বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় চলতি বছরের মার্চ থেকে জুলাই পর্যন্ত পাঁচ মাসে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) মোট লোকসান হয়েছে ২০ হাজার কোটি টাকার বেশি। বিপুল এই ক্ষতি পোষাতে অর্থ মন্ত্রণালয়ে নতুন করে ভর্তুকির আবেদন জানিয়েছে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ। একই সঙ্গে সরকার থেকে পাওয়া সাড়ে ২৭ হাজার কোটি টাকার পুরোনো ঋণকে পুনরায় ভর্তুকিতে রূপান্তরের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এক চিঠিতে এসব তথ্য ও প্রস্তাব তুলে ধরা হয়।
চিঠিতে জানানো হয়, চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সংঘাতের প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ে। তবে অভ্যন্তরীণ জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় বিশ্ববাজারের সাথে মিলিয়ে স্থানীয় বাজারে দাম বাড়ানো হয়নি। ফলে মার্চ থেকে জুলাই পর্যন্ত বিপিসির মোট লোকসান দাঁড়ায় ২০ হাজার ৫৯ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। মাসভিত্তিক হিসাবে মার্চে ২ হাজার ২৪৮ কোটি, এপ্রিলে ৭ হাজার ৮৬৬ কোটি, মে মাসে ২ হাজার ৬২১ কোটি, জুনে ৬ হাজার ১৯৮ কোটি এবং জুলাইয়ে ১ হাজার ১২৫ কোটি টাকা ক্ষতি হয়। বর্তমান পরিস্থিতি অপরিবর্তিত থাকায় এ লোকসান এখনও অব্যাহত রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়।
ক্ষতিপূরণের জন্য গত ১৭ আগস্ট বিপিসি জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগে আবেদন করার পর জুলাই ও আগস্ট মাসে দফায় দফায় অর্থ মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ পাঠানো হলেও এখন পর্যন্ত কোনো ভর্তুকি মেলেনি।
এর পাশাপাশি, আমদানি মূল্য ও দেশের বিক্রয়মূল্যের পার্থক্যের কারণে অতীতে বিপিসিকে দেওয়া ২৭ হাজার ৪১৯ কোটি ৮১ লাখ টাকার দায়কে ঋণ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। এই ঋণের দায় থেকে বিপিসিকে অব্যাহতি দিয়ে 'ডেট সার্ভিস লাইয়াবিলিটিজ' (ডিএসএল) বই থেকে তা অবলোপনের (রাইট-অফ) দাবি জানানো হয়েছে।
নথি অনুযায়ী, ১৯৯৯-২০০০ থেকে ২০১৩-১৪ অর্থবছর পর্যন্ত কম দামে তেল বিক্রির ঘাটতি মেটাতে বিপিসিকে সরাসরি ৩ হাজার ৯০০ কোটি টাকা এবং লোকসান সমন্বয় বাবদ ২২ হাজার ৪৫০ কোটি টাকাসহ মোট সাড়ে ২৭ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ হিসেবে দেওয়া হয়। ২০১৬ সালে এই ঋণ ভর্তুকিতে রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হলে তৎকালীন অর্থমন্ত্রী জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) পাওনা মেটানোর শর্ত দেন। বিপিসি সেই অনুযায়ী ২০২০ সালের জুনের মধ্যে এনবিআরের ২ হাজার ৬০৪ কোটি ৩৩ লাখ টাকা বকেয়া ভ্যাট পরিশোধ করে। পরবর্তীতে ২০২১ সালেও আবেদন করা হলেও বিষয়টি এতদিন ঝুলে ছিল।
চিঠিতে আরও তুলে ধরা হয়, নীতিগত সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত না হলেও বিপিসি এ পর্যন্ত উদ্বৃত্ত তহবিল ও লভ্যাংশ হিসেবে মোট ১৬ হাজার ৬৫০ কোটি টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দিয়েছে। এছাড়া ২০১৪-১৫ অর্থবছর থেকে বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমায় বিপিসি যে মুনাফা করেছিল, তা থেকে সোনালী, জনতা, অগ্রণী ও রূপালী ব্যাংকের ৩০ হাজার ৮৭৮ কোটি ৭৭ লাখ টাকার ঋণ শোধ করা হয়। পাশাপাশি পেট্রোবাংলার ১ হাজার ৭০০ কোটি, ভ্যাট কর্তৃপক্ষের ৬০৩ কোটি এবং জমি কেনা বাবদ ২৩৫ কোটি টাকা পরিশোধের পাশাপাশি সরকারকে লভ্যাংশ হিসেবে দেওয়া হয় ১ হাজার কোটি টাকা। একই সঙ্গে চলমান বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পেও সংস্থাটিকে নিয়মিত বড় অঙ্কের অর্থ সংস্থান রাখতে হচ্ছে।