আধুনিক রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রায় প্রতিটি স্তরের সঙ্গে জ্বালানির প্রত্যক্ষ সম্পর্ক রয়েছে। শিল্পকারখানার উৎপাদন, কৃষকের সেচ, পণ্য পরিবহন, গণপরিবহন, হাসপাতাল ও জরুরি সেবা—সবই জ্বালানি সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতিতে জ্বালানি শুধু বাজারজাত পণ্য নয়; অর্থনীতিকে সচল রাখার অন্যতম মৌলিক পূর্বশর্ত। তাই জ্বালানি নীতিকে শুধু ব্যবসা, মূল্য বা মুনাফার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে এর জাতীয় নিরাপত্তা ও জনকল্যাণের মাত্রাটি উপেক্ষিত হয়।
২০২৬ সালের মার্চে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাবে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে বাংলাদেশের বাস্তবতাটি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড-এর প্রতিবেদনে বিপিসি চেয়ারম্যানের বরাত দিয়ে বলা হয়, তখন দেশে ডিজেলের মজুত ছিল প্রায় ১৪ দিনের, পেট্রোলের ১৫ দিনের এবং অকটেনের ২৮ দিনের চাহিদা পূরণের মতো। পরিস্থিতির অবনতি হলে সরকারকে বিকল্প উৎস খুঁজতে, অতিরিক্ত জ্বালানি আমদানি করতে এবং সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় বিশেষ পদক্ষেপ নিতে হয়। পরবর্তী সময়ে ডিজেলের মজুত এক পর্যায়ে প্রায় ১২ দিনের চাহিদার সমপর্যায়ে নেমে আসার কথাও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে আসে।
এই অভিজ্ঞতা একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আনে—যে পণ্যের সরবরাহে সামান্য বিঘ্নও কৃষি, পরিবহন, শিল্প, খাদ্য সরবরাহ ও মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে বিপর্যস্ত করতে পারে, তাকে কি সাধারণ ভোগ্যপণ্যের মতো কেবল মুনাফার যুক্তিতে পরিচালনা করা যায়? বাজারে প্রতিযোগিতা ও বেসরকারি বিনিয়োগ প্রয়োজন; কিন্তু কৌশলগত জ্বালানি নিরাপত্তা পুরোপুরি বাজারের মুনাফা-প্রণোদনার ওপর ছেড়ে দেওয়া যায় না। বাজারের লক্ষ্য মুনাফা নিশ্চিত করা, আর রাষ্ট্রের দায়িত্ব সংকটের সময়ও নাগরিকের জন্য অপরিহার্য সরবরাহ নিশ্চিত করা।
বাংলাদেশে এই ব্যবস্থার কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হলো বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন বা বিপিসি। ১৯৭৬ সালের আইনগত কাঠামোর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠানকে পেট্রোলিয়াম আমদানি, পরিশোধন, সংরক্ষণ, সরবরাহ ও বিপণনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। বাংলাপিডিয়াও বিপিসিকে দেশের পেট্রোলিয়াম ব্যবস্থাপনার কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে উল্লেখ করেছে। তবে বাংলাদেশের জ্বালানি কাঠামো পুরোপুরি রাষ্ট্রীয় নয়; বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও পরিশোধন, পরিবহন, বিপণন ও সরবরাহের বিভিন্ন স্তরে অংশগ্রহণ করে আসছে। ফলে বিতর্কটি বেসরকারি অংশগ্রহণ থাকবে কি না—তা নয়; বরং তার সীমা এবং কৌশলগত নিরাপত্তার কতটা নিয়ন্ত্রণ রাষ্ট্রের হাতে থাকবে।
এই প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়েছে বেসরকারি রিফাইনারিগুলোকে সরাসরি বাজারজাতকরণের সুযোগ দেওয়ার নীতির কারণে। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড-এর প্রতিবেদনে ২০২৩ সালের সরকারি নীতির খসড়া সম্পর্কে বলা হয়েছিল, বেসরকারি রিফাইনারিগুলোকে উৎপাদিত জ্বালানির অন্তত ৬০ শতাংশ বিপিসির কাছে সরকার নির্ধারিত মূল্যে বিক্রি করতে হবে এবং অবশিষ্ট ৪০ শতাংশ নিজস্ব বিপণন ব্যবস্থায় বাজারজাত করার সুযোগ দেওয়া হবে। পরবর্তীতে একটি বেসরকারি রিফাইনারির অনুমোদনেও প্রথম তিন বছর ৬০ শতাংশ বিপিসিকে এবং ৪০ শতাংশ নিজস্ব বিতরণ ব্যবস্থায় বিক্রির সুযোগ রাখা হয় বলে প্রথম আলো জানিয়েছে। ফলে এটিকে সম্পূর্ণ বেসরকারিকরণ না বলে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যে বেসরকারি অংশগ্রহণের পরিসর সম্প্রসারণ বলা অধিকতর যথাযথ।
বেসরকারি অংশগ্রহণ নিজে সমস্যা নয়। সঠিক নীতির অধীনে এটি বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, অবকাঠামো, দক্ষতা ও প্রতিযোগিতা বাড়াতে পারে। সমস্যা তৈরি হয় তখন, যখন আমদানি, সংরক্ষণ, পরিবহন, ডিপো, পাইপলাইন ও খুচরা বিপণনের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্তর কয়েকটি বৃহৎ প্রতিষ্ঠানের হাতে কেন্দ্রীভূত হয় এবং রাষ্ট্র তাদের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। তখন বেসরকারি দক্ষতার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় দুর্বলতাও তৈরি হতে পারে।
জ্বালানি নিরাপত্তার গুরুত্ব বোঝার জন্য ডিজেলই যথেষ্ট উদাহরণ। কৃষির সেচ, কৃষিযন্ত্র, পণ্য পরিবহন ও সড়ক পরিবহনে ডিজেলের ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে। ২০২৬ সালের সংকটের সময় প্রথম আলো জানিয়েছিল, কৃষি সেচ, সড়ক পরিবহন ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে বাংলাদেশের ডিজেলের ওপর ব্যাপক নির্ভরতা রয়েছে। ফলে জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন শুধু পাম্পস্টেশনে দীর্ঘ লাইন সৃষ্টি করে না; এর প্রভাব পরিবহন ব্যয়, কৃষি উৎপাদন, শিল্পের উৎপাদন ব্যয় ও ভোক্তা পর্যায়ের মূল্যস্ফীতিতে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। খাদ্য উৎপাদন থেকে সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণ—প্রতিটি পর্যায়েই জ্বালানি প্রয়োজন। ফলে জ্বালানি নিরাপত্তা কার্যত খাদ্য নিরাপত্তারও অংশ।
শিল্প ও রপ্তানি খাতেও একই বাস্তবতা প্রযোজ্য। জ্বালানির মূল্য বা সরবরাহে বড় পরিবর্তন হলে উৎপাদন ব্যয় বাড়ে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা দুর্বল হতে পারে। যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা, সমুদ্রপথে সরবরাহ বিঘ্ন, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট কিংবা আন্তর্জাতিক বাজারে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধিতে ঝুঁকি আরও বাড়ে। স্বাভাবিক সময়ে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান লাভজনকভাবে জ্বালানি আমদানি করতে পারে; কিন্তু সংকটকালে লোকসান দিয়ে আমদানি অব্যাহত রাখবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। তার ব্যবসায়িক দায়িত্ব মূলধন ও মুনাফা রক্ষা করা; রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো প্রয়োজনে অর্থনৈতিক ব্যয় বহন করেও নাগরিকের জন্য অপরিহার্য সরবরাহ নিশ্চিত করা।
২০২৬ সালের সংকটে বাংলাদেশকে ভারত থেকে ডিজেল আনা, অতিরিক্ত সরকারি ক্রয় এবং বিকল্প আন্তর্জাতিক উৎস খোঁজার মতো পদক্ষেপ নিতে হয়েছে। রয়টার্স জানিয়েছিল, বাংলাদেশ রাশিয়া থেকে ডিজেল আমদানির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা অব্যাহতি চেয়েছিল। এই অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, আন্তর্জাতিক সংকটের সময় রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার কোনো বিকল্প নেই।
আরেকটি বড় ঝুঁকি হলো বাজারক্ষমতার কেন্দ্রীভবন। কোনো বাজারে বহু প্রতিষ্ঠান থাকলেই কার্যকর প্রতিযোগিতা নিশ্চিত হয় না। কয়েকটি প্রতিষ্ঠান যদি আমদানি, সংরক্ষণ, পরিবহন ও বিপণনের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করে, তাহলে কাগজে প্রতিযোগিতা থাকলেও বাস্তবে বাজারক্ষমতা সীমিতসংখ্যক প্রতিষ্ঠানের হাতে কেন্দ্রীভূত হতে পারে। অর্থনীতিতে এটিকে অলিগোপলি বলা হয়। জ্বালানি খাতে এর ঝুঁকি বেশি, কারণ ভোক্তার হাতে বিকল্প সরবরাহকারী সবসময় থাকে না এবং একটি প্রতিষ্ঠানের সরবরাহ সিদ্ধান্ত কৃষি, পরিবহন, শিল্প ও খাদ্য সরবরাহে সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।
বাংলাদেশের এলপিজি বাজার এ ক্ষেত্রে একটি সতর্কবার্তা। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে দ্য ডেইলি স্টার জানায়, এলপিজি ব্যবসার প্রায় ৯৮ শতাংশ বেসরকারি খাতের নিয়ন্ত্রণে। একই সময়ে নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে এলপিজি বিক্রি ও সরবরাহ আটকে রাখার অভিযোগ ওঠে। এপ্রিলে সরকারি মূল্য ১,৭২৮ টাকা নির্ধারিত হলেও বিভিন্ন এলাকায় ভোক্তাদের ২,০০০ থেকে ২,২০০ টাকা পর্যন্ত দিতে হচ্ছিল বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়। তবে এ সমস্যাকে শুধু বেসরকারি মালিকানার ফল হিসেবে দেখা ঠিক হবে না; আন্তর্জাতিক আমদানি ব্যয়, বিনিময় হার, পরিবহন ব্যয়, সরবরাহব্যবস্থা ও খুচরা পর্যায়ের অনিয়মও এতে ভূমিকা রাখে। তবু অভিজ্ঞতাটি দেখায়, রাষ্ট্র মূল্য নির্ধারণ করলেও সরবরাহ শৃঙ্খলে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ না থাকলে বাজারক্ষমতার কেন্দ্রীভবন ভোক্তার জন্য বড় সমস্যা তৈরি করতে পারে।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা দেখায়, জ্বালানি খাতে বেসরকারি অংশগ্রহণ থাকলেও কৌশলগত নিরাপত্তার নিয়ন্ত্রণ রাষ্ট্রের হাতেই রাখা হয়। যুক্তরাষ্ট্র Strategic Petroleum Reserve-এর মাধ্যমে সংকটকালে বাজার স্থিতিশীল করে। জাপানও ২০২৬ সালের জ্বালানি সংকটের আশঙ্কায় জাতীয় মজুত থেকে তেল বাজারে ছাড়ার উদ্যোগ নেয়। ইউরোপ রাশিয়ার ওপর অতিরিক্ত জ্বালানি নির্ভরতার ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি উপলব্ধি করে আমদানির উৎস বহুমুখী করেছে, আর চীন রাষ্ট্রীয় জ্বালানি মজুত ও অবকাঠামো শক্তিশালী করছে। এসব অভিজ্ঞতার মূল শিক্ষা হলো—মুক্তবাজার ও বেসরকারি বিনিয়োগ প্রয়োজনীয় হলেও জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা পুরোপুরি বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়া যায় না; সংকট মোকাবিলায় রাষ্ট্রের হাতে পর্যাপ্ত মজুত, বিকল্প সরবরাহব্যবস্থা ও কার্যকর নিয়ন্ত্রণ থাকা অপরিহার্য।
বাংলাদেশের জন্য শিক্ষা স্পষ্ট: প্রশ্নটি বেসরকারি খাত জ্বালানি আমদানি করবে কি না, তা নয়; বরং সংকটের সময়ে জ্বালানি নিরাপত্তার চূড়ান্ত দায়িত্ব কার হাতে থাকবে। উত্তর যদি রাষ্ট্র হয়, তাহলে পর্যাপ্ত মজুত, আমদানি সক্ষমতা, বিকল্প সরবরাহব্যবস্থা এবং জরুরি সময়ে বাজারে হস্তক্ষেপের ক্ষমতা রাষ্ট্রের হাতে থাকতে হবে।
ইসলামী অর্থনৈতিক দর্শন ব্যক্তিগত মালিকানা ও বৈধ মুনাফাকে স্বীকৃতি দিলেও তা ন্যায়বিচার ও জনকল্যাণের অধীন। পানি, চারণভূমি ও আগুন সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাদিসের অন্তর্নিহিত শিক্ষা হলো, মানুষের অপরিহার্য প্রয়োজনের সম্পদে এমন নিয়ন্ত্রণ থাকা উচিত নয়, যাতে সাধারণ মানুষ বঞ্চিত হয়। মাকাসিদ আল-শরিয়াহর আলোকে জীবন, সম্পদ ও সামগ্রিক কল্যাণ রক্ষা গুরুত্বপূর্ণ; তাই জ্বালানির মতো অপরিহার্য সেবায় সীমিতসংখ্যক প্রতিষ্ঠানের অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ সামাজিক ন্যায় ও জনস্বার্থের প্রশ্ন সৃষ্টি করে। তবে বৈধ বেসরকারি বিনিয়োগ ও যুক্তিসংগত মুনাফা স্বাভাবিক; মূল কথা হলো, মুনাফা যেন উন্নত সেবার ফল হয়, মানুষের অপরিহার্য প্রয়োজনের ওপর নিয়ন্ত্রণের ফল না হয়।
বাংলাদেশের জন্য সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মালিকানায় ফিরে যাওয়া যেমন প্রয়োজনীয় নয়, তেমনি কৌশলগত জ্বালানি আমদানি ও সরবরাহব্যবস্থাকে পুরোপুরি বেসরকারি মুনাফার ওপর ছেড়ে দেওয়াও নিরাপদ নয়। প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় কৌশলগত নিয়ন্ত্রণের অধীনে বেসরকারি অংশগ্রহণ। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান আমদানি, পরিশোধন, সংরক্ষণ, পরিবহন ও বিপণনে বিনিয়োগ করতে পারবে; তবে জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তার চূড়ান্ত দায়িত্ব রাষ্ট্রের হাতে থাকবে। এর প্রথম শর্ত পর্যাপ্ত কৌশলগত মজুত। ২০২৬ সালের মার্চের সংকটে বাংলাদেশের ডিজেল মজুত এক পর্যায়ে প্রায় ১২ দিনের চাহিদায় নেমে এসেছিল। পরে ৯০ দিনের কৌশলগত মজুত গড়ে তোলার পরিকল্পনা সামনে আসে। এই লক্ষ্য দ্রুত বাস্তবায়নের পাশাপাশি সংকটকালে মজুত ব্যবহারের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ রাষ্ট্রের হাতে রাখা জরুরি।
আমদানির উৎসও বহুমুখী করতে হবে, যাতে কোনো দেশ, অঞ্চল বা কোম্পানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা তৈরি না হয়। একই সঙ্গে বিপিসিকে দুর্বল না করে স্বচ্ছ ক্রয়ব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক মূল্য যাচাই, ডিজিটাল মজুত ব্যবস্থাপনা, আধুনিক অবকাঠামো ও জবাবদিহির মাধ্যমে আরও দক্ষ ও পেশাদার প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে হবে। বেসরকারি আমদানিকারকদেরও ন্যূনতম মজুত, জরুরি সরবরাহ পরিকল্পনা এবং সংকটকালে রাষ্ট্রের নির্দেশে সরবরাহ নিশ্চিত করার শর্তের আওতায় আনতে হবে।
কার্যকর প্রতিযোগিতার জন্য আমদানি, সংরক্ষণ, পরিবহন ও খুচরা বিপণনে কোনো প্রতিষ্ঠানের অতিরিক্ত বাজারক্ষমতা নিয়ন্ত্রণে স্বচ্ছ নীতিমালা প্রয়োজন। শুধু মূল্য নিয়ন্ত্রণ যথেষ্ট নয়; বাজারে নতুন প্রতিযোগীর প্রবেশ এবং সরবরাহ শৃঙ্খলে অতিরিক্ত কেন্দ্রীভবন রোধ করাও জরুরি। পাশাপাশি নীতিনির্ধারণে উন্মুক্ত পরামর্শ, প্রভাব মূল্যায়ন, স্বার্থের সংঘাত প্রকাশ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
আমদানিনির্ভরতার কারণে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা বৈদেশিক মুদ্রা, আন্তর্জাতিক বাজার, সমুদ্রপথ, ভূরাজনীতি ও কূটনীতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। তাই রাষ্ট্রকে শেষ সরবরাহকারী হিসেবে সক্ষম রাখতে হবে, যাতে যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা, আন্তর্জাতিক সংকট বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতার সময়ও দ্রুত বাজারে প্রবেশ করে সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় গ্যাস, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সৌরবিদ্যুৎ, বিদ্যুৎচালিত পরিবহন ও জ্বালানি দক্ষতায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। বাংলাদেশের জ্বালানি নীতির লক্ষ্য শুধু কম দামে জ্বালানি পাওয়া নয়; বরং যেকোনো পরিস্থিতিতে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার সক্ষমতা তৈরি করা।
শেষ পর্যন্ত বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ কোনো নির্দিষ্ট ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর পক্ষে বা বিপক্ষে অবস্থান নয়; এটি রাষ্ট্রের কৌশলগত স্বাধীনতার প্রশ্ন। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগ করবে, দক্ষতা বাড়াবে ও ন্যায্য মুনাফা করবে—তবে জাতীয় নিরাপত্তার চূড়ান্ত দায়িত্ব রাষ্ট্রের হাতেই থাকতে হবে। সংকটের সময় কৃষক ডিজেল পাবেন কি না, পরিবহন ও শিল্প সচল থাকবে কি না, হাসপাতালের জরুরি সেবা চলবে কি না এবং প্রয়োজনীয় পণ্য মানুষের কাছে পৌঁছাবে কি না—এসব নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। তাই বাংলাদেশের জ্বালানি নীতির মূল দর্শন হওয়া উচিত—মুনাফা নয়, সেবা; কৃত্রিম সংকট নয়, প্রতিযোগিতামূলক বাজার; বেসরকারি বিনিয়োগ থাকবে, কিন্তু সংকটকালীন সক্ষমতা ও কৌশলগত নিরাপত্তায় রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ অক্ষুণ্ন থাকবে। কারণ সংকটের মুহূর্তে জ্বালানি শুধু একটি পণ্য নয়; এটি অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, মানুষের জীবনধারণ ও জাতীয় নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান ভিত্তি।
লেখক: অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট
আরএন