার অনুমোদন দিয়েছে কমিশন।
খুলনা জেলা পরিষদের সাবেক প্রশাসনিক কর্মকর্তা এস এম মাহাবুবুর রহমানের বিরুদ্ধে ২ কোটি ৫১ লাখ ৭৩ হাজার ২০০ টাকা ও তার স্ত্রী জাকিয়া মাহাবুবের বিরুদ্ধে ৭৫ লাখ ৩৪ হাজার ৪৬১ টাকার অসংগত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে স্বামীসহ দুজনের বিরুদ্ধে পৃথক দুই মামলা অনুমোদন দিয়েছে বলে জানা গেছে।
টিআইএস