Friday | 6 March 2026 | Reg No- 06
Epaper | English
   
English | Friday | 6 March 2026 | Epaper
BREAKING: চাষীদের উচ্চ ফলনশীল পাট চাষের আহ্বান রাষ্ট্রপতির      বাজার দর একদিকে কমলে আরেক দিকে বাড়ে      পর পর ২ ম্যাচ হারলো বাংলাদেশ      স্ত্রী-সন্তানকে ছুরিকাঘাতে হত্যার পর স্বামীর আত্মহত্যা      মধ্যপ্রাচ্য সংকটে রাশিয়ার তেল কিনবে ভারত      রাজধানীতে গ্যাস লিকেজ থেকে বিস্ফোরণ, দগ্ধ ১০      প্রধানমন্ত্রীর বিদেশ যাত্রা ও ফেরার সময় বিমানবন্দরে থাকবেন মাত্র ৪ জন      

রাজস্ব আদায়ের নামে তুঘলকি কারবার রেলের ভূসম্পত্তি কর্মকর্তার

প্রকাশ: সোমবার, ২ মার্চ, ২০২৬, ৮:২৫ পিএম   (ভিজিট : ২৩৩)

লালমনিরহাট রেলওয়ের জমির রাজস্ব আদায়ের নামে চলছে তুঘলকি কারবার। বিভাগীয় ভূ-সম্পত্তি কর্মকর্তা মোঃ মনজুর হোসেন নীতিমালাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে অফিসে বসেই লাইসেন্স বাণিজ্য চালাচ্ছেন। সম্প্রতি কয়েকদিনের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে একাধিক অনিয়ম ও দুর্নীতির চিত্র। তবে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, রংপুর বিভাগের ৮টি জেলার ৮৪টি স্টেশন এলাকা লালমনিরহাট রেলওয়ের ভূ-সম্পত্তি বিভাগের আওতায়। এসব জায়গায় দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে গড়ে উঠেছে শত শত দোকানপাট। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, নিয়মিত অভিযানের কথা বলে এসব দোকানপাটে তালা মেরে এবং সরকারকে রাজস্ব বঞ্চিত করে, বাণিজ্যিক লাইসেন্স প্রদানের নামে অফিসে বসেই মোটা অংকের ঘুষ নিচ্ছেন রেলওয়ের লালমনিরহাট বিভাগীয় ভূ-সম্পত্তি কর্মকর্তা মনজুর হোসেন। পাশাপাশি এসব লাইসেন্স প্রদানের বা রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে কোনো নিয়মনীতি মানা হচ্ছে না।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা মোতাবেক, রেলওয়ের লাইসেন্স ফি বাবদ সকল রাজস্ব এ-চালানের মাধ্যমে তফসিলি ব্যাংকে জমা নেয়ার নিয়ম রয়েছে এবং এ উদ্দেশ্যে যে কোনো ধরনের নগদ লেনদেন সম্পূর্ণ অবৈধ। এছাড়াও, বাংলাদেশের রেলওয়ের ভূ-সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা নীতিমালা, ২০২০ অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পর্যালোচনা এবং যথাযথ পদ্ধতি অনুসরণপূর্বক লিজ বা লাইসেন্স অনুমোদিত হওয়ার পর সরাসরি পাওনাদারকে আদায়ের জন্য ডিমান্ড নোটিশ ইস্যু করার বিধান থাকলেও তা মানা হচ্ছে না।

সম্প্রতি প্রতিবেদকের হাতে আসা একাধিক কথোপকথনের অডিও রেকর্ড এবং নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, জেলার হাতীবান্ধা উপজেলার রনিউল ইসলাম ও ফজলে রহমান নামের দুই ব্যক্তির কাছ থেকে সরকারি রাজস্ব আদায়ের কথা বলে অফিসে বসেই মনজুর হোসেন নগদ অর্থ গ্রহণ করেছেন যথাক্রমে ১ লাখ ২৫ হাজার এবং ৮৪ হাজার টাকা। তবে তিনি নিজ অফিসের কর্মচারীর মাধ্যমে লালমনিরহাটের মিশন মোড় শাখার অগ্রণী ব্যাংকে ৬টি সরকারি এ-চালানের মাধ্যমে যথাক্রমে ৫৩ হাজার এবং ৩৬ হাজার টাকা জমা দিয়েছেন। এরপর মনজুর হোসেন তাদের হাতে ভুয়া বাণিজ্যিক লাইসেন্স ধরিয়ে দিয়েছেন, যা মূলত রেলওয়ে এস্টেট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমে এন্ট্রিকৃত তথ্যের কপি মাত্র। সরকারি কোষাগারে অর্থ জমা দেয়ার রশিদ চাইলেও ভুক্তভোগীদের তা দেওয়া হয়নি। লাইসেন্স ইস্যু করার সংক্রান্ত নথিপত্রও তিনি দেখাতে পারেননি।

রনিউল ইসলাম বলেন, "গত কয়েকদিন আগে ভূ-সম্পত্তি কর্মকর্তা মনজুর হোসেন অফিসের কর্মচারীদের নিয়ে বড়খাতা রেল স্টেশন এলাকায় আসেন। সেখানে কয়েকজনের দোকানে তালা মারেন এবং অফিসে যোগাযোগ করতে বলেন। অফিসে এলে আমাকে আমার ৪৯২ বর্গফুট জমির জন্য ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা দিতে বলা হয়। আমি নগদ সেই টাকা মনজুর হোসেনের হাতে তার অফিসে দিই। কিছুক্ষণ পরে তিনি আমাকে একটি অনলাইন কপির কাগজ দেন, যেখানে কোনো টাকার পরিমাণ উল্লেখ ছিল না। পরে জানতে পারি, আমার নামে অগ্রণী ব্যাংকে তিনটি চালানের মাধ্যমে মাত্র ৫৩,১৯৭ টাকা জমা হয়েছে। বারবার রশিদ চাইলেও তিনি দেননি। এভাবে আমাদের এলাকার অনেকের কাছ থেকে তিনি টাকা নিয়েছেন, কিন্তু কাউকে রশিদ বা চালানের কপি দেননি। অফিসে বসেই লক্ষ লক্ষ টাকা নিচ্ছেন। অল্প কিছু টাকা জমা করলেও বাকি টাকা তিনি আত্মসাৎ করছেন। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে দোকান উচ্ছেদসহ মামলা করারও হুমকি দেন।"

একই এলাকার ফজলে রহমানও একই ধরনের অভিযোগ করেছেন। তার কাছে ৮৪ হাজার টাকা নেওয়া হলেও ব্যাংকে তার নামে জমা হয়েছে মাত্র ৩৫,৭০১ টাকা। রনিউল ও ফজলের মতো অনেকের কাছ থেকেও একই পদ্ধতিতে টাকা নেওয়া হয়েছে।

ভুক্তভোগীদের বিষয়ে রেলওয়ের ভূমি ব্যবস্থাপনার কোনো বিধি মানা হয়নি। লাইসেন্সের ধরণ পরিবর্তন এবং জমি হস্তান্তর প্রক্রিয়াও মানা হয়নি।

অন্যান্য ভুক্তভোগীরাও অভিযোগ করেছেন, এস্টেট অফিসার দোকানে তালা দিয়ে অফিসে ডেকে আনেন এবং বাণিজ্যিক ভাড়া ও অন্যান্য ফি জমা দেওয়ার একটি কাগজ ধরিয়ে দেন। সেই কাগজে যে পরিমাণ টাকা জমা দেওয়ার কথা বলা থাকে, তার চেয়ে দ্বিগুণ বা তিনগুণ টাকা তিনি আদায় করেন এবং অধিকাংশ অর্থ তসরুফ করেন।

আলমগীর হোসেন নামের বড়খাতা স্টেশন এলাকার এক দোকান ব্যবসায়ী বলেন, "কয়েকদিন আগে আমার দোকানে গিয়ে বলেছিলেন, আট বছরের লাইসেন্স করতে ভ্যাটসহ বিশ হাজার টাকা লাগবে। আমি অফিসের ফিল্ড কানুনগো সিদ্দিকুর রহমানকে টাকা দিই। কিন্তু রশিদ দেননি।"

বাংলাদেশ রেলওয়ের ভূ-সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা নীতিমালা, ২০২০ এর অনুচ্ছেদ ১৩, ২২, ২৩ এবং ২৪ অনুযায়ী, অবৈধ দখলকারীর উচ্ছেদ, লিজযোগ্য ভূমির তালিকা তৈরি এবং মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নপূর্বক কেবল উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে বাণিজ্যিক লাইসেন্স প্রদানের বিধান রয়েছে। নীতিমালার অনুচ্ছেদ ১৫(খ) অনুযায়ী, যে উদ্দেশ্যে রেলভূমি লিজ নেওয়া হয়েছে, সেই উদ্দেশ্য ব্যতীত অন্য কোনো কাজে রেলভূমি ব্যবহার করলে লাইসেন্স বাতিল, উচ্ছেদ এবং প্রতি বর্গফুট ভূমির জন্য তিনগুণ জরিমানা আদায়সহ সার্টিফিকেট মামলা দায়েরের বিধান রয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, এই বিধিকে ঢাল বানিয়ে মনজুর হোসেন সাধারণ মানুষদের হয়রানি করছেন এবং বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ লুটে নিচ্ছেন। আদায়কৃত অর্থ ব্যাংকে জমা না দিয়ে অফিসের কর্মচারীদের মাধ্যমে কিছু অংশই জমা করানো হচ্ছে। তিনি কৃষি ভূমির শ্রেণি পরিবর্তন করে বাণিজ্যিক কাজে রেলভূমি ব্যবহার করায় মাত্র তিন বছরের রাজস্ব আদায়ের জন্য ডিমান্ড নোটিশ গোপনে স্বাক্ষর করছেন। নথি অনুসরণ না করে, অবৈধ দখলকারীর নাম ও ভূমি তথ্য রেলওয়ের এস্টেট ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যারে এন্ট্রি করে কপিও ধরিয়ে দেন। কিন্তু স্বাক্ষরিত পত্র, ব্যাংকের এ-চালান এবং রশিদের কপি দেওয়া হয় না।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অনেক অবৈধ দোকানপাটের ২০২০ সালের পূর্বের কোনো কৃষি, মৎস্য বা নার্সারীর লাইসেন্স নেই। এসব দোকানপাট বহু বছর আগে নির্মাণ হলেও মাত্র এক থেকে তিন বছরের রাজস্ব আদায় করা হচ্ছে। এসব ভূমি মাস্টারপ্ল্যানের আওতায় নেই। আদৌ লিজযোগ্য কিনা, তা নিয়ে রেলওয়ের প্রকৌশল বিভাগের কোনো মতামত নেই, ফিল্ড কানুনগোর কোনো তদন্ত প্রতিবেদন নেই। অবৈধ দোকানপাট কতদিন ধরে আছে তা নির্ধারণ করে সরকারের রাজস্ব ধার্য করার জন্য স্থানীয় কোনো তদন্তও হচ্ছে না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি সূত্রের দাবি, তিনি তার কর্মকালে স্বেচ্ছাচারিতা, অর্থ আত্মসাৎ, দুর্নীতি, সরকারি রাজস্ব ক্ষতি এবং অনৈতিক কর্মকাণ্ড গোপন রাখার জন্য ডিভিশনাল রেলওয়ে ম্যানেজার ও চীফ এস্টেট অফিসারকেও কিছু জানাননি। এতে রেলওয়ের ভূমি ব্যবস্থাপনা নীতিমালা লঙ্ঘিত হচ্ছে, সরকার ও রেলওয়ে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব বঞ্চিত হচ্ছে, এবং অবৈধভাবে রেলভূমি দখলের প্রবণতা বাড়ছে।

রেলওয়ের ভূ-সম্পত্তি কর্মকর্তা মোঃ মনজুর হোসেনের এ সকল অনৈতিক কর্মকান্ডে সহযোগী হিসেবে কাজ করছেন লালমনিরহাট বিভাগের অফিস সহকারী জাবের হোসেন ও ফিল্ড কানুনগো সিদ্দিকুর রহমান। যদিও তারা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, মনজুর হোসেন কতগুলো ভুয়া পত্র ইস্যু করেছেন, কারা কত টাকা দিয়েছেন, সরকারের কত রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া হয়েছে এবং কারা সহযোগিতা করেছেন, তা রেলওয়ের এস্টেট ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যারের তথ্য যাচাই করে বের করা সম্ভব।

অফিসে নগদ টাকা গ্রহণের বিষয়টি তিনি স্বীকার করলেও, নিজের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকলে ঊর্ধতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দিয়েছেন।

এসব অনিয়ম খতিয়ে দেখে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন সদ্য যোগদানকৃত লালমনিরহাট রেলওয়ের বিভাগীয় ব্যবস্থাপক মোঃ তসলিম আহমেদ খান।

রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলের চিফ স্টেট অফিসার মোঃ নাদিম সরোয়ার বলেন, খাজনা বা লাইসেন্স ফি আদায়ের ক্ষেত্রে নগদ লেনদেনের সুযোগ নেই। বাণিজ্যিক লাইসেন্স যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই দিতে হবে। বিষয়গুলো তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এমএস/আরএন




LATEST NEWS
MOST READ
আরও পড়ুন
Editor : Iqbal Sobhan Chowdhury
Published by the Editor on behalf of the Observer Ltd. from Globe Printers, 24/A, New Eskaton Road, Ramna, Dhaka.
Editorial, News and Commercial Offices : Aziz Bhaban (2nd floor), 93, Motijheel C/A, Dhaka-1000.
Phone: PABX- 41053001-06; Online: 41053014; Advertisement: 41053012.
E-mail: district@dailyobserverbd.com, news©dailyobserverbd.com, advertisement©dailyobserverbd.com, For Online Edition: mailobserverbd©gmail.com
🔝
close