রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে তৈরি হয়েছে অভূতপূর্ব গ্যাস সংকট। মহাসড়কে সিএনজি রিফুয়েলিং স্টেশনের দীর্ঘ সারি যেমন চালকদের ঘুম ও উপার্জন কেড়ে নিচ্ছে, তেমনি গৃহস্থালিতে চলছে রান্নার হাহাকার। অন্যদিকে পর্যাপ্ত চাপ না থাকায় উৎপাদন সচল রাখতে গিয়ে মারাত্মক লোকসানের মুখে পড়েছেন শিল্পমালিকরা, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং নিত্যপণ্যের বাজারেও।
বুধবার রাতে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায় এক মানবেতর দৃশ্য। মেরুল বাড্ডার জামান সিএনজি স্টেশনের পেছনে হাতিরঝিলের ভেতর দিয়ে প্রায় দুই কিলোমিটার ছাড়িয়ে পুলিশ প্লাজার কাছাকাছি ঠেকেছে গাড়ির লাইন। স্টেশনের অপর প্রান্তের লাইন বাড্ডার ইউলুপ পার হয়ে গেছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও মিলছে না কাঙ্ক্ষিত প্রেসার।
লাইনে থাকা প্রাইভেটকার চালক সোহেল মিয়া ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “রাত ১১টায় লাইনে দাঁড়িয়েছি, ১২টায় গ্যাস দেওয়া শুরু হলে সিরিয়াল পেতে বাজবে শেষ রাত। তারপর প্রেসার না থাকায় ঠিকমতো গ্যাসও ঢুকবে না। গ্যাস নিতেই যদি রাত পার হয়ে যায়, তবে গাড়ি চালাবো কখন আর ঘুমাবো কখন?”
একই ভোগান্তির কথা জানান সিএনজি চালক রহিম। চার-পাঁচ ঘণ্টা দাঁড়িয়ে মাত্র ৫০ থেকে ৮০ টাকার গ্যাস পাচ্ছেন, যা দিয়ে তিনটির বেশি ট্রিপ মারা সম্ভব নয়। হাজীপাড়া, তেজগাঁও, মহাখালী, গাবতলী ও উত্তরার প্রায় সব পাম্পেই মধ্যরাত পর্যন্ত বিটিভি ভবন বা প্রধান সড়ক জুড়ে সারিবদ্ধ যানবাহনের সৃষ্টি হচ্ছে, যার প্রভাবে রাতেও দীর্ঘ যানজট তৈরি হচ্ছে।
বাসাবাড়িতে লাইনের গ্যাসের চাপ এতটাই কমে গেছে যে দিনভর চুলা জ্বলছে না। মিরপুর, মোহাম্মদপুর, পুরান ঢাকা, রামপুরা ও যাত্রাবাড়ীসহ বড় একটি অংশে সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত রান্না পুরোপুরি বন্ধ। অনেক পরিবারকে বাধ্য হয়ে ভোররাতে উঠে রান্না শেষ করতে হচ্ছে, কিংবা বিকল্প হিসেবে সিলিন্ডার ও রাইস কুকারের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
বাসাবাড়িতে রান্না বন্ধ থাকায় মানুষের ভিড় বাড়ছে হোটেল-রেস্তোরাঁগুলোতে। তবে গ্যাস সংকটে রেস্তোরাঁ মালিকরাও বিকল্প উপায়ে এলপিজি ও খড়ি দিয়ে রান্না চালাতে গিয়ে বাড়তি খরচের মুখোমুখি হচ্ছেন, যা পরোক্ষভাবে বাড়িয়ে দিচ্ছে খাবারের দাম। চালকরা দীর্ঘ সময় গ্যাসের অপেক্ষায় আটকে থাকায় এবং পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় এর প্রভাব গিয়ে পড়ছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারেও।
গ্যাস সংকটের সবচেয়ে মারাত্মক ধাক্কা পড়েছে দেশের তৈরি পোশাক, বস্ত্র ও প্রক্রিয়াজাত শিল্পে। গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া ও নারায়ণগঞ্জের শিল্পাঞ্চলগুলোতে গ্যাসের চাপ প্রায় শূন্যে নেমে এসেছে।
কারখানা মালিকদের মতে, পর্যাপ্ত চাপ না থাকায় বয়লার চালানো যাচ্ছে না। নির্ধারিত সময়ে বিদেশি ক্রেতাদের সরবরাহ নিশ্চিত করতে বাধ্য হয়ে চড়া খরচে ডিজেল দিয়ে জেনারেটর চালাতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন খরচ বহুগুণ বেড়ে কারখানা পরিচালনাই অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এছাড়া গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোতে প্রয়োজনীয় জ্বালানি না পাওয়ায় দেশের বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিংয়ের মাত্রাও আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে।
সার্বিক সংকট প্রসঙ্গে তিতাস গ্যাস ও পেট্রোবাংলার দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা জানান, জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের সরবরাহে কিছুটা ঘাটতি রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজার থেকে এলএনজি আনা এবং পাইপলাইনের জরুরি মেরামত কাজ চলায় সাময়িকভাবে এই চাপ তৈরি হয়েছে। দ্রুতই নতুন এলএনজিবাহী কার্গো দেশে পৌঁছালে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন তারা।
তবে দ্রুত সমাধান না এলে গণপরিবহনের চাকা সচল রাখা, সাধারণ মানুষের খাদ্য সংস্থান এবং রপ্তানিমুখী শিল্প খাতকে টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে বলে মনে করছেন খাত সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।
এসএ